উত্তরবঙ্গে নিষিদ্ধ পল্লীর মেয়েদের নতুন দিশা দেখাচ্ছেন আমোস শেরিং ও তাঁর সংস্থা

উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন নিষিদ্ধ পল্লী এলাকায় বিউটিশিয়ান, মডেলিং, ব্রাইডল মেকাপ-সহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে

ত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি ছাড়াও জলপাইগুড়ি, দিনহাটা, আলিপুরদুয়ার এলাকায় যেসব নিষিদ্ধ পল্লী রয়েছে, সেখানকার পরবর্তী প্রজন্ম যাতে কোনওভাবেই ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত না হয় তার জন্য বিশেষ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ পল্লী এলাকায় সম্ভাবনাময় ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষার পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী অন্য শিক্ষা – যেমন বিউটিশিয়ান, মডেলিং প্রভৃতি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে। অর্থের অভাবে তাঁরা যাতে সেই পেশায় কখনো পা না দেয়, সেজন্য তাদের স্বনির্ভরতার পাঠ দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি শিলিগুড়ির একজন রাজ্য মডেলিং প্রতিযোগিতার ফ্যাশন শো-তে তিনটি পুরস্কারও নিয়ে এসেছেন।

প্রকৃতপক্ষে ওয়ার্ল্ড ভিশন নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এই বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সেই সংস্থার সমাজসেবী আমোস শেরিং জানিয়েছেন, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন নিষিদ্ধ পল্লী এলাকায় তাঁরা বিউটিশিয়ান, মডেলিং, ব্রাইডল মেকাপ-সহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ শুরু করেছেন। গতবছর ১৮ জন বিউটিশিয়ান কোর্স শেষ করেছেন। চলতি বছরে ৩০ জন এই কোর্স শেষ করেছেন। আবার যাঁরা পড়াশোনায় ভালো, তাঁদের মেধা বিচার করে স্কলারশিপও দেওয়া হচ্ছে। মূল কথা হল শিক্ষা এবং হাতের কাজ। তার সঙ্গে সঠিক কাউন্সেলিং করা, যাতে তাঁরা অন্ধকার পথে পা না বাড়ান।

তবে আমোসবাবুরা উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, লকডাউনের জেরে সবকিছু অনলাইন হওয়াতে মেয়ে পাচারকারীরাও অনলাইনে থাবা বসাতে শুরু করেছে। গত একবছরে ডুয়ার্স এবং উত্তরবঙ্গের সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাচার করার পথে এরকম ২৭ জন মেয়েকে উদ্ধার করা গেছে। কাউকে ভুয়ো বিয়ে, কাউকে ভুয়ো চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিল্লি, বেঙ্গালুরু বা বিহারে পাচার করা হচ্ছিল। অনলাইনে নানা কৌশলে মেয়েদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে ফেলছে পাচারকারীরা। তারপর সুকৌশলে নিষিদ্ধ পল্লী এলাকায় বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। তাই মেয়েদের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। অনলাইনে ক্লাস করার ফাঁকে অজানা অচেনার সঙ্গে চ্যাটিং করার সময় সাবধান হতে হবে।

উত্তরবঙ্গের নেপাল ও বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে মেয়ে পাচার ঠেকাতে বহু দিন ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন আমোসবাবুরা। খড়িবাড়ি ফাঁসিদেওয়া এলাকায় ৩,৫০০ জন মেয়েকে নিয়ে তাঁরা গঠন করেছেন ‘গার্ল পাওয়ার গ্রুপ’। যাতে পাচার সংক্রান্ত কোনও সন্দেহজনক কিছু হলেই সব মেয়েরা একসঙ্গে সচেতন হয়ে রুখে দিতে পারেন। কিশোরী মেয়েদের অভিভাবকদের নিয়েও গঠিত হয়েছে আলাদা ‘মেন্স গ্রুপ’। এছাড়া মেয়েদের সেল্ফ ডিফেন্স, পথনাটক প্রভৃতির মাধ্যমেও সচেতন এবং প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। মেয়ে পাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ ঠেকাতে আমোসবাবুরা রেল পুলিশ, এসএসবি এবং বিএসএফ জওয়ানদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যাতে সীমান্তে পিছু হটে পাচারকারীরা।

ওইসব ব্যতিক্রমী কাজের পাশাপাশি আমোসবাবুরা পাঁচ বন্ধু মিলে লকডাউনের সময় থেকে প্রতি রাতে শিলিগুড়ি শহরে অভুক্ত মানুষদের রুটি সবজি-সহ রান্না করা খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন নিয়মিত। লকডাউনের সময় শিলিগুড়িতে বাইরে থেকে এসে আটকে পড়া ৩০ জন মানুষকেও তাঁরা টিকিট কেটে নিজ নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। কোচবিহার হলদিবাড়ি নিবাসী কৃষক পরিবারের দুই দুঃস্থ মেধাবী ছাত্র ল্যাপটপের অভাবে ডাক্তারির অনলাইন ক্লাস করতে না পারলে তাদের ল্যাপটপ কিনে দিয়েছেন আমোসবাবুরা। কিন্তু কেন এত কাজ, প্রশ্ন করলে আমোসবাবু বলেন, “এটা আমাদের নেশা। দুঃস্থ, অসহায় মানুষের পাশে আমরা থাকবো না আবার নিজেদের সমাজবদ্ধ প্রাণী, বুদ্ধিমান প্রাণী বলবো কেন? মান হুঁশ থেকেই মানুষ। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে যদি নাইবা থাকলাম তবে আমরা কীসের মানুষ?”

Developed by DXDasia