পাইনের ছায়া ঘেরা বাগোড়া

কার্শিয়াংয়ের সব থেকে উঁচু ভিউ পয়েন্ট

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমেই টের পেলাম তাপমাত্রা যথেষ্ট নিম্নমুখী। স্টেশনের বাইরে আসতে আর একটু কাঁপন। এখনও পর্যন্ত আকাশ পরিষ্কার। স্টেশন চত্বর, শিলিগুড়ি শহর ছেড়ে গাড়ি সুখনা জঙ্গলের পথ ধরতেই বাইরের দৃশ্যপট বদলে যায়। গন্তব্য কার্শিয়াং-এর নিকটবর্তী ছোট্ট গ্রাম বাগোড়া। উচ্চতা ৭১৫০ ফুট। ড্রাইভার নেপালি গান চালিয়ে ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি ছোটায়। এরই মাঝে পথের পাশের এক দোকান থেকে গরম গরম চা আর অমলেট খেয়ে নিয়েছি।

সুখনার জঙ্গল থেকে পঙ্খাবাড়ির রাস্তা, সমতল থেকে পাহাড়ে। প্রচুর হেয়ারপিন বেন্ড পার হয়ে যখন কার্শিয়াং শহরে পৌঁছলাম, ততক্ষনে কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছে চরাচর। শহরের ঘিঞ্জি ছাড়িয়ে ডানদিকের অপেক্ষাকৃত একটি নির্জন রাস্তা ধরে ড্রাইভার। রাস্তার অবস্থা ভালো নয়। চড়াইগামী এই রাস্তাটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বাগোড়া নয়,এই পথ দিয়ে যাওয়া যায় চিমনি, লাটপাঞ্চার ও চটকপুরেও। ফলে প্রচুর ট্যুরিস্ট যাতায়াত করে এ পথে। তবু কেন অবহেলা, কে জানে ?

ডিকি’স হোমস্টে 

কিছুটা ওঠার পর রাস্তা তুলনামূলক ভালো। যত ওপরে উঠি পথের দু’পাশে ঘন হয় পাইনের ছায়া। কুয়াশা জমে গাছেদের আনাচে-কানাচে। ধূসর মেঘে ঢাকা পড়ে আকাশ। এভাবেই কোনও এক সময় পৌঁছে যাই আমার বাগোড়ার ঠিকানা, ডিকি’স হোমস্টে-তে। আগামী তিন দিন কাটবে এখানেই । একটু আগেই ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি এসেছে। গাড়ি থেকে নামব কী, হাওয়ার তোড়ে দাঁড়ানোই মুশকিল। রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা উঠে পৌঁছতে হবে হোমস্টে-র দরজায়। হতভম্ব অবস্থা। এরই মধ্যে বিশাল রঙিন ছাতা নিয়ে হাজির এক কিশোর। তার হাত ধরেই শেষে পাহাড়ের ওই কঠিন পথে ওপরে উঠি। মালপত্র ঘরে পৌঁছে দিয়ে ড্রাইভার চলে যায়। 

ভেজা ও ঠান্ডা বাতাসে জমে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু হাত-মুখ তো ধুতে হবে। চলতি অভ্যাসে বাথরুমে গিয়ে কল খুলতেই বরফ জলে হাত জমে যায়। যাই হোক, ইতিমধ্যেই কেটলি করে গরম জল নিয়ে এসেছে সেই কিশোর। গরম জল পেয়ে একেবারে স্নানই করে ফেলব ঠিক করলাম। স্নান করে সোয়েটার, চাদর, মোজা, গ্লাভস ইত্যাদিতে শোভিত হয়ে বাইরে আসতেই মন ভালো হয়ে গেল। মেঘ সরিয়ে উঁকি দিয়েছেন সূর্যদেব। ঝলমলে রোদ্দুর মেখে নিয়েছে বাগোড়া। 

যেদিকেই চাও, প্রকৃতির আঁচলে ছড়ানো মণিমুক্তা চোখে পড়ে 

আমি চা নিয়ে বারান্দায় বসি। সামনে খোলা প্রান্তর। পাথরে বাঁধানো পথ চলে গেছে মাঝখান দিয়ে। সেই পথ ধরেই লেজ নাড়তে নাড়তে হাজির টাইগার। খুবই কেয়ারিং সে পরে টের পেলাম। হোমস্টে থেকে এদিক-ওদিক যেখানেই যাও, টাইগার সঙ্গী হবে। বিস্কুট দিতেই তার লেজ নাড়া বেড়ে যায়। পরের দুটি দিন সারাদিনে কতবার যে টাইগার জানান দিয়ে গেছে, সে আছে ! এছাড়াও গ্রামের ছোট্ট এক ছেলে, নাম ভুলে গেছি, তার সঙ্গে পরিচয় দ্বিতীয় দিনে। সেও রোজ একবার করে এসেছে । সে হিন্দি বোঝে না, আমি নেপালি জানি না। তাতে অবশ্য আমাদের ভাবনার আদানপ্রদানে কোনও ব্যাঘাত ঘটেনি। 

ফিরে আসি শুরুর কথায়। নিচের ধাপে হোম স্টে-র মালকিন থাকে, এক অল্পবয়সী তরুণী। কি নিপুণ হাতে সবটা সামলাচ্ছে, দেখলাম এই ক’দিন। অতিথিদের খাওয়ার ঘরও এখানেই। ভাত-ডাল, ডিমের ঝোল, রাই শাক আর আলুর চোখা দিয়ে লাঞ্চ হলো। কাল সারাদিন অফিস, তারপর সারারাত ট্রেন জার্নি। দুপুরে সাধারণত ঘুমোই না। কিন্তু এখন আর পারা যাচ্ছে না। এদিকে বিছানা হিমশীতল। দুখানা ভারি কম্বল জড়িয়ে কাঁপুনি থামাবার চেষ্টা করি। ক্লান্ত শরীরে ঘুম নামতে দেরি হয় না। 

বিকেল হতেই বাইরে। পাশের ঘরে আগত একটি ছেলের দল, তারা এতক্ষণ ছিল না, এখন ফিরেছে। ওদের ঘরে জমেছে আড্ডা। আমি একা হেঁটে ঘুরি। একটা মালভূমির মতো আকৃতির জায়গার ওপর বাড়িটা। তাই সামনের দৃশ্যপট বহুদূর পর্যন্ত চোখে পড়ে। পাইনের সারি ঘিরে রেখেছে অঞ্চলটি। পিছনে ঢেউয়ের মতো পাহাড়শ্রেণি। কোনাকুনি বাঁদিকটা পশ্চিম। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠি। আহ, কি অপূর্ব সূর্যাস্ত ! পুরো আকাশ লালিমা মেখে নববধূ হয়েছে। ঘরে ফিরছে পাখির দল। কি অপরূপ শান্তি ! আলো কমলে ঘরে আসি। ততক্ষণে জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছে। ডিনারে চিকেন আর রুটি খেয়ে বিছানায়। রাত ন’টা বাজে মাত্র। চারিদিক চুপচাপ। শুধু মাঝে মাঝে পাশের ঘর থেকে ছেলের দলের হুল্লোড় আছড়ে পড়ছে এখানকার চরম উদাসীন নৈঃশব্দে। ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছি। এপাশ থেকে ওপাশ ফিরতে গেলেও যেন মনে হচ্ছে হিম হয়ে আছে সব। কখন যেন এভাবেই ঘুমিয়ে পড়ি। 

উপত্যকায় নানা মরশুমি ফুল বসন্তে বাহারি হয়ে ওঠে 

ঘুম ভাঙল অতি ভোরে, ছেলেদের প্রবল চিৎকারে। দ্রুত গরম পোশাক জড়িয়ে বাইরে আসি। সে এক অনির্বচনীয় দৃশ্য। একেই বোধহয় ব্রাহ্ম মুহূর্ত বলে। আকাশ যেখানে মাটির সঙ্গে মিশেছে, সেখানটায় এখনও ঘোর অন্ধকার। তার একটু ওপর থেকে  অন্ধকার ফিকে হচ্ছে আর আগুনের শিখার মতো লাল আভা ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্ত জুড়ে। উঠছেন তিনি উঠছেন। দৌড়ে ঘরে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে আসি। বিস্ময়ে স্তব্ধ সবাই। একটু একটু করে আলো বাড়ল, কাটল অন্ধকার। দশদিক সচকিত করে পূব আকাশে উদ্ভাসিত হলেন দিনমণি। এ ছবি ক্যামেরায় ধরা বা লিখে বর্ণনা করা কঠিন। এ শুধু হৃদয়ে থাকে অনন্তকাল। 

একটু পরে চা খেয়ে সামনে হেঁটে গিয়ে দেখি ঘাসের ওপরের সব শিশির বরফকুচিতে পরিণত হয়েছে।  রাতারাতি ঘটেছে এই কাণ্ড। অর্থাৎ রাতে তাপমাত্রা নেমেছিল শূন্যের নিচে । এখন আকাশ ঝকঝকে। দেখা যাচ্ছে ফসলের ক্ষেত, সেখানে শাকসবজির সবুজ প্রাচুর্য। বাগোড়া হল কার্শিয়াং-এর সব থেকে উঁচু ভিউ পয়েন্ট। তাই যেদিকেই চাও, প্রকৃতির আঁচলে ছড়ানো মণিমুক্তা চোখে পড়ে। বর্ণনাতীত সেই সৌন্দর্য। উপত্যকা জুড়ে প্রথম সূর্যের রোশনাই। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে দিব্যি দর্শন মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার। আমার সঙ্গে অবশ্য বেশিরভাগ সময়ই আড়ি থাকে তার। এবারেও তারই পুনরাবৃত্তি। রাতে ছাদের উপর থেকে দেখা যায় দার্জিলিং, কালিম্পং ও কার্শিয়াং শহরের আলো। কিছুদূর হেঁটে গেলে জিরো পয়েন্ট, আর্মি বেস ক্যাম্প। এখানেও একটি ভিউ পয়েন্ট আছে। উপত্যকায় বহতা তিস্তার অসাধারণ এক ভিউ মেলে এখান থেকে। 

কুয়াশা জমে গাছেদের আনাচে-কানাচে

বাগোড়াকে ঘিরে রয়েছে অনেকগুলি ট্রেকিং রুট। উৎসাহীরা যেতে পারেন সিটং, লাটপাঞ্চার, চটকপুর, চিমনি। খুব কাছে ডাউহিল ফরেস্ট। যেদিকেই যাওয়া যাক, পাইনের শোভা, প্রাচীন বৃক্ষরাজির গাম্ভীর্য মুগ্ধ করে। চিমনি যাওয়ার পথে পড়বে এক পুরোনো কালী মন্দির। উপত্যকায় নানা মরশুমি ফুল বসন্তে বাহারি হয়ে ওঠে। এছাড়াও শীতে রডোড্রেনডনের স্বর্গ বাগোড়া । পাইন ছাড়াও আছে ওক ও কমলালেবুর গাছ । সকাল-সন্ধ্যায় নানা জাতের পাখির কিচিরমিচির শোনা যায়। এইসব স্বর্গীয় প্রাপ্তিসুখ নিয়ে আর একটা দিন কাটাই। আজ ব্রেকফাস্টে প্রথম বার ওয়াইওয়াই খেয়েছি। পাহাড় স্পেশাল। দুর্দান্ত স্বাদ। শীত বোধটাও কমিয়ে দেয়। ডিনারেও তারই পুনরাবৃত্তি তাই।

মন ভালো করা এই সকাল-সন্ধ্যা যেন না ফুরোয়, আমার এই প্রার্থনা কেমন করেই বা শোনেন ঈশ্বর। তিনিও তো সময়ের চাকায় বন্দি। আমার ছুটি শেষ হয়। এবার ফেরার পালা। পরের দিন হালকা লাঞ্চ করে বের হলাম। অনেকটা দূর পর্যন্ত টাইগার এল পিছু পিছু। একটা ব্যাথার খবর। পরে আর একবার বাগোড়া গিয়েছিলাম। শুনলাম টাইগার আর নেই, নেকড়ের শিকার হয়েছে সে। ফেরার পথে ডাউহিল ফরেস্ট। দিনটা সরস্বতী পুজো। স্কুলের ছেলেমেয়েরা অঞ্জলি দিয়ে ফিরছে। হাসিখুশি পোজ দিয়ে আমার ক্যামেরায় বন্দি হয় ওরা। সেই সম্ভার মনের ঝুলিতে নিয়ে পৌঁছে যাই নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। অপেক্ষা ট্রেনের। ফিরতে হবে কাজের শহরে।

জরুরি তথ্য :

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে বাগোড়া যেতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। এটা নির্ভর করে শিলিগুড়ি ও কার্শিয়াং শহরের ট্রাফিকের ওপর। হোমস্টে থেকে পিক আপ ও ড্রপের ব্যাবস্থা করা হয়। ভাড়া এক পিঠ ৩০০০ টাকার মধ্যে (বড়ো গাড়ি)। বাগডোগরা এয়ারপোর্ট থেকেও কমবেশি একই সময় ও খরচ লাগে।
 
থাকা-খাওয়ার খরচ দিন-প্রতি জন-প্রতি ১২০০ টাকা। ভাত, রুটি, ডাল, ভাজা, সবজি, ডিম, চিকেন পাবেন। ব্রেকফাস্টে টোস্ট-অমলেট, পুরি-সবজি, ওয়াইওয়াই। কাছাকাছি দোকানবাজার নেই তেমন। তাই চাহিদা অনুযায়ী সব হয়তো পাবেন না। তবে, অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপন্ন শাক-সবজির সুস্বাদ তৃপ্ত করবে। সঙ্গে ঘরে তৈরি আচার। রান্নার স্বাদও বেশ ভালো। 

বছরের যে কোনও সময়ই যেতে পারেন বাগোড়া। শুধু বর্ষাটা এড়িয়ে চলুন। শীতে জবরদস্ত ঠান্ডা পড়ে। সেই হিসেবে শীতপোশাক সঙ্গে রাখবেন। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ সব থেকে ভালো সময়। 

বিস্কুট ও শুকনো খাবার, ফ্লাস্ক, জল গরমের কেটলি, টি ও কফি ব্যাগ সঙ্গে রাখলে ভালো হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ফার্স্ট এড বক্স রাখাও দরকার। হোমস্টে’র যোগাযোগ : ৮১৪৫৭২৩১৭৭।  

Developed by DXDasia