‘আমরা আসলে ছেলেবেলা ভুলে থাকার ভান করি’

স্বপ্নের ধারাবাহিকতা অনেকটা জেলির মতো। জানাচ্ছেন সৌকর্য ঘোষাল

‘রেনবো জেলি’-র পরিচালক সৌকর্য ঘোষাল। বঙ্গদর্শনের পক্ষ থেকে, তাঁর মুখোমুখি সুমন সাধু। 

• আপনি ‘রেনবো জেলি’র মতো রূপকথার ছবি বানিয়েছেন। আপনার টার্গেট অডিয়েন্স কারা? শিশু-কিশোর, নাকি প্রাপ্তবয়স্করা?

এই ছবি একটা ছেলেবেলার গল্প। ছেলেবেলায় তো সবাই বাঁচে। শিশুদের সাথে বড়রাও। ছেলেবেলাটা অনেকে হারিয়ে ফেলে, অনেকে হারিয়ে ফেলে না ঠিকই, কিন্তু ছেলেবেলার কাছে আমরা সবসময় ফিরে যাই। যে-কোনও ক্রাইসিসে বা যে-কোনো কষ্টে বা আমাদের মধ্যে যখন সেই ছেলেবেলাটা বেরিয়ে আসে তখন কখনও আনন্দে লাফিয়ে উঠি, কখনও লুকিয়ে কাঁদি। আমরা আসলে ছেলেবেলা ভুলে থাকার ভান করি। কিছু মানুষ এমন থাকতে পারেন যাদের চামড়া গণ্ডারিয়ার মতো মোটা হয়ে গেছে। তারা বড্ড অসামঞ্জস্য হয়ে যায়, কিন্তু সংখ্যায় তারা বড্ড কম। সেইজন্য রেনবো জেলি ছেলেবেলার ছবি এবং সে কারণেই ইউনিভার্সাল।

• রেনবো জেলি নামটা কোথা থেকে এসেছে? রেনবো কেন এবং জেলি কেন?

দ্যাখো, জেলি বাচ্চাদের খুব প্রিয় একটা খাবার। রেনবো নামটা এসেছিল সাতটা রঙের রেফারেন্স থেকে। তাই খাবার আর রং থেকেই এই ফ্যান্টাসি ব্যাপারটা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া আমাদের ছবি একটা স্বপ্নের কথা বলে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় সেই স্বপ্নের ধারাবাহিকতা অনেকটা জেলির মতো। সেটা লিকুয়িড নয়, আবার সলিডও নয়। এখান থেকেই নামটা এসেছে।

• সত্যজিৎ রায় ‘হীরক রাজার দেশে’র মতো চরম প্রহসনধর্মী ছবি বানিয়েছিলেন, যার একটা শক্তিশালী অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল। তাঁর মতো পরিচালকের কাজ কি আপনাকে এরকম রূপকথা বানাতে অনুপ্রাণিত করেছিল?

প্রজেক্ট ভিত্তিক ইন্সপিরেশন তো হয় না। আর আমার ইন্সপিরেশনে বেশিরভাগ জুড়েই ছিলেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর ম্যাক্সিমাম লেখা পড়ে সেটা তৈরি হয়েছিল। লেখা তো অনেকেরই পড়েছি। কিন্তু সত্যজিৎ আমার কাছে ধরা দিয়েছিলেন কেননা তাঁর লেখা ভীষণভাবে রিলেট করতে পেরেছি বলে। আর ফিল্মের দিক থেকে সত্যজিৎ যে পথটা পার করে এসেছেন, সেই পথে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের মতো করেই সবটা ভাবতে হবে। কবীর সুমনের ওই গানটার মতো “তখন আবার গল্প হবে রহস্যতেই ভর করে, ছুটবে আবার কল্পনাটা সত্যজিতের পথ ধরে।” আবার তিনি তো আমাদের জন্য কিছু ছেড়েও গেছেন। আর এই ছবিতে সরাসরি লীলা মজুমদারের রেফারেন্স নেই। তাঁর লেখার ছাত্র হয়ে আমার মনে হয়েছিল সেই গল্পগুলোর আত্মাকে নিয়ে আমি আমার মতো করে লিখব এখনকার প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে।

• আপনি এমন একটা বিষয় নির্বাচন করেছেন যেখানে একটা শিশুর মধ্যে ঘিরে রয়েছে আত্মমগ্নতা। কিংবা যদি অটিজমের দিক থেকে ব্যাখ্যা করতে চাই। আপনি কি তাদের জগতে ঢুকে তাদের জগতটাকেই বুঝতে চান?

মহাব্রত অটিস্টিক নয়। মহাব্রত যখন জন্মেছিল তখন সেপ্টিসেমিয়া হয়েছিল বলে একটা নিউরোলজিকাল প্রবলেম আছে। সে কারণে ও একজন স্পেশাল চাইল্ড। স্পেশাল চাইল্ড নট অ্যাট অল অটিস্টিক ওনলি। মহাব্রতর মধ্যে যে আত্মমগ্নতা আছে তার জন্য অনেক সুবিধাও হয়েছে। মহাব্রত একমাত্র অভিনেতা আমার জীবনে ফেস করা, যার অনুভূতি বিদ্যুতের মতো স্ট্রং। আমরা যখন ওয়ার্কশপ করতাম বা অভিনয়গুলো করে দেখাতাম আমি, কখনও গন্ডারিয়া হতাম কখনও পরি পিসি হতাম, কখনও ঘোঁতন হতাম। এই অভিনয়গুলোকে সে আত্মস্থ করত। প্রত্যেকেরই কম বেশি ইগো থাকে। ইগো মানে আমরা সবসময় অহং ভাবি। তা তো নয়। ইগো মানে একটা সেন্স অফ সেলফনেস। মহাব্রতর এই সেন্সটা হয়ত বা নেই, আবার পুরোটাই আছে। হুবহু সেটাকে আত্মস্থ করা, এরকম অভিনেতা আমি কোনওদিন পাইনি। যদি না তিনি ইরফান খান, রাজকুমার রাও বা কৌশিক গাঙ্গুলি না হন, যদি তিনি নতুন অভিনেতা হন তাহলে তার এই সেন্স থাকাটা প্রয়োজন। পরিচালক নানারকম ওয়ার্কশপ বা চর্চার দ্বারা যদি এই জিনিসটা অভিনেতার মননে প্রবেশ করাতে পারেন, তাহলেই ম্যাজিকটা হয়।

• আপনার ছবিতে ঘোঁতনকে একটু অন্যরকমভাবে দেখানো হয়েছে। যেখানে সে বয়ঃসন্ধির রোমাঞ্চগুলির সাথে নিজেকে যুক্ত করতে চাইছে। আপনি কি প্রচলিত ধারণাগুলিকে অতিক্রম করতে চেয়েছেন?

না তা নয়। দ্যাখো, আমি যখন লিখেছি গল্পটা তখন ঘোঁতনের চোখ দিয়ে দুনিয়াটাকে দেখার চেষ্টা করেছি মাত্র।

• তাহলে কি ওদের জগতে ঢুকে ওদের জগতটাকেই বোঝার চেষ্টা?

আমি সেভাবেও বলব না। কারণ ওদের জগতটাকে আমরা কতটাই বা বুঝতে পারব। আমরা তো বাইরে থেকে কয়েকটা প্যারামিটার টেস্ট করব মাত্র। আমরা আহা উহু করে কয়েকটা ওয়ার্কশপের মধ্যে দিয়ে বা স্পেশাল ইন্সট্রাকটরের মধ্যে দিয়ে শেখানোর চেষ্টা করব। কিন্তু এটা আমার কাছে হাস্যকর লাগে। মন বিষয়টা খুব কঠিন ও জটিল। মনের অতল পৃথিবীর দিকপাল ঋষিরা ছাড়া কেউ পাননি। রেনবো জেলির প্রথম টিজার যখন করেছিলাম তখন পৃথিবীর স্পেশাল চাইল্ডদের নিয়ে একটা ভিডিও বানিয়েছিলাম। তার মধ্যে ছিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, স্টিভ জোবস, পাবলো পিকাসো, ড্যানিয়েল র্যা ডক্লিফ প্রমুখেরা। এখন তাঁদের কেউ ভুলেও বলবে না স্পেশাল চাইল্ড। নিজের মনের জোরটা কখন কে নিয়ে যাবে সেটা কেউ জানে না। আমি যখন লিখেছিলাম তখন এটাই দেখেছিলাম যে, কতটা চরিত্রের মধ্যে ঢুকে ঘোঁতনকে আবিষ্কার করতে পারছি। তাকে সবাই স্পেশাল চাইল্ড বলে, সে এটা জানেও। কিন্তু এটা জানে না যে স্পেশাল চাইল্ড আসলে কী! গোটা পৃথিবীটা স্পেশাল নয় কিনা, সেখানে শুধুমাত্র সে-ই নর্মাল কিনা।

• আপনি বলছেন পরি পিসি চরিত্রটা লীলা মজুমদারের কোনো গল্পের সূত্র ধরে আসেনি?

আমি বলছি গল্পের আত্মাটা লীলা মজুমদারের সূত্র ধরেই আসবে। কারণ উনি আমার লেখার বা দেখার চোখকে তৈরি করেছেন। পরি পিসি আসলে স্বপ্নের দূত। স্বপ্ন সম্পর্কিত যে বিখ্যাত ওয়েল এস্টাবলিস্ট চিরাচরিত ভাবনা, এগুলোর বাইরেও ভেবে দ্যাখো স্বপ্ন কিন্তু সহজে ধরা দেয় না। আমি এই স্বপ্নটাকে বোঝার চেষ্টা করেছি। আমার বিশ্বাস এগুলো ছাড়াও স্বপ্ন কসমিক রিদম দ্বারা নির্ধারিত। স্বপ্ন কখনও কখনও যদি উপর থেকে তারাদের নির্দেশও হয়, তাহলে পরি পিসি সেই স্বপ্নের প্রতিনিধি, যে ঘুমের মধ্যে এসে পিছলে যাওয়া পাসওয়ার্ডগুলো বোঝার চেষ্টা করে। পরি পিসি নামটা পদী পিসির সাথে সম্পর্কিত, যার জন্য বর্মি বাক্সও আছে। এটুকুই।

• দর্শক কীভাবে আপনার ছবিকে স্বাগত জানিয়েছে?

এটা তো অভাবনীয়। তিন সপ্তাহে দশখানা হাউজফুল আমি সত্যিই ভাবতে পারিনি। ধরা যাক একটা বড় ছবি সত্তরটা হলে রিলিজ করেছে এবং তিন থেকে চারটে শো পেয়েছে। সেটা সপ্তাহের শেষে এসে দেখা যাবে গড়ে ৪০০ থেকে ৪৫০ শো। প্রায় এক কোটি টাকা রোজগার করছে। আর আমরা সর্বসাকুল্যে শো পেয়েছি ২৭টা। রোজগার করেছি ধরো ১২ লাখ থেকে ১৪ লাখ টাকা। অঙ্কের হিসাবে এটা কম হতে পারে। কিন্তু পার্সেন্টেজের হিসাবে অনেক অনেক বেশি। আর যে ছবিতে কোনো স্টার নেই, যে ছবির পরিচালক স্টার নয় এবং যে ছবি রয়েছে বড় বড় ব্লকব্লাস্টারের মাঝখানে। দর্শকের জন্যই এটা সম্ভব হয়েছে।

• খাবার নিয়ে আমাদের ফ্যান্টাসি এ ছবির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

খাবার বলা ভুল হবে, ছবিটা স্বাদের উপর নির্ভর করে। আমার মনে হয় সিনেমাটা অডিও ভিসুয়াল মিডিয়াম। আমরা ছবি করার সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়ামটাকে কী দিতে পারছি সেটা ভাবাও দরকার। যেখানে চোখ আর কানের বাইরে কোনোকিছুতে ইনভলভমেন্ট নেই। গল্পটা লেখার সময় মনে হয়েছিল এমন কোন বিষয় আনতে পারি যেটা এই মিডিয়ামের বাইরে। তখনই স্বাদ এসে পড়ে। অর্থাৎ জিভেরও একটা ভূমিকা যুক্ত হয়ে যায়।

• বাংলা সিনেমার দর্শক এবং সিনেমার ম্যাচিওরিটি নিয়ে আপনি কী ভাবছেন?

এইবারে দ্যাখো ‘দৃষ্টিকোণ’ থেকে একদম ‘রেনবো জেলি’ বা ‘আহারে মন’, ইনভলভমেন্ট অফ অডিয়েন্স ইন থিয়েটারস ইজ ম্যাজিক্যাল। আর বাংলা ছবি বাংলা ছবি করে লাভ নেই, এটা গোটা পৃথিবী জুড়েই হচ্ছে। ভালো বোঝা যায় আমাদের দেশে। আমি তোমাকে একটা সহজ উদাহরণ দিচ্ছি। ‘বাহুবলী’ ২২০০ কোটি টাকার ব্যবসা করেছিল। আরেকদিকে ‘দঙ্গল’, যেটা পুরোপুরি রিয়ালিস্টিক ছবি, এটাও কিন্তু বিশ্বজুড়ে ব্যবসা করেছে। তার মানে একই সংখ্যক দর্শক দেখছে! যে লোকগুলো বাহুবলী দেখছে সেই লোকগুলোই তার মানে দঙ্গল দেখছে। কিন্তু দুটো ছবি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। তার মানে দর্শকের দেখার মধ্যে খোলা হাওয়া লেগেছে। আমরা ম্যাচিওরিটি বললেই এক ধরনের ছবিকে দেগে দিই। কিন্তু তা তো নয়। ম্যাচিওরিটি মানে নিউট্রালিটি। দর্শকের সেন্স অফ নিউট্রালিটিটা খুব স্ট্রং হয়েছে। সেইজন্য দর্শক যতটা মন দিয়ে ‘উমা’ বা ‘হামি’ দেখছে ততটা মন দিয়েই ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ বা ‘রেনবো জেলি’ দেখছে। এটা ওভারঅল ভারতবর্ষেই খুব বেড়ে গেছে। টিকিট কাটলেই ছবি হাউজফুল হবে। কিন্তু হাউজফুলের সার্থকতা তখন, যখন দেখতে পাব হল থেকে বেরিয়ে সিংহভাগ লোক কী বলছে।

Developed by DXDasia