
‘আলো মামার তেহারি’ কিংবা ‘কালা ভুনা মাংস’র স্বাদ চেনাচ্ছেন আলপনা হাবিব
আলপনা হাবিবের রান্নার প্রতি আগ্রহ ছোট থেকেই। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রান্নার গুণের কথা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বাড়িতেই শুরু করেন রান্নার ক্লাস। টেলিভিশনে তাঁর রান্নার অনুষ্ঠান অসামান্য জনপ্রিয় হয়। আজ তাঁর ইউটিউব চ্যানেলের গ্রাহক ৬০,০০০-এর বেশি। উইমেন ইন লিডারশিপ ও ব্র্যান্ড ফোরাম কর্তৃক ‘ইন্সপায়ারিং ওমেন ইন কুলিনারী আর্ট ২০১৭’ নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকার বাসিন্দা আলপনা। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দ্বিভাষিক বই ‘আলপনার রান্না’, যেখানে পাওয়া যাবে ২৫০টি রান্নার রেসিপি। ‘বঙ্গদর্শন’-এর পক্ষ থেকে আলপনা হাবিবের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন সুমন সাধু।

• আপাদমস্তক ‘রাঁধুনি’, এই ব্যাপারটার এত বড় মাত্রা কীভাবে পেল?
আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, তখন আমাদের বাংলাদেশের রান্নার পুরোধা সিদ্দিকা কবীর একটা রান্নার বই বের করেন ‘রান্না খাদ্য পুষ্টি’। সেই ’৭৬ সাল থেকেই উনি আমাদের পিৎজা বানানো শিখিয়েছেন। ওঁর বই থেকেই প্রথম শিখি পরিমাপের ব্যবহার। প্রতিবার পরিমাপ এক থাকলে সকলের হাতেই তার স্বাদ একইরকম হবে। এটা নিয়েই আমার বইটি তৈরি হয়েছে। সিদ্দিকা কবীরের সেই বই দেখে রান্না শুরু করলাম, আমার বেশ সুনাম হল, প্রশংসা পেলাম চারদিক থেকে। ক্লাস সিক্স থেকেই রান্না করাটা আমার নেশা হয়ে গেল। একটা সাধারণ রান্নাতে নিজস্বতা দিয়ে তাঁকে আরও ইন্টারেস্টিং করার ভূত মাথায় চাপল। সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে, আমার কাছে যে খাবার মুখে দিলে হৃদয় স্পর্শ করবে, সেটাই হচ্ছে খাদ্য। যতই সাজিয়ে গুছিয়ে পরিবেশন করা হোক না কেন, রান্নার স্বাদ না হলে সেটা প্রাণ ছোঁবে না। তাই আমি চেষ্টা করি আমার প্রতিটা রান্নাকে সুস্বাদু করতে। আগে নিজের জন্য করতাম, এখন খুব ইচ্ছা অন্যেরা আমার রান্না কতটা গ্রহণ করছে সেটা দেখবার। আমি নিজেও তো শিখছি, আর অন্যদের শেখাতেও দারুণ লাগে। আমার স্কুলের কলিগরা বলল তুমি বাড়িতে একটা ক্লাস নাও। তোমার রান্না আমরা শিখতে চাই। তারপর ওদের শেখাতে শুরু করলাম। এখন কত লোক আমায় মেসেজ করেন। কেউ বলেন “দিদি আপনার রান্না করে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছি”, কেউ বলেন “আমার নতুন বিয়ে হয়েছে। আমার রান্না খেয়ে বর খুশি হয়ে গেছে। নতুন করে প্রেমে পড়েছে আমার।” এগুলো আমার সবচাইতে বড় পাওয়া। আমার খুব ইচ্ছা ছিল জীবদ্দশায় প্রিয় রান্নাগুলোকে লিপিবদ্ধ করে মানুষকে দিয়ে যাব এবং আমি যখন থাকব না, তখন কিন্তু তাদের মাঝে বেঁচে থাকব। ‘আলপনার রান্না’ বইটা তৈরি করতে আমার চারবছর সময় লেগেছে। এই বইয়ের ২৫০ রান্নার রেসিপি আগে নিজে রপ্ত করেছি। আর মানুষকে তখনই জিনিসটা দিই, যখন কনফিডেন্ট থাকি। দেশ-বিদেশে এখন আমার দুই কোটি ভক্ত রয়েছে ইউটিউবে। তাঁরা সবাই রেঁধেছেন এবং উপকৃত হয়েছেন। বইটাও যার জন্য দ্বিভাষিক, বাংলা এবং ইংরাজি দুই ভাষাতেই লেখা আছে।
• এই রান্নার বইটির ভেতরে কতটা বাংলাদেশ এবং কতটা পৃথিবী রয়েছে?
আমার কোথাও কিছু খেয়ে ভালো লাগলে সেটা রপ্ত করার চেষ্টা করি। অনেক মানুষের কাছে পাওয়া অনেক রেসিপি আছে এরকম। ধরুন আমাদের দেশে তো অনেকেই ভর্তা খায়। আলু আর কালোজিরার ভর্তা কজন খায়! আলুকে পেঁয়াজ কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ব্লেন্ড করে সেটাকে তেলে ভুনে ভুনে যখন ওটা সেদ্ধ হয়ে আসে, তখন কালোজিরা মিশিয়ে দারুণ একটা রান্না তৈরি হয়ে যায়। আমার বইটার মধ্যে বাঙালি রান্নাই আছে, যার মধ্যে রয়েছে একটা বিশেষত্ব।
• এই বিশেষত্বকে কীভাবে নির্ধারণ করেন?
সাধারণকে আমি অসাধারণ করে তুলি নিজের কিছু টুইস্ট দিয়ে। এখন তো নানারকম ফিউশন রান্না হচ্ছে। যেমন ইলিশ পোলাও। ইলিশ পোলাও আমাদের ওখানে যখন করে, তখন খুব হালকা মশলায় নারকেলের দুধ দিয়ে ইলিশটা রাঁধে। আমি করলাম কি, ইলিশের মধ্যে একটু মরিচা দিলাম যাতে সোনালি রং হয় এবং নারকেলের দুধ দিয়ে কষিয়ে নিয়ে পোলাও-এর মধ্যে একটু মশলা দিয়ে ওর ভেতরে মাছ ঢোকালাম। পোলাওটা যখন হয়ে গেল তখন উপর দিয়েই আস্তে করে মাছ বসিয়ে তার উপরে ঝোল ঢেলে দিলাম। এটা খেলে পারফেক্ট একটা ইলিশ পোলাও-এর স্বাদ পাওয়া যাবে।
• আপনার রান্নার পর পরিবেশন কতটা ম্যাটার করে?
দেখুন, আমি কিন্তু নিজেকে শেফ বলি না। শেফের অনেক দায়বদ্ধতা থাকে। আমি নিজেকে হ্যাপি হোম কুক (সুখী ঘরোয়া রাঁধুনি) বলি। ঘরে ঘরে মা-মাসিরা যেমন সবাইকে নিয়ে হইহই করে খাবে, আমার হচ্ছে তাই। যেটা জীবনের কাজে লাগে। পরিবেশন আমার কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ না। কিন্তু পরিবেশনের পাত্রটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন আপনি একটি ছোট বাটিতে ঠেসে ঠুসে মাংস ভরে দিলেন, তাহলে সেই খাবারটির মৃত্যু হয় সেখানেই। এই পরিমিতিবোধটা আমার আছে।
• আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আপনি কি রান্নার ক্লাস নিয়মিত নেন?
খুব নিয়মিত হয় না। তবে যখন একটা গ্রুপ তৈরি হয়ে যায় তখন ক্লাস নিই। শুধুমাত্র যে ক্লাস হয় এমনটা না, প্রচুর গল্পগাছা হয় আমাদের মধ্যে। ছোটবেলা, স্কুলজীবন, পরবর্তী জীবন সবকিছু নিয়ে আমাদের দারুণ আড্ডা জমে। ওরা তো চারটে রান্না শিখবে বলে আসে, তারপর দেখা যায় কুড়িটা রান্না শিখে ফেলেছে। দিদি এটা কী, দিদি ওটা কীভাবে করব এসব করতে করতে অনেক রান্না তারা শিখে নিয়ে যায়।
