ঢাকার নবাবদের প্রাসাদ আহসান মঞ্জিল

বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয় এই বাড়ি

ঢাকা শহরের যে বাড়িতে প্রথম বৈদ্যুতিক আলো জ্বলেছিল তার নাম আহসান মঞ্জিল। এই বাড়িতেই ১৯০৬ সালে একটি বৈঠকে সর্বভারতীয় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ঢাকার নবাবদের প্রাসাদ ছিল এটি। আজকে সেই নবাবরা আর নেই, হারিয়ে গেছে সেই নবাবি প্রথাও। কিন্তু রয়ে গেছে নবাবি ইতিহাসের কিছু স্মৃতি। আহসান মঞ্জিল এখন জাদুঘর হয়ে সেই স্মৃতিকে রক্ষা করে চলেছে। 

মুঘল আমলে ফরিদপুর-বরিশাল অঞ্চলের নাম ছিল জালালপুর পরগনা। আঠেরো শতকের শুরুতে এখানকার জমিদার ছিলেন শেখ এনায়েতউল্লাহ। তিনি পুরোনো ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বানিয়েছিলেন রংমহল নামের একটি চমৎকার প্রমোদভবন। জায়গাটা এখন ইসলামপুর নামে পরিচিত। তাঁর ছেলে শেখ মতিউল্লাহ এই প্রাসাদটা ১৭৪০ সাল নাগাদ ফরাসি বণিকদের বিক্রি করে দেন। ফরাসিরা সেখান বানিয়েছিলেন তাঁদের বাণিজ্যকুঠি। সেই রংমহলের উত্তর-পশ্চিম কোণায় ল্যুসজাল্লা নামের একটা চৌবাচ্চা তৈরি করেন ফরাসিরা। এদিকে তখন ব্রিটিশদের দৌরাত্ম্যে বাংলা থেকে ক্রমশ পাততাড়ি গোটাচ্ছে ফরাসিরা। ১৮৩০ সালে ফরাসিরা এই বাড়িটা বিক্রি করে দেন বেগমবাজারের বাসিন্দা জমিদার খাজা আলিমুল্লাহকে। জমিদার এখানে নিজের মতো একটা বাড়ি তৈরি করেন। তাঁর ছেলে আবদুল গনিকে নবাব উপাধি দিয়েছিলেন ইংরেজ শাসকরা। সেই নবাব আবদুল গনি ১৮৬৯ সালে ফরাসি কুঠির পুব দিকে তৈরি করা শুরু করেন একটি নতুন প্রাসাদ। সেই প্রাসাদ সম্পূর্ণ হয় ১৮৭২-এ। নিজের ছেলে খাজা আহসানউল্লাহ-র নামে বাড়িটার নামকরন করেন ‘আহসান মঞ্জিল’। 

ঢাকা শহরে নবাব আবদুল গনির প্রতিপত্তির প্রতীক ছিল এই আহসান মঞ্জিল। অনেকে তখন এই প্রাসাদটিকে ‘নবাব বাড়ি’ বলেও ডাকতেন। ১৮৮৮ সালের ৭ এপ্রিল ভয়ংকর টর্পেডোর আঘাতে আহসান মঞ্জিল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ভেঙে পড়েছিল প্রাসাদটির অন্দরমহল। তখনকার নবাব আহসানউল্লাহ বাড়িটির মেরামতি করার সময় রংমহলের ওপর যোগ করে দেন একটি সুন্দর গম্বুজ। ওই সময়ে গম্বুজটি ছিল ঢাকা শহরের সবথেকে উঁচু স্থাপত্য। এই প্রাসাদের ওপর আবার বড়োসড়ো আঘাত আসে ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ভূমিকম্পে। নবাব আহসানউল্লাহ আবার প্রাসাদটিকে মেরামতের ব্যবস্থা করেন।   

দেশভাগের পর ১৯৫২ সালে ঢাকার নবাব এস্টেট অধিগ্রহণ করে সরকার। তবে আহসান মঞ্জিল এবং তার আঙিনা তখন অধিগ্রহণ করা হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নবাব পরিবারের অনেকেই চলে যান অন্য দেশে। যারা বাংলাদেশে রয়ে গেলেন তাদের সাধ্য ছিল না এই বিরাট অট্টালিকা রক্ষণাবেক্ষণ করার। ১৯৭৪ সালে নবাব পরিবারের বংশধরেরা পরিকল্পনা করেছিলেন যে আহসান মঞ্জিল নিলামে বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার আহসান মঞ্জিলের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে ১৯৭৪ সালের ২ নভেম্বর সেই প্রাসাদ ভবন নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত বাতিল করে। তারপর এখানে তৈরি হয় জাদুঘর এবং পর্যটনকেন্দ্র।  

তথ্যসূত্র – ভ্রমণ গাইড, এনটিভি বাংলাদেশ 

Developed by DXDasia