February 21, 2017 | 4:02 PM

অভিনেত্রী রমলাদেবী-র জন্মশতবর্ষ

পঞ্চম জর্জ যে সময় পরাধীন ভারতের সম্রাট আর লর্ড আরউইন ভাইসরয় ঠিক সে সময়ে একটি ইহুদী মেয়ের বাংলার মঞ্চ ছেড়ে চলচ্চিত্রে চলে আসা

বঙ্গদর্শনের আগের সংস্করণে লিখেছিলাম যে এটাই  বঙ্গ চলচ্চিত্রের শতবর্ষ।

তো চলুন যাই সেই বীজতলায় যাঁরা সেদিন  বীজ বুনেছিলেন তাঁদের সঙ্গে দেখা করে আসি, তবে সেটা করতে হলে আমাদের উজিয়ে যেতে হবে একশো বছর। অনেকেই এসেছিলেন সেদিন — জন এফ কেনেডি থেকে  ইন্দিরা গান্ধী কিংবা  আর্থার সি ক্লার্ক থেকে  হাইনরিখ বোল, কিন্তু সব  সরণী আমাদের নয়। আমরা যাব বাংলা সিনেমার কাঁচা পাকা রাস্তা ধরে বাংলা সিনেমার আঁতুর ঘরে। এই তো দু সপ্তাহ আগে এম জি আর-এর জন্মশতবর্ষে তামিলনাড়ু সরকার রাজ্যে ছুটি ঘোষণা করল। সে যাকগে ,  আমরা বরং ফিরে যাই আমাদের , সেদিনের কথায়।

তখনও হাওড়া ব্রিজ তৈরি হয়নি ….

মাদার তেরেসা সবে কলকাতা এসে পৌঁছেছেন;  ধীরুভাই আম্বানি, কিশোরকুমার, লতা মঙ্গেশকর, উৎপল দত্ত, অমর্ত্য সেন, এ পি জে আব্দুল কালাম কিংবা মধুবালা তখনও জন্মাননি এবং ভগৎ সিং-এর ফাঁসি হয়নি। পঞ্চম জর্জ যে সময় পরাধীন ভারতের সম্রাট আর লর্ড আরউইন ভাইসরয়  ঠিক সেরকম এক সময়ে একটি  ইহুদী মেয়ে বাংলার মঞ্চ ছেড়ে চলচ্চিত্রে চলে এলেন।

সেই মেয়েটির এবছর জন্মশতবর্ষ।

রমলা দেবী ( ১৯১৭ – ১৯৮৮ )
রমলা দেবীর আসল নাম ছিল রাচেল  কোহেন। জন্ম  ১৯১৭ সালে। বম্বের এক ইহুদী পরিবারে। মাতৃভাষা ছিল অ্যারামিক। বাবা হায়াম কোহেন বম্বের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পরে পুরো পরিবার নিয়ে কলকাতা চলে আসেন। রমলা চৌরঙ্গির একটা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়তেন। তো,  সেখানে, মাঝে মধ্যে বন্যা দুর্ভিক্ষের মতো ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য স্কুলের মেয়েদেরকে নিয়ে বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করা হত,  রমলাও তাতে যোগ দিত। এবং সেইসময়ে সেই ছোট্টোবেলাতেই অভিনয়ের দিকে রমলার একটা নজর কেড়ে নেওয়া ঝোঁক চোখে পড়ে। পড়াশোনা বেশিদূর গড়ায়নি। অন্য আরও দু’বোনের সঙ্গে (সেজ বোন রূপলেখা) তাকেও কোরিনথিয়ান থিয়েটারে নাচ গান অভিনয় শিক্ষার জন্য পাঠানো হয়।  থিয়েটার থেকে সিনেমায় আসতে দেরি হয়নি।

তখন  কোনো সিনেমা হল ছিল না। প্রথম দিকে গড়ের মাঠে তাঁবু খাটিয়ে সিনেমা দেখানো হত। পরে হাতিবাগানে আরও দুটি তাঁবু চিত্রগৃহ তৈরি হয়। এখন যেখানে টাউন স্কুল, সুভাষ কর্নার সেখানে তৈরি হল দুটি পাকা সিনেমা হল —  ক্রাউন আর কর্নওয়ালিশ। পরবর্তীতে এ-দুটির নাম হয় শ্রী ও উত্তরা। রমলার প্রথম দিকের বেশির ভাগ বায়োস্কোপই এখানে রিলিজ করেছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প নিয়ে মধু বোসের পরিচালনায় তৈরি  ম্যাডানের  নির্বাক বাংলা ছবি ডালিয়া (১৯৩০)- তেই মাত্র  ১৬ বছর বয়সে রমলার  সিনেমা অভিনয় শুরু অর্থাৎ এটিই  তাঁর ডেবু ফিল্ম ছিল। রমলার ছেলে স্যামের বউ  বারবারা-র দেওয়া একটি সাক্ষৎকার থেকে জানতে পারছি – এইসময়েই রমলা গর্ভবতী হয়ে পড়েন। গর্ভস্থ সন্তানের বাবা ইহুদী ধর্মে বিশ্বাসী না-হওয়া সত্ত্বেও ধর্মান্তরিত হয়ে রমলাকে বিয়ে করেন। ইনি ছিলেন রমলার প্রথম স্বামী, যদিও এই বিয়ে খুব বেশিদিন টেকেনি।  রমলা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন ব্রিটিশ এয়ার ফোর্সের এক জন পাইলটকে যিনি কিনা ভারতে ট্রেন পাইলট হিসেবে এসেছিলেন। ওঁদের একটা পরিবারও গড়ে ওঠে। ওইবছরই কর্নওয়ালিশ থিয়েটারে মুক্তি পায় রমলার দ্বিতীয় ছবি মৃণালিনী (১৯৩০) —বঙ্কিমচন্দ্রের কাহিনি নিয়ে তৈরি জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। ১৯৪১ সালে  মতি বি গিদওয়ানি পরিচালিত হিন্দি খাজা়ঞ্চি (১৯৪১ ) ছবিতে মাধুরীর ভূমিকায় অভিনয়ের পরে সারা ভারতে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। এই ছবিতে সহ অভিনেতা ছিলেন এস ডি নারাং, প্রাণ প্রমূখ আর ছিল সামসাদ বেগমের গাওয়া আটখানা  গান। আর সি তলোয়ার পরিচালিত  মনচালি( ১৯৪৩) ছবিতে অভিনয়ের জন্য বি এফ জে এ-র সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেলেও রমলার সর্বাধিক জনপ্রিয় ছায়াছবি হল হাম ভি ইনসান হ্যায়( ১৯৪৮)। ফণী মজুমদার পরিচালিত এই সিনেমায় তিনি দেব আনন্দের বিপরীতে অভিনয় করেন। মান্না দের সুরে ও কন্ঠে হাম তেরে হ্যায় হাম কো না ঠুকরানা গানটি সেইসময় লোকের মুখে মুখে ঘুরত। । হিন্দি ও বাংলা  চলচ্চিত্র জগতে তখন একঝাঁক মুখ — নার্গিস, মধুবালা, মীনাকুমারি, নুতন, ওয়াহিদা রেহমান এদিকে শর্মিলা ঠাকুর, সুচিত্রা সেন. সাবিত্রী চ্যাটার্জি, তনুজা। এরকম সময়েই রমলা আস্তে আস্তে নিজেকে সরিয়ে নেন ছায়াছবির জগত থেকে। হিন্দিতে স্টেজ (১৯৫১) ও বাংলায় রিক্তা (১৯৬০) ছিল তাঁর শেষ ছবি।

মনে রাখতে হবে একটি  ইহুদী মেয়ে কলকাতার বাঙালি থেকে সারা দেশের হিন্দি সিনেমার দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিলেন সেই সময়ে যা খুব  একটা সহজ ছিল না। আবেগপ্রধান চরিত্রে তাঁর আকর্ষণ ছিল অব্যর্থ। বহু সিনেমায় প্লে ব্যাক করেছেন, নাচ ও গানে দক্ষ কিন্তু  উচ্চতা খুব কম ছিল এবং এজন্য একবার সুবিখ্যাত চলচ্চিত্র  পরিচালক তাঁকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করেছিলেন বলে জানা যায়। কাজ করেছেন ধীরাজ ভট্টাচার্য, অহীন্দ্র চৌধুরী, ছবি বিশ্বাস, প্রমথেশ বড়ুয়া, দেবকী বসু, ছায়া দেবী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, মলিনা দেবী, জহর গাঙ্গুলি, ভানু ব্যানার্জি থেকে দেব আনন্দ, প্রাণ, ইফতিকার প্রমুখদের সঙ্গে।

দুই মেয়ের ছোটো দীনা জি পি সিপ্পি প্রযোজিত সুরিন্দর সুরির অ্যাহেসাস (১৯৭৯)-এ অভিনয় করেছেন।

১৯৮৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ৭১ বছর বয়সে রমলা দেবীর জীবনাবসান হয়।

এই বছর রমলা দেবীর জন্মশতবর্ষ।

রমলা দেবীর একটি শিরোনামভিত্তিক চলচ্চিত্রপঞ্জি – যথাসম্ভব ত্রুটিহীন এবং প্রায় সম্পূর্ণভাবে – নীচে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। এতে প্রথম বন্ধনীর মধ্যে মুক্তির বছর, পরিচালকের নাম এবং হিন্দি ইত্যাদি উল্লেখ  হাইফেন চিহ্ন দিয়ে এখানে পেশ করা হল—   
নির্বাক যুগ: ডালিয়া ( ১৯৩০- মধু বোস); মৃণালিনী ( ১৯৩০ – জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায় ); চরিত্রহীন (১৯৩১ – ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ); গুপ্তরত্ন ( ১৯৩১ – বি এস রাজহনস); গৌরীশঙ্কর ( ১৯৩২  – আনন্দমোহন রায় )।  সবাক যুগ: গ্রহের ফের ( ১৯৩৭  – চারু রায়); ক্যালকাটা আফটার মিডনাইট ( হিন্দি –  ১৯৩৭ – এ আর কাবুল);  গোরা ( ১৯৩৮ –নরেশ মিত্র- লাবণ্যের ভূমিকায়  ); সাইকেলওয়ালি (হিন্দি – ১৯৩৮ – এ এম খান ); পথিক (১৯৩৯ – চারু রায় ); দিল হি তো হ্যায় ( হিন্দি – ১৯৩৯ – কিদার শর্মা ); রত্না লুঠারি ( হিন্দি – ১৯৩৯ – এ এম খান ); রাইস ( হিন্দি – ১৯৩৯ – রনজিৎ সেন ); থান্ডার ( হিন্দি – ১৯৩৯- এ এইচ এসা ); তটিনীর বিচার ( ১৯৪০ – সুশীল মজুমদার, এই ছবিতে রমলা প্লে ব্যাকও করেছিলেন); কয়দি ( হিন্দি – ১৯৪০ – এস এফ হুসেন); প্রতিশোধ ( ১৯৪১-  সুশীল মজুমদার ); খাজা়ঞ্চি (হিন্দি- ১৯৪১- মতি বি গিদওয়ানি); মাসুম (হিন্দি– ১৯৪১- এস এফ হুসেন); সুহানা গীত ( হিন্দি – ১৯৪১- এম এ মির্জা); খামোশি (হিন্দি – ১৯৪২ – আর সি তলোয়ার); আলেয়া (১৯৪৩ – নবেন্দসুন্দর); জজ সাহেবের নাতনি (১৯৪৩- কালীপ্রসাদ ঘোষ – প্লে ব্যাকও করেছিলেন); দুনিয়া দিওয়ানি (হিন্দি – ১৯৪৩ – কে এল কাহান);  মনচালি (হিন্দি – ১৯৪৩- আর সি তলোয়ার); কলিয়ান ( হিন্দি – ১৯৪৪ – কিদার শর্মা);  শুকরিয়া (হিন্দি – ১৯৪৪ – এইচ এস রাওয়েল); আলবেলি (হিন্দি – ১৯৪৫ – আর সি তলোয়ার);  আমিরি (হিন্দি – ১৯৪৫ – পি সি বড়ুয়া); লালকার ( হিন্দি – ১৯৪৫ – জয়ন্ত দেশাই); জিদ (হিন্দি – ১৯৪৫); হাম ভি ইনসান হ্যায় (হিন্দি – ১৯৪৮ – ফণী মজুমদার); নারীর রূপ (১৯৪৮ – সতীশ দাশগুপ্ত); ঝুটি কসম (হিন্দি – ১৯৪৮ – এইচ এস রাওয়েল); দো বাতে (হিন্দি – ১৯৪৯ – এইচ এস রাওয়েল); রিমঝিম (হিন্দি – ১৯৪৯- রমেশ গুপ্ত, সুশীল সাহু); শাওন আয়া রে (হিন্দি – ১৯৪৯- কিশোর সাহু); জিপসি মেয়ে (১৯৫০- বিনয় বন্দ্যোপাধ্যায়); বসেরা (হিন্দি – ১৯৫০- ইনায়ত); মাঙ্গ (হিন্দি-১৯৫০- সাগীর উসমানি); অনুরাগ (১৯৫১- যতীন দাস); অ্যাকটর (হিন্দি – ১৯৫১- রামজী আর্য); জওয়ানি কি আগ (হিন্দি – ১৯৫১- এইচ এস রাওয়েল); স্টেজ (হিন্দি – ১৯৫১ – বিজয় মাহাত্র); রিক্তা (১৯৬০ – সুশীল মজুমদার)।

Developed by DXDasia