আ হোলি কন্সপিরেসি : প্রথম ও শেষবারের মতো সিনেপর্দায় সৌমিত্র-নাসিরুদ্দিন ম্যাজিক

ছবিটি দেখানো হল ২৭তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee) এবং নাসিরুদ্দিন শাহ (Nasiruddin Shah) — ভারতবর্ষের দুই তাবড় অভিনেতা একসঙ্গে। এই প্রথম, এই শেষ। শৈবাল মিত্র (Saibal Mitra) পরিচালিত ‘আ হোলি কন্সপিরেসি’ (A Holy Conspiracy) ছবির সাক্ষী থাকল কলকাতা। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (KIFF 2022) দ্বিতীয় দিনে দেখানো হল দুই দাপুটে অভিনেতার এই ছবি। বিখ্যাত আমেরিকান নাটক ‘ইনহেরিট দ্য উইন্ড’ অবলম্বনে ছবির গল্প বুনেছেন পরিচালক। এই নাটক নিয়ে এর আগে চন্দন সেনের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়েছে ‘অপবিত্র’।

দেশের পরিস্থিতি, টানাপড়েন, সামাজিক অবস্থার সংকট ইত্যাদি নিয়ে পরিচালক শৈবাল মিত্র অনেকদিন ধরেই চিন্তা-ভাবনা করছিলেন বলে জানান। সেখান থেকেই জেরোম লরেন্স এবং রবার্ট ইলির লেখা এই নাটকটি সিনেপর্দায় নির্মাণ করবেন বলে পরিকল্পনা করেন। গতবছর দেশের ধর্ম-সংকট নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ স্বয়ং। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেও আজীবন সর্বধর্ম-সমন্বয়ে বিশ্বাস করে এসেছেন। ‘আ হোলি কন্সপিরেসি’-ও তেমনই এক গল্পের প্রেক্ষাপটে সাজানো।

ছবিতে রয়েছে চারটি ভাষার ব্যবহার- বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও সাঁওতালি। ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং নাসিরুদ্দিন শাহ দুজনেই উকিলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। একজন লড়েছেন ধর্মের পক্ষে আরেকজন ধর্মের বিরুদ্ধে। ছোট্ট একটি শহরতলিকে ঘিরে গল্পের প্লট বোনা হয়েছে। যেখানে মূলত আদিবাসীরাই বাস করেন এবং ঘটনাচক্রে প্রত্যেকেই ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। এখানকারই এক স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক কুণাল জোসেফ বাস্কে। যিনি নিজেও ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। ক্লাসে ডারউইনের বিবর্তনবাদ পড়ানোর জন্য তাঁর উপর হেনস্থা করা হয়। বলা হয় তিনি বাইবেল বিরোধী কাজ করেছেন। এই নিয়েই শুরু হয় ধর্ম-রাজনীতির টানাপোড়েন। এই শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করছেন শ্রমণ চট্টোপাধ্যায়।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর পরিচালক শৈবাল মিত্র স্মৃতিচারণা করেছিলেন বঙ্গদর্শনে। লিখেছিলেন, “একটা সময় এল যখন সৌমিত্রদাও বুঝতে শুরু করেছেন এত বড়ো একটা চরিত্রে অভিনয় করার ধকল হয়তো তাঁর শরীর নিতে পারবে না। এমন অবস্থায় আমার পক্ষে তাঁকে জোর করাও খুব মুশকিল হয়ে পড়ল। সৌমিত্রদা বিভিন্ন অজুহাতে শুটিং পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করতে লাগলেন। কিন্তু দেখা গেল সেটা করতে গেলে নাসির সাহেবের পরবর্তী ডেট পেতে আরও একটা বছর অপেক্ষা করতে হবে। প্রযোজকরা তাতে চিন্তায় পড়লেন। শুটিং ফ্লোর বুকিং হয়ে গেছে। সেট তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এমন অবস্থায় শুটিং থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। আমি অনেক সঙ্কোচ নিয়ে সৌমিত্রদাকে সব জানালাম। সব শুনে সৌমিত্রদা রাজি হলেন শুটিং করতে।” (মূল লেখাঃ “সৌমিত্রদাকে আমরা দেখলাম, শরীরের যাবতীয় অসুস্থতাকে ভুলে গিয়ে অভিনয় করে চলেছেন”)

তারপর শুটিং শুরু হয়। নাসির সাহেব আসেন কলকাতায়। শুটিং ফ্লোরে যেদিন সৌমিত্র-নাসিরুদ্দিনের প্রথম দেখা হল, দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে সেকি আনন্দ! পরিচালক লিখেছেন, “সেদিন জানতে পেরেছিলাম দুজনেরই বহুদিনের একটা আশা সত্যি হয়েছিল। তা হল, কোনো একটা ছবিতে দুজনের এক সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে। এই ইচ্ছে সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। যাই হোক, এর ফলে অসুস্থ সৌমিত্রদাকে আমরা দেখলাম শরীরের যাবতীয় অসুস্থতাকে ভুলে গিয়ে অভিনয় করে চলেছেন। দেখে বোঝার উপায় রইল না যে মানুষটা কতখানি অসুস্থ ভেতরে ভেতরে।” (মূল লেখাঃ “সৌমিত্রদাকে আমরা দেখলাম, শরীরের যাবতীয় অসুস্থতাকে ভুলে গিয়ে অভিনয় করে চলেছেন”)

বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এ এক প্রাপ্তি। এই বাংলারই কোনো এক গ্রাম হিল্লোলগঞ্জ। সেখানকার এক প্রগতিশীল শিক্ষকের সঙ্গে ধর্ম ও রাজনীতির টানাপড়েন, স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে মৌলবাদী চিন্তার দ্বন্দ্ব, মানুষের জনক ঈশ্বর না বিবর্তনবাদ… এমন নানাবিধ প্রশ্ন ও পাল্টা প্রশ্ন ঘিরে এগিয়েছে ছবির গল্প।

এই বাংলারই কোনো এক গ্রাম হিল্লোলগঞ্জ। সেখানকার এক প্রগতিশীল শিক্ষকের সঙ্গে ধর্ম ও রাজনীতির টানাপড়েন, স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে মৌলবাদী চিন্তার দ্বন্দ্ব, মানুষের জনক ঈশ্বর না বিবর্তনবাদ… এমন নানাবিধ প্রশ্ন ও পাল্টা প্রশ্ন ঘিরে এগিয়েছে ছবির গল্প।

ছবিতে অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করছেন বিপ্লব দাশগুপ্ত, কৌশিক সেন, অনসূয়া মজুমদার, পার্থপ্রতিম মজুমদার, শুভ্রজিৎ দত্ত, অমৃতা চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। সংগীত পরিচালনা করেছেন পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার।

এদিন নন্দন ২-এ ছবিটি দেখার জন্য মানুষের ভিড় ছিল দেখার মতো।

Developed by DXDasia