উত্তরবঙ্গে ক্ষুধার্ত মানুষদের কাছে প্রতিদিন খাবার পৌঁছে দিচ্ছে এই ‘বেকার’ সংগঠন

তাঁদের সংগঠনের নাম ‘আমরা বেকার’

তাঁরা কেউ সেভাবে চাকরি করেন না। তবুও প্রতিদিন রাতে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা উপেক্ষা করে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা অসহায় ক্ষুধার্ত মানুষদের খাওয়ানো তাঁদের নৈতিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। এসব কাজ দেখে কেউ কেউ আবার পিছনে টিপ্পনি কাটে, মুচকি হাসে – ধ্যুৎ! এসব করে কী হবে! বেকার! আর এসব শুনে তাঁদের মনে আরও বেশি করে ক্ষুধার্তদের পেট পুরে খাওয়ানোর জেদ চেপেছে। তাই সংগঠনের নামই রেখে দিয়েছেন ‘আমরা বেকার’

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের করিডরে পড়ে থাকা মানুষ থেকে মেডিকেল মোড়, কাওয়াখালি, নৌকাঘাট মোড়ে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা মোট কুড়ি থেকে পঁচিশ জন মানুষকে প্রতিদিন রাতের খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন ‘আমরা বেকার’ সংগঠনের সদস্যরা।

ফুটপাথে থাকা মানুষদের খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন সংগঠনের কর্মীরা | নিজস্ব চিত্র 

মার্চ, ২০১৯ থেকে তাঁদের এই মানবিক কাজের কর্মসূচি শুরু হয়। প্রথমে দশজন মিলে স্রেফ আড্ডার মধ্যে আলোচনা থেকে শুরু এই মানবিক ব্রত, এখন তা ১৮ জনে পৌঁছেছে। সদস্যদের সকলের মাসিক চাঁদা ১০০ টাকা। তারপর মানুষের কাছ থেকেই খাদ্য সংগ্রহ। ‘আমরা বেকার’ সংগঠনের সজল দত্ত, স্বপন দাস, বিবর্তন সাহা রায়, আশিস সিং, আনবিসরা কারও কাছ থেকে চাল, কারও কাছ থেকে ডাল, কারও কাছ থেকে পনির বা সয়াবিন সংগ্রহ করেন৷ সন্ধে থেকে রাত আটটার মধ্যে মেডিকেল কলেজের কাছে বিবর্তন সাহা রায়-এর দোকানের পিছনে তাঁরা নিজেরাই রান্নাবান্না করে ফেলেন। শীত হোক বা বর্ষা, নিজেরাই স্কুটি নিয়ে পালা করে বেরিয়ে পড়েন সেই রান্না করা খাবার বিলি করতে। কোনওদিন বাদ যায় না, প্রতিদিন চলছে তাঁদের এই রাতের খাবার বিলি। সজল বলেন, “আমরা তো সবাই রাতে যে যার বাড়িতে পেট পুরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। কিন্তু রাস্তার ধারে এইসব ভবঘুরেরা না খেয়ে রাত কাটায়। কেন আমরা এদের কথা ভাবতে পারি না? এদের মধ্যে কেউ মানসিক ভারসাম্যহীন, কেউ কথা বলতে পারে না। কিন্তু এদেরও খাদ্য চাই। তাই আমাদের এই সামান্য প্রয়াস।”

ফুটপাথে থাকা মানুষদের খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন সংগঠনের কর্মীরা | নিজস্ব চিত্র 

সজল, স্বপন, বিবর্তনদের কেউই সেভাবে বড়ো টাকার মাস মাইনের চাকরি করেন না। কেউ সামান্য প্রাইভেট টিউশন করেন, কেউ চুক্তির ভিত্তিতে মেডিকেলেই চাকরি করেন, কেউ আবার ব্যবসা করেন। এই সামান্য রোজগারের মধ্যেও ইচ্ছে থাকলে অসামান্য কাজ যে করা যায় তা এই রোজকার প্রয়াস দিয়েই বুঝিয়ে দিচ্ছেন। আর পিছনে কাজ না করা টিপ্পনিবাজদের – “বেকার! এসব করে কী হবে” মন্তব্যকে পাত্তা দিতে চান না। আর এই কাজের জন্য সজল, স্বপনরা কারও কাছ থেকে পুরস্কারও আশা করেন না। তবে “টানা নয় মাসের বেশি সময় ধরে ওইসব অসহায় ক্ষুধার্ত মানুষদের কাছে খাবার নিয়ে যেতে যেতে এখন সেই ক্ষুধার্তদের কেউ কেউ চিনে গিয়েছে। কেউ তাঁদের দিকে হাসি মুখে তাকায়, ‘বেটা’ সম্বোধন করে। এটাই আমাদের কাছে বড়ো পুরস্কার”, জানান সজল। তাঁর কথায়, “জানি না আমরা কতদিন কী করতে পারব, তবে চেষ্টা তো চলবে।”

এখন অবশ্য একটু সাহস করে কখনো ডুয়ার্সের বন্ধ চা বাগানে গিয়েও খাবার বা বস্ত্র বিতরণের সাহস করেন তাঁরা। আর অপর্ণা জানা, পিঙ্কি সিংহ, সোমা রায়, নাসত হুসনেতরাও যোগ দিয়েছেন এই সংস্থায়। এই কাজ দেখে কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কি বলতে পারে, ওরা বেকার!?

Developed by DXDasia