১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসা ক্ষেত্রে উজ্জ্বল বর্ধমান শহর

বর্ধমান: চিকিৎসা ও হাসপাতালের কাহিনি

র্ধমান জেলার বিভিন্ন জায়গায় আগেও যেমন জলবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যেত, এখনও তেমন দেখা যায়। এখানে প্রধান সমস্যা দেখা দেয় পেটের অসুখ। এর কারণই হল বিশুদ্ধ জলের সরবরাহের অপ্রতুলতা। বর্ধমান শহরের মধ্যেও আজও বিভিন্ন জায়গায় জল জমে থাকা, খাবার জলের অপরিচ্ছন্নতার ছবি চোখে পড়ে। যার ফলে পেটের অসুখ এখানকার বাসিন্দাদের নিয়মিত হতেই থাকে।বর্ধমান জেলায় রোগ ও চিকিৎসার সম্পর্ক অনেককাল আগে থেকেই শুরু। এই জেলায় এক এক সময় এক এক মহামারি রোগের দেখা মিলেছে। ১৮০০ সালের সময়পর্বে এই জেলার বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছিল এক মহামারি রোগ যা ‘বর্ধমান জ্বর’ নামে পরিচিত।সেই রোগে উজার হয়ে গিয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম, শহর। মৃত্যু হয়েছিল অসংখ্য মানুষের। নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল লোকালয়। শুনশান রাস্তা। সেই মহামারির কথা ইতিহাস হয়ে এখনও মুখে মুখে ফেরে।

দাঁইহাট, মঙ্গলকোট, কেতুগ্রাম, কাটোয়া সদরে গড়ে ওঠে হাসপাতাল। প্রত্যেক হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জেন ও দেশীয় চিকিৎসকদের উপর আদেশ ছিল তাঁরা যেন নিকটবর্তী গ্রামে গিয়েও চিকিৎসা করেন।

তবে সেই রোগের আগে বর্ধমান ছিল স্বাস্থ্যকর স্থান। স্বাস্থ্য উদ্ধারে আসতেন অনেকেই। কিন্তু বর্ধমান ফিভার হবার পরে বর্ধমান যাওয়ার কথা ভাবলেই মানুষের বুক কাঁপতো। বর্ধমানে জিটি রোডের ধার বরাবর ছিল ইংরেজ সাহেবদের বাড়ি। থাকতেন নীলকর সাহেবরা। কাছেপিঠে ছিল অনেক নীলকুঠি। বর্ধমান জ্বরের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে ঘর ছেড়ে পালিয়ে বাঁচেন ইংরেজ শাসকরা। বন্ধ হয় নীল চাষ। চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যু হয় অগুণতি মানুষের। সেই সময় ভারত শাসনে ছিলেন ইংরেজ। তখন থেকেই বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্তে হাসপাতাল গড়ে ওঠার ইতিহাস পাওয়া যায়। যেমন- দাঁইহাট, মঙ্গলকোট, কেতুগ্রাম, কাটোয়া সদরে গড়ে ওঠে হাসপাতাল। প্রত্যেক হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জেন ও দেশীয় চিকিৎসকদের উপর আদেশ ছিল তাঁরা যেন নিকটবর্তী গ্রামে গিয়েও চিকিৎসা করেন।

চিকিৎসার জন্য যখন মহামারি রোগ প্রায় নিয়ন্ত্রণে এসে পড়েছে তখন আবার শুরু হল নতুন উপদ্রব— পাওয়া গেল কাটোয়ায় দুই কালোজ্বরের রোগী (ব্ল্যাক ফিভার)। নতুন রোগ, তাই ঠিক ভাবে চিহ্নিত করাও যাচ্ছে না, অনেকে বললেন ম্যালিগন্যান্ট ডেঙ্গু হবে। বর্তমানে তার নাম কালাজ্বর। কালাজ্বরের ওষুধ ইউরিয়া স্টিবামাইন আবিষ্কার হয়েছে তার অনেক পরে ১৯২০ সালে। আবিষ্কর্তা বর্ধমান জেলার সন্তান উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী। তবে ১৮৭২ সালের পর থেকে কিছুটা হলেও ম্যালেরিয়া রোগের নির্মূল করা গেছিল। কিন্তু ১৯০০ সাল থেকে আবার কলেরা রোগের প্রকোপ শুরু হয় কাটোয়াতে।

তার বছর দশক পরেও কলেরার প্রকোপ কিন্তু কমতে দেখা যায়নি। এছাড়াও সেই সময় প্লেগ, গুটি বসন্ত রোগের প্রকোপও দেখা যায়। গুটি বসন্তে কয়েক মাসে মৃত্যু হয় হাজারে ৬৪১ জনের। ১৯০৬ সালে কাটোয়াতে প্লেগে মারা যায় ৯০ জন। কালনা মহকুমার চিকিৎসা ব্যবস্থার ইতিহাসে দেখা যায় ১৮৯২ সালে জাপট এলাকায় গড়ে ওঠে হাসপাতাল, যার দায়িত্ব গ্রহণে ছিল ‘ইউনাইটেড ফ্রি চার্চ অব স্কটল্যান্ড মেডিকেল মিশন’। তবে তার আগে এখানে প্রাচীন আয়ুর্বেদ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। অনেক নামকরা কবিরাজদের বাসস্থান ছিল কালনা বা পূর্বস্থলীতে। কঠিন ব্যাধি সারাতে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক রোগী কালনায় কবিরাজি চিকিৎসা করাতে আসতেন।

এতক্ষণ তো গেল বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্তের চিকিৎসার কথা। কিন্তু মূল বর্ধমান শহরে তখনও পর্যন্ত যথাযথ হাসপাতাল ছিল না। তখন বর্ধমান এস্টেটের মহারাজাধিরাজ ছিলেন বিজয়চাঁদ মহতাব। ইতিমধ্যে ইংরেজদের আনুগত্য মেনে নিয়েছে বর্ধমান রাজ পরিবার। সগৌরবে যুদ্ধ ঘোষণার পরিবর্তে রাজ পরিবার চেয়েছিল, প্রজাদের স্বার্থ যাতে কোনও ভাবে ক্ষুণ্ণ না হয়। পাশাপাশি একের পর এক স্থাপত্যে নজর ছিল তাদের। এমন রাজাকে নিজেদের সমস্যার কথাও অবলীলায় বলতে পারতেন প্রজারা। তাই নিজেদের চিকিৎসার জন্য একটি আধুনিক হাসপাতাল তৈরির ব্যাপারে প্রথম অনুরোধ করেন বর্ধমানের বাসিন্দারাই। কলকাতায় তখন তিনটি মেডিকেল কলেজ। ঘরের দুয়ারে চলে এসেছে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। অথচ বর্ধমানে চিকিৎসার সুযোগ নেই। সামান্য অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের প্রসবের ব্যবস্থাটুকুও ছিল না। তাই ১৯০৭ সালের ১৩ জুলাই বর্ধমান শহরের বাসিন্দারা একটি আলোচনা সভায় যোগ দিয়ে চিকিৎসা ক্ষেত্রে সমস্যার কথা তুলে ধরেন। সেখানেই দাবি ওঠে শহরে একটি হাসপাতাল চাই। সেই দাবির মধ্যে যে কোন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা লুকিয়ে ছিল তা বোধহয় সেই সময় ভাবতে পারেননি আলোচনা সভায় উপস্থিত শহরের বাসিন্দারা। প্রজাদের দাবি গুরুত্ব দিয়ে দেখলেন মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাব। কাজও শুরু হল। ১৯১০ সালের ৯ নভেম্বর চালু হল ১২৭ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। নাম ফ্রেজার হাসপাতাল। এর ১১ বছর পর ১৯২১ সালে শুরু হল মেডিকেল স্কুল। তখন বাংলার গভর্নর আর্ল রোনাল্ডসে। তাঁকে সম্মান জানিয়ে নামকরণ হল রোনাল্ডসে মেডিকেল স্কুল।  
এই স্কুলে ৬টি বিভাগ খোলা হয়েছিল। বিভাগগুলির নাম ও ভারপ্রাপ্ত প্রথম বাঙালি চিকিৎসক শিক্ষকদের নামগুলি হলো—

স্বাধীনতার পর ভোর কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দেশে অভিন্ন চিকিৎসা শাস্ত্র চালুর উদ্দেশ্যে ১৯৫৮ সালে বন্ধ হয়ে যায় বর্ধমানের এই মেডিকেল স্কুলটি। তবে হাসপাতালটি থেকে যায়। শুধু নাম বদলে হয়ে যায় বিজয়চাঁদ হাসপাতাল। এর বেশ কিছু দিন বাদে বর্ধমানে একটি মেডিকেল কলেজ তৈরির প্রস্তাব ওঠে। বিধানচন্দ্র রায় তখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। প্রস্তাবে সায় দেন তিনি। তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড সেক্রেটারি জিতেন্দ্রনাথ মিত্র, মহারাজকুমার অভয়চাঁদ, চিকিৎসক নরোত্তম সামন্ত, চিকিৎসক শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, চিকিৎসক শৈলেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে পরিকাঠামো। ঠিক হয় মেডিকেল স্কুলের জায়গাতেই হবে মেডিক্যাল কলেজ। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯৬৯ সালে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বর্ধমান ইউনিভার্সিটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইট বের করা একটি প্রাইমারি স্কুলের ভবনে যাত্রা শুরু করে কলেজ। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের ছেলেমেয়েদের জন্য ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনটি। নাম ছিল ‘হল ব্রিক বিল্ডিং’। সেখানেই মেডিক্যাল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ননী ভট্টাচার্য। পরে ১৯৭৬ সালের ৪ অগাস্ট রাজ্য সরকার কলেজটি অধিগ্রহণ করে এবং নাম হয় বর্ধমান মেডিকেল কলেজ।

৯০৭ সালের ১৩ জুলাই বর্ধমান শহরের বাসিন্দারা একটি আলোচনা সভায় যোগ দিয়ে চিকিৎসা ক্ষেত্রে সমস্যার কথা তুলে ধরেন। সেখানেই দাবি ওঠে শহরে একটি হাসপাতাল চাই। সেই দাবির মধ্যে যে কোন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা লুকিয়ে ছিল তা বোধহয় সেই সময় ভাবতে পারেননি আলোচনা সভায় উপস্থিত শহরের বাসিন্দারা।+

বর্তমানে বর্ধমান শহর হয়ে উঠেছে চিকিৎসার পীঠস্থান। সব রকমের চিকিৎসার সুযোগ আজ এখানে পাওয়া যায়। এমনকি এখানে খোশবাগান নামে জায়গাটি যে পরিমাণে ওষুধের দোকান ও ডাক্তারের চেম্বারে ভরে উঠেছে তাতে করে বলা হয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বড়ো চিকিৎসালয় স্থান।  

ঋণস্বীকার
____
১। কালীচরণ দাস, কাটোয়ার চিকিৎসক এবং চিকিৎসা, ‘লোকভারতী’, ২ বর্ষ ২ সংখ্যা, (নবপর্যায়), এপ্রিল-জুন, ২০১৩।
২। সৌমেন পাল, কালনা মহকুমার বিশিষ্ট চিকিৎসকদের কিছু কথা, ‘লোকভারতী’, ২ বর্ষ ২ সংখ্যা, (নবপর্যায়), এপ্রিল-জুন, ২০১৩।
৩। শান্তিময় চট্টোপাধ্যায়, সদর বর্ধমানের উল্লেখযোগ্য ডাক্তার মহল, ‘লোকভারতী’, ২ বর্ষ ২ সংখ্যা, (নবপর্যায়), এপ্রিল-জুন, ২০১৩।
৪। শান্তিময় চট্টোপাধ্যায়, রোনাল্ডসে মেডিক্যাল স্কুল, বর্ধমান, ‘লোকভারতী’, ৩ বর্ষ ২ সংখ্যা, (নবপর্যায়), এপ্রিল-জুন, ২০১৪।
৫। পশ্চিমবঙ্গ, বর্ধমান জেলা সংখ্যা, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৪০৩ বঙ্গাব্দ।

 

Developed by DXDasia