ব্যবসায় সাফল্যের কাহিনি শোনাচ্ছেন প্রতিষ্ঠাতা আরশাদ শামীম
সুলতানের সুলতান, নিউ মার্কেটের কুর্তা বিপণির ‘সুলতান’ বোধহয় একজনই। আরশাদ শামীম। তিনি নিঃসন্দেহে বাংলার অন্যতম কৌশলী ব্যবসায়ী। আরশাদ ব্যবসা শুরু করেছিলেন ২০০০ সালে। বাজারের আর পাঁচজন ব্যবসায়ীর মতো ছাড় দেওয়ার পন্থায় না গিয়ে তিনি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছিলেন সঠিক সময়ের জন্য। অনেকের কাছেই নস্টালজিয়ার অপর নাম নিউ মার্কেট, যা হগ মার্কেট নামেও পরিচিত। ব্রিটিশরা নিজেদের বেচাকেনার সুবিধার জন্য এই বাজারের পত্তন করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই জায়গা বিখ্যাত হয়েছে দর্জিদের বানানো স্যুট, ব্লেজার বা পশ্চিমা পোশাকের জন্য। এখানের দোকানগুলোতে পাওয়া যায় আফগানিস্তান থেকে আমদানিকৃত সেরা ড্রাই ফ্রুট। নাহুম বা বেঙ্গল ইম্পেরিয়ালের মতো ঐতিহ্যবাহী বিপণির পাশাপাশি ব্যবসায় উন্নতি করেছিল অ্যাংলো এবং পার্সিদের চালিত দোকানগুলি। মোটকথা বাজারটিতে বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং পণ্যের মিশ্রণ ঘটেছে। ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার সংমিশ্রণে আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে নিউ মার্কেট। আরশাদ শামীমের মতো উদ্যোক্তাদের অভিনব রিটেল ফরম্যাট উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিউ মার্কেটের রূপান্তর বোঝা যায়।

আরশাদ শামীম
মান্যবরের মতো ব্র্যান্ডগুলো বিশেষ ভাবে ধনী, উচ্চবিত্ত গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ নিয়ে মাথা ঘামায় সেখানে সুলতান-এর লক্ষ্য মধ্যবিত্ত। সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো এথনিক পোশাক বিক্রির ব্যবসায়ীক বোঝাপড়াই তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে।
২০০১ সালে চমকে দেওয়ার মতো একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন আরশাদ। রমজান মাসে মাত্র ৯৯ টাকায় এক বছরের গ্যারান্টি সহ কুর্তার অফার চালু করেন তাঁর বিপণি সুলতান-এ। ক্রেতারা সেই অফার লুফে নিয়েছিল। কুর্তা কেনার জন্য তাঁর দোকানের বাইরে লম্বা লাইন পড়ে যায়। এক ঘণ্টার মধ্যে সব স্টক নিঃশেষ হয়ে গিয়ে দোকানের বাইরে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। চ্যালেঞ্জ থাকা স্বত্বেও আরশাদের কৌশলগত এই পদক্ষেপ ফলপ্রসূ হয়। জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সুলতান এবং তাঁর ব্র্যান্ড জাতিগত পুরুষদের পোশাকের রিটেল ব্যবসায় নতুন মানদণ্ড নির্ধারন করে।
আরশাদ শামীমের গল্প সত্যিই অনুপ্রেরণা দেয়। নিবেদিতপ্রাণ পোশাক ব্যবসায়ী পরিবারে তাঁর জন্ম। পারিবারিক ব্যবসা ছিল মহিলাদের এথনিক পোশাক নিয়ে। তিনি চেয়েছিলেন কলকাতায় পোশাক প্রস্তুতকারকদের কেন্দ্রস্থল চিৎপুরের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যবসাকে বাড়িয়ে নিয়ে যাবেন। পাঁচ লাখ টকার সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করতে আসা আরশাদ তাঁর পরিশ্রম, অধ্যাবসায় ও কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছেন। ব্যবসার জন্য তিনি পুরুষদের এথনিক পোষাক বেছে নিয়েছিলেন কারণ, তাঁর মনে হয়েছিল মহিলাদের পোশাকের বাজারে নিরিখে এটা পিছিয়ে আছে। নিজের ব্যবসার প্রতি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এবং লকডাউনের আগে জাকারিয়া স্ট্রিটের রাস্তায় নিজেই ‘সুলতান কুর্তা’-র প্রচার করতেন।

ব্যবসার প্রতি আরশাদের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবসম্মত কারণ, মান্যবরের মতো ব্র্যান্ডগুলো বিশেষ ভাবে ধনী, উচ্চবিত্ত গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ নিয়ে মাথা ঘামায় সেখানে সুলতান-এর লক্ষ্য মধ্যবিত্ত। সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো এথনিক পোশাক বিক্রির ব্যবসায়ীক বোঝাপড়াই তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছে। প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও, সুলতান-এর ব্যবসায়ীক উন্নতি নিয়ে আত্মবিশ্বাসী তিনি। মধ্যবিত্তের জন্য তাঁর ব্র্যান্ডকে মান্যবরের সমতুল্য হিসেবে দেখেন। উদ্যোক্তা হিসেবে আরশাদের সাফল্য উদাহরণযোগ্য।
আরশাদ শামীমের মতে, সাশ্রয়ী মূল্যে সেরা মানের কুর্তা কিনতে হলে আসতে হবে সুলতান-এ। বোঝা যায়, এই আত্মবিশ্বাসই বাণিজ্যমহলে তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে। দু-দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের ব্যবসাকে বাংলা থেকে গোটা দেশে, দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে দিতে সফল হয়েছেন। আরশাদ গর্ব করে বলেন, “উৎপাদনের নিরিখে সুলতান-ই ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম কুর্তা উৎপাদনকারী”।

ব্যক্তিগত পছন্দের জায়গা থেকে ব্যবসার বিশেষত্ব হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন দামী শেরিওয়ানি-কুর্তা। কিন্তু, দামী পোশাককে তিনি করে তুললেন সহজলভ্য। ব্যবসার জন্য এই কৌশলই বেছে নিয়েছিলেন আরশাদ। শুধু তাই নয়, বাংলার সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণেও ভূমিকা রেখেছে সুলতান। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের পছন্দ পোষাক কুর্তা, সুলতানের সাফল্যে তাঁদেরও অবদান আছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাকের প্রতি ভালোবাসা এবং সহজলভ্যতাই সুলতান-কে ব্র্যান্ড হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
বিজ্ঞাপন এবং ছাড় দেওয়ার পাশাপাশি ব্র্যান্ডের চাহিদা বাড়াতে আরশাদ অন্যান্য ব্যবসায়ীক কৌশলও অনুসরণ করেন। তাঁর সবথেকে বড়ো সম্পদ নম্রতা। একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে, কলকাতায় ১৪টির বেশি শোরুম সহ ব্র্যান্ডকে দেশে-বিদেশের মাটিতে পৌঁছে দিয়েও তিনি রাস্তায় নেমে ব্যক্তিগত ভাবে প্রচার চালিয়ে যান এখনও। এই নিবেদিতপ্রাণ মনোভাব এবং মাটির কাছাকাছি থাকার স্বভাব ‘সুলতান : দ্য কিং অফ কুর্তা’-র সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

আরশাদ এমন একটি তথ্য দিয়েছেন, যা থেকে তাঁর এই ‘ডাউন টু আর্থ’ স্বভাবটি নিয়ে ধারণা আরও স্পষ্ট হবে। একবার, দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে কুর্তা বিক্রি করার সময় আরশাদ লক্ষ্য করেন, এক ব্যক্তি অনেকক্ষণ ধরে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। লোকটিকে চোর ভেবে নিয়ে সজাগ হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকটি তাঁর কাছে এসে জানতে চান যে আরশাদের কোনও ভাই আছে কিনা, যে মার্সিডিজ চালায়। আরশাদ বলেন, মার্সিডিজটা তিনিই চালাচ্ছিলেন। এত প্রতিপত্তি সত্ত্বেও এভাবে আরও তিনবছর ব্যবসার কাজ সামলাতে চান তিনি। তারপর অবসর নিয়ে যুক্ত হতে চান শিক্ষা ক্ষেত্রে, কোনও শিশুকে যাতে ক্ষুধার্ত হয়ে ঘুমাতে না হয় তা নিশ্চিত করতে।
_________
মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে ।