কলমকাঠি : বাংলার বিস্মৃতপ্রায় ধানের প্রজাতি নিয়ে বাঁকুড়ার চলচ্চিত্র

বিশ্বের দরবারে রাঢ়বাংলার ধানের কাহিনি

ছবির একটি দৃশ্য

কলমকাঠি মানভূমের হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় প্রজাতির ধান। রাসায়নিক নির্ভর উচ্চ ফলনশীল ধানের চাপে কোনঠাসা বাঁকুড়া-পুরুলিয়া তথা রাঢ় বাংলার এই ধান চাষের পদ্ধতি যা আজ লুপ্তপ্রায়, তা নিয়েই বাঁকুড়া’র বিপ্লব দাসের চলচ্চিত্র ‘কলমকাঠি’। এ ছবির পরতে পরতে উঠে এসেছে মাটির গল্প, রাঢ় বাংলার লোকসংস্কৃতি, লোকাচার, অন্নকথা—মূলত বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার কথা। আদতে সিনেমা, সাহিত্যের কাহিনি যদি জীবন থেকে উঠে আসে, তখন তা সময়ের দলিলে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে সৃষ্টিটি কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে। কলমকাঠির ক্ষেত্রে সে’সব লক্ষণ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কৃষিমেলায় কলকাতার মানুষজন কলমকাঠি চাল খুঁজতে আরম্ভ করেছেন। সম্প্রতি কলকাতা অন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে কলমকাঠি। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বিভাগে সাতাশটি পুরস্কার চলে এসেছে ঝুলিতে।

এ ছবি গড়ে উঠেছে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া-কে উপজীব্য করে। কলমকাঠি ধানকে কেন্দ্র করে এ ছবির কাহিনিতে তুলে ধরা হয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতি। মকর পরব, (শহরে যা একদিনের মকর সংক্রান্তি, বাঁকুড়ায় তা সাতদিনের উৎসব) মনসা পরব, এখানকার কৃষিকাজের পদ্ধতি, গ্রামের দুর্গাপুজো, মানুষের জীবনযাত্রা, মাছ ধরা সব উঠে এসেছে। আশি মিনিটের এ ছবি তৈরি হতে সময় লেগেছে প্রায় এক বছর। ছবির যাবতীয় কাজ হয়েছে বাঁকুড়ায়। বাঁকুড়া শহর, রাজগ্রাম, সোনামুখীর পাঁচলা, খাতড়ার সোনামণি পাহাড়, শুশুনিয়ার কোলে শিউলিবোনা গ্রামে ছবির শুটিং হয়েছে। এডিটিং, ক্যামেরা, সাউন্ড, কালার সব বাঁকুড়াতেই হয়েছে। কলমকাঠির কাহিনিকার পরিচালক নিজেই। বলা ভালো, ছবির বিষয় ও ছবিটি বানানোর পদ্ধতি –দুইই প্রাকৃতিক। কথা হচ্ছিলো ছবির পরিচালক বিপ্লব দাসের সঙ্গে, বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানান “প্রথমেই বলি, আমি কোনও ফিল্মমেকার নই, কলমকাঠিও সেই অর্থে কোনও ফিল্ম নয়। ফিল্ম বা সিনেমা বলতে আমরা যা বুঝি, প্রথাগত মতামতে যেটা রয়েছে তার ধারে কাছেও এটা পড়ে না। অভিনয়, মেক আপ, ক্যামেরা, লাইট, সাউন্ড- কোনোটাই এখানে সিনেমার মত করে করা হয়নি, চেষ্টাও করা হয়নি। এখানে শুরু থেকে একটা অন্য চিন্তা-ভাবনা ছিল এবং সেরকম চিন্তা ভাবনা করার মতও যথেষ্ট কারণ ছিল বলে আমরা মনে করি।”

আজকাল মানুষ অনেক বিষয় নিয়ে ছবি করছেন; হঠাৎ এমন একটা বিষয় ভাবলেন কেন? “আমাদের অন্য রকম ভাবনা ছিল, তাগিদ ছিল। আমি একটা যাপনের মধ্যে থাকি। বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা বেশ কয়েকটি পরিবার দেশীয় পদ্ধতিতে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদিত খাবার খাচ্ছি। সাত-আট বছর হল আমরা বাজার থেকে চাল, তেল কিনে খাই না। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ না করে, যাঁরা বংশপরম্পরায় চাষ করছেন সার, কীটনাশক ছাড়া, তাঁদের কাছ থেকে আমরা ফসল কিনি। এই যাপনের মধ্যে আমার পরিচিত অনেকেই আছেন। আমার মনে হল, এই মানুষগুলোর কথা নিয়ে কোনও কাজ নেই। ভাবলাম এদের নিয়ে কিছু একটা করা যাক। বছর দুই-তিন হল প্লটটা তৈরি ছিল। সেটাই স্ক্রিপ্ট করে সিনেমা বানালাম।” বলেন বিপ্লব দাস।

সম্প্রতি কলকাতা অন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে কলমকাঠি। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বিভাগে সাতাশটি পুরস্কার চলে এসেছে ঝুলিতে।

বিপ্লববাবুর কথায়, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থা থেকে উঠে গত দু’শতাব্দীতে বেশ কয়েকরকম সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরীক্ষানিরীক্ষার পর এই মুহূর্তে পৃথিবী ঘেঁটে আছে। চলছে পুঁজিবাদী ভোগবাদ এবং পৃথিবীর সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার;  এর থেকে তৈরি হওয়া পৃথিবীর বুকে একটি দগদগে ঘা ‘ক্লাইমেট ক্রাইসিস’। এরকম একটা সময়ে অনেকেই ভাবতে পারে  পৃথিবীর গভীরতম অসুখ নিয়ে কিছু করার কথা। কিন্তু মুশকিল হল, ক্লাইমেট ক্রাইসিস কোনও ওয়ান ডাইমেনশ্যনাল বিষয় নয়। এর কারণ, ব্যাপ্তি এবং ফলাফল –এই তিনটিই ভীষণভাবে মাল্টি ডাইমেনশ্যনাল। অন্যভাবে ভাবলে দেখা যায়, আজ অবধি পৃথিবীতে যতগুলি ঘটনা ঘটেছে বা মানবসভ্যতার সমস্ত উপাদান যা আমাদের প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে, ক্লাইমেট ক্রাইসিসের জন্য সবাই দায়ী। এরকম একটি বিশাল পরিব্যাপ্তির বিষয় নিয়েই কাজ করতে গিয়ে একটা সাব-সাবজেক্টকে ধরা হয়েছে ‘কলমকাঠি’-তে। চাষ আবাদ; আরও সূক্ষভাবে বললে ধান।

পরিচালক বিপ্লব দাস

অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রসঙ্গে বিপ্লববাবু জানাচ্ছিলেন, সংলাপ রয়েছে এমন অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন কুড়ি জন। কেউই পেশাদার নন। সব মিলিয়ে পঞ্চাশ জন আছেন। প্রায় ৬০-৭০ জন আছেন, যাঁদের ডাকা হয়েছিল অভিনয়ের জন্য। অনেকেই এমন আছেন, যাঁদের ক্যামেরার সামনে এটিই যাঁদের প্রথম কাজ। যে ছেলেটি ক্যামেরা করেছে, সন্ধ্যেবেলা ক্যামেরা কিনেছে, সকালে শুটিং শুরু হয়েছে। 

ছবিটি দেখে মানুষ ইতিমধ্যেই কলমকাঠি চাল খুঁজতে শুরু করেছেন। এ প্রসঙ্গে কলমকাঠি-র পরিচালক বলেন “বাগুইহাটি-নিউটাউন অঞ্চলে একটি জৈব হাট হয়েছে সরকারি উদ্যোগে। সেখানকার এক উদ্যোক্তা গত সপ্তাহে ফোন করেছিলেন। বললেন, সবাই কলমকাঠি চালটা চাইছে, খোঁজ করছে। চাহিদার কথা ভেবে অন্তত কিছুটা চাল আমরা স্যাম্পেল হিসেবে রাখবো ভেবেছি। অর্থাৎ লোকজন কলমকাঠি চাইছেন। সিনেমাটা এখনও বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে রয়েছে। হল রিলিজের পর আরও বোঝা যাবে মানুষ কীভাবে নেবেন। এটা তথাকথিত সিনেমার সঙ্গে তুলনা করা যায়-ই না। কোনও ঝকঝকে ব্যাপার নেই।”

কলমকাঠি-র শুটিং চলাকালীন

কলমকাঠি-র অন্যতম অভিনেতা সুতসোম ভাদুড়ি শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত থিয়েটার করেন। তাঁর কথায়, “ছবি করার ক্ষেত্রে ‘প্রফেশনালিজম’ ব্যাপারটা এখনও বাঁকুড়াতে আসেনি। এখানে যাঁরা সিনেমা করেন বা সিনেমায় অভিনয় করেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই কাজটার প্রতি ভালোবাসা থেকেই করেন। আমি সেই জায়গা থেকেই কাজটা করেছি। কলমকাঠিতে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ থিয়েটার করেন। যিনি মুখ্যচরিত্রে অভিনয় করেছেন, তাঁর এটা প্রথম ক্যামেরার সামনে কাজ।”

বিপ্লববাবুর কাছে যত ছবি তৈরির গল্প শুনছিলাম মনে হচ্ছিল যেন ‘একেই বলে শুটিং’-এর পাতায় পথের পাঁচালি তৈরির নেপথ্য কাহিনি জানছি। আপাত সাধারণ, ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি হয়েছে কলমকাঠি। সব ভালো কাজ বোধ হয় এভাবেই জন্ম নেয়। কলা-কুশলী, অভিনেতা-অভিনেত্রী সব্বাই বাঁকুড়ার। লাল মাটির ছেলে-মেয়েদের করা কাজ আজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে পড়ছে পল্লীবাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি।

Developed by DXDasia