অশনি সংকেত : সত্যজিতের বিভূতিপ্রীতি আর প্রতিটি প্রজন্মের জন্য আগাম সংকেত

বিভূতিভূষণের অসমাপ্ত উপন্যাসের প্রতি সত্যজিতের ট্রিবিউট

গঙ্গাচরণ এবং অনঙ্গ বৌ-এর চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং ববিতা

খন, মানে ১৯৭৩ সাল ও তার পরবর্তীতে এই সিনেমাটিকে বলা হয়েছিল বিদেশে নাকি সত্যজিৎ দারিদ্র রফতানি করেছেন! যদিও, ১৯৪৩ সালে লক্ষ লক্ষ মানুষ পায়ে হেঁটে কলকাতা শহরে আসা, ভাত নয়, একটুকু ফ্যানের জন্য তারা দুয়ারে দুয়ারে ঘোরা –সেসব বিস্তারিত অশনি সংকেতে দেখাননি সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের অশনি সংকেতে আসন্ন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। এ ছবিকে বলা যায়, বিভূতিভূষণের অসমাপ্ত উপন্যাসের প্রতি সত্যজিতের ট্রিবিউট। বিভূতিপ্রীতি তো বটেই এ ছবি প্রতিটি প্রজন্মের জন্য আগাম সংকেত—সংগ্রামের।

আমরা জানি, মানব-সৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষে সেদিন প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টির হাত ধরে আগমন ঘটেছিল ম্যালেরিয়া, গুটি বসন্ত এবং কলেরার। ফলস্বরূপ ১৯৪৩ পরবর্তী বেশ কয়েকবছর বাংলাদেশে স্বাভাবিক হারের চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যুর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই দুর্ভিক্ষের সর্বাধিক প্রভাব ছিল তমলুক, কাঁথি, ডায়মন্ড হারবার, ঢাকা, ফরিদপুর, নোয়াখালী জেলায়। সেদিন শুধুমাত্র বাংলার ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ধাক্কা খায়নি, ১০ লক্ষ রায়ত তাদের জমি হারিয়েছিল, মানুষের গবাদি পশু সম্পদ অত্যধিক হারে কমেছিল এবং মৃত্যু হার ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। 

বাঙালি চিত্রনাট্যকারদের উদ্দেশ্যে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংলাপ থেকে শিক্ষা নিতে। কেন বলেছিলেন, সে আলোচনায় পরে আসছি। সত্যজিতের জীবনটাই তো বদলে দিয়েছিল বিভূতিভূষণের উপন্যাস! বিভূতিভূষণের  ‘অশনি সংকেত’-এর মতো একটি অসমাপ্ত উপন্যাস নিয়েও সিনেমা দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তবে, অনেকের মতেই এ ছবি সত্যজিতের সেরা সিনেমাগুলির মধ্যে পড়ে না। চিত্রবাণী-র জনক গাস্তঁ রোবের্জও তাই  ভাবতেন। এ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “বেশিরভাগ ছবিই কাহিনি এবং বেশিরভাগ কাহিনি একটা মতাদর্শের ধাঁচে তৈরি। কেউ যদি অন্য সবরকম সিনেমা বর্জন করে এক বিশেষ সিনেমা তৈরি করতে চায়, তাকে আরো গভীরতায় গিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। আসলে তর্কটা তুলতে হবে চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে আরও অনেক বড়ো পরিপ্রেক্ষিতে, কারণ এর সঙ্গে সমাজের সব প্রসঙ্গ, তার গঠন, তার বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক ফলশ্রুতি সবই জড়িয়ে থাকে।” রোবের্জ-এর কথা মতো আরও গভীরে গিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে এ ছবি একটু বেমানান। তবু কেন ৫০ বছর বছর পর ছবিটি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন পড়লো?

পুরস্কারঃ
প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল ফর মিউজিক ডিরেকশন, নিউ দিল্লি ১৯৭৩
বেস্ট রিজিওনাল ফিল্ম, নিউ দিল্লি ১৯৭৩
গোল্ডেন বিয়ার, বার্লিন, ১৯৭৩
গোল্ডেন হুগো, শিকাগো ১৯৭৪

বিভূতিভূষণ ও সত্যজিৎ, দুজনের অশনি সংকেতেই প্রকৃতি-নিরবচ্ছিন্ন আশা-কে উপলব্ধি করা যায়। উপন্যাস ও সিনেমায় একই অভিঘাত। ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে আসন্ন দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি থাকলেও সেই ছবি শেষ অবধি নিরাশার কথা বলে না। কেউ মূল্যায়ন করতে বসলে, সে এই আশাবাদী দিকটি বুঝতে পারবে।

সত্যজিৎ রায় বিভূতিভূষণের সংলাপ থেকে শিক্ষা নিতে বোধহয় এই কারণেই বলেছিলেন, যে বিভূতিভূষণের সংলাপ পড়লে মনে হয় যেন সরাসরি লোকের মুখ থেকে কথা তুলে এনে কাগজে বসিয়ে দিয়েছেন। লেখক নিজে চরিত্রের আকৃতির কোনও বর্ণনা না দিলেও কেবলমাত্র সংলাপের গুণেই চরিত্রের চেহারাটি যেন আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও স্মরণশক্তি না থাকলে এ ধরনের সংলাপ সম্ভবপর নয়। গঙ্গাচরণ এবং অনঙ্গ বৌএর সংলাপ তো বটেই, অন্যান্য পার্শ্বচরিত্রগুলি, — দিনু ভটচায, বিশ্বাসমশাই, মতি বাগদি, কাপালীদের ছোটো বৌ-এর সংলাপগুলিও তাদের প্রকৃতি চিনিয়ে দেয়। 

এ ছবিতে কয়েকটি বড়োসড়ো পরিবর্তন তিনি করেছেন। যেমন, উপন্যাসে গঙ্গাচরণ ও অনঙ্গের দুটি সন্তান ছিল। এখানে সত্যজিৎ এই দম্পতিকে কমবয়সী ও নিঃসন্তান দেখিয়েছেন। কাহিনির শেষভাগে এই দম্পতির সন্তানসম্ভাবনার একটি আভাস দিয়েছেন পরিচালক। 

সংগীত পরিচালক সত্যজিৎ রায় এ ছবিতেও দুর্দান্ত ও যথাযথ। চলচ্চিত্রটি রঙিন হওয়ার ফলে প্রকৃতির ছবি খুব সজীব। সৌমেন্দু রায়ের চিত্রগ্রহণ আর দুলাল দত্ত’র সম্পাদনা এই ছবির সম্পদ। ছবির শুরুতেই দেখি বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর, জলভর্তি পুকুর, আর প্রসারিত ধানক্ষেত! ক্যামেরা ধীরগতিতে প্রকৃতির রূপকে প্রত্যক্ষ করে। যে দেশে এত প্রাকৃতিক প্রাচুর্য, সেখানে কেন আসবে সর্বনাশ?

ঠিক এই কারণেই গঙ্গাচরণ, অনঙ্গ বৌ, গ্রামের মুরুব্বি বিশ্বাসমশাই বা অন্যান্যরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে বিপর্যয় সমাগত। খুব ধীরে ধীরে, সন্তর্পণে, যেন তার পদক্ষেপ শোনা যাচ্ছিল। তা সত্ত্বেও যথেষ্ট গতিসম্পন্নভাবেই আমাদের চোখের সামনে সব কিছু পাল্টে যেতে থাকে।

প্রত্যেকটি চরিত্রকেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার মত জায়গা দিয়েছেন পরিচালক। তার ফলে দুর্ভিক্ষের প্রভাব যে সমাজের ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ধরা পড়েছে, তা আমাদের পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব। বড়ো চরিত্রগুলির আলোচনার আগে তিনটি চরিত্রের কথা ধরা যেতে পারে — বিশ্বাসমশাই, ভটচায ও মতি। তাদের চেহারা, হাঁটাচলা, কথাবার্তায় সেই গ্রামের তিনটি শ্রেণীর মানুষের ছাপ নির্ভুলভাবে ধরা পড়েছে।

বিশ্বাসমশাই গ্রামের মুরুব্বি। ছবির শুরুতেই তিনি ব্রাহ্মণ গঙ্গাচরণের প্রতি নিষ্ঠাবান। গ্রামে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শেখানোর জন্য তিনি উদ্যোগী স্কুল খোলার ব্যাপারে। এমনকি যুদ্ধের খবর আসার পরও কিন্তু তিনি নিরুদ্বিগ্ন ভাবে গ্রামের মানুষকে নিশ্চিন্ত থাকতে বলেন। তাঁর গোলার সঞ্চিত ধানে গ্রামবাসীদের চলে যাবে। কিন্তু শেষে তিনিও গ্রামবাসীদের অবিশ্বাসের পাত্র হয়ে প্রহৃত হয়ে গ্রামত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।

এই ছবিতে সকলেই যোগ্য অভিনেতা, সুযোগ অনুযায়ী তাঁরা সকলেই উজাড় করে দিয়েছেন। গঙ্গাচরণের ভূমিকাতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় নিশ্চয়ই তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সেই সময়কার কলকাতার যুব সমাজের প্রতীক ইমেজকে এই ছবিতে তিনি ভেঙেচুরে ফেলেছেন। ‘পরজীবী’ ব্রাহ্মণোচিত চাতুর্যে, ছলাকলায় দক্ষ, গঙ্গাচরণকে তিনি আমাদের চোখের সামনে হাজির করাতে পেরেছেন। নিজে ব্রাহ্মণ হয়ে ভটচাযের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা পরিস্ফুট। ছবির শেষে ব্রাহ্মণত্বের অহংকার যখন আক্ষরিক অর্থেই ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়, সেই মুহূর্তগুলিতেও তাঁর অভিব্যক্তি চমকপ্রদ। 

ছুটকির চরিত্রে সন্ধ্যা রায় অত্যন্ত সাবলীল। এই ধরনের চরিত্র তিনি আগে পরে অনেকবার করেছেন। কাজেই বোঝা যায় তিনি একেবারে চরিত্রের গভীরে ডুবে সাঁতার দিয়েছেন। অন্যদিকে, সত্যজিতের পরিচালনাতে বাংলাদেশের অভিনেত্রী ববিতার অসাধারণ অভিনয় আবার প্রমাণ করে চরিত্রোপযোগী শিল্পী নির্বাচনে সত্যজিতের অসীম দক্ষতার কথা। বিভূতিভূষণের অনঙ্গ বৌ হিসেবে ববিতা বিশ্বাসযোগ্য ভাবে মূর্ত হয়েছেন পর্দায়।

এই ছবি সত্যজিতের এক অসাধারণ সৃষ্টি তো বটেই, তা ছাড়া এর ঐতিহাসিক মূল্যও তো অনস্বীকার্য। অস্বীকার করা যাবে না, সত্যজিতের এই ছবিই কিন্তু বিশ্ববাসীর কাছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আপাতসুপ্ত এই নিষ্ঠুর দিকটিকে তুলে ধরছিল। তবে, এ কথাও মানতে হবে, এতবড়ো ট্র্যাজেডির পিছনে যে ব্রিটিশ রাজশক্তির চক্রান্ত ছিল, তা সেভাবে বিধৃত হয়নি। দুর্ভিক্ষটি ছিল মানুষের সৃষ্টি, কিন্তু সেই মানুষ যে ব্রিটিশ রাজ, তা ছবিতে আরও স্পষ্ট করে বলা যেত। অস্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও সাধারণ দর্শকের কাছে তা ধরা না পড়তেও পারে। তবে সেটা ছিল ১৯৪২ – ৪৩ সাল। তখন ঠিক বোঝাও হয়তো যায়নি। কিন্তু ১৯৭১ -৭২ সালে সত্যজিৎ যখন ছবি করছেন, তখন কিন্তু অনেক গবেষণা হয়েছে। অমর্ত্য সেনের গবেষণার ফল কিছুদিন পরেই (১৯৮১) বিশ্ব জুড়ে প্রকাশিত হবে। 

ছুটকির চরিত্রে সন্ধ্যা রায়

উপন্যাসে বিভূতিভূষণও এই বিষয় নিয়ে বিশেষ আলোকপাত করতে পারেননি। আগেই বলেছি, কাহিনিটি অসমাপ্ত। উপন্যাসে পণ্ডিতের স্ত্রীর একবার বীজধান ছড়িয়ে দেবার কথা আছে। কিন্তু সেটা এই কাহিনির মূল উপজীব্য নয়। অনঙ্গ বৌ বরাবরই চরম আশাবাদী, একেবারে উচ্চ মানবতার প্রতীক। তবে ‘অশনি সংকেত’ সিনেমার মূল উপজীব্য শেষের সেই কথাগুলি — ‘১৯৪৩ সালে বাংলাদেশে মানুষের সৃষ্টি এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় ৫০ লক্ষ নরনারীর মৃত্যু হয়।’

করোনা মহামারীর সময়ে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়েছিল বিশ্বজুড়ে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় মজুতদারী ও অব্যবস্থাপনা ক্ষুধার মহামারী তৈরি করেছিল। সত্তরের দশকে এমন চিত্রই ফুটিয়ে তুলেছিলেন সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায়। বক যেমন সারি বেঁধে উড়ে যায় অশনি সংকেত-এর শুরুর দৃশ্যে একঝাঁক উড়োজাহাজ উড়িয়েছিলেন তিনি। সত্যজিতের নির্মাণ তখনকার বাস্তবতায় প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে।

‘অশনি সংকেত’ প্রতিটি কালের প্রতিটি প্রজন্মের জন্য ‘আগাম সংকেত’। একটি অনিশ্চিত আর্থ-সামাজিক অবস্থা কিভাবে যে কোন সময় মানুষের সামাজিক অবস্থাকে এলোমেলো করে দিতে পারে তার একটি বিরল দৃষ্টান্ত হতে পারে এই নির্মাণ। পাশাপাশি অসংগঠিত মানবগোষ্ঠী আদতে স্রষ্টার কাছেও যে মূল্যহীন এরকম একটি কঠিন সংকেত দেয় এই সিনেমা। এমনকী রাজনৈতিকভাবে অসচেতন হলে যে অন্য রাজাদের যুদ্ধ নিজেদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় তারও একটি  সংকেত দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়।

Developed by DXDasia