এমনকি কেউ অসুস্থ হলে তাঁদের তৎক্ষণাৎ ভর্তি করেছেন উত্তরবঙ্গ মেডিক্যালে
চারদিকে সবুজে ঘেরা চা বাগান, তার আশেপাশে ঘন জঙ্গল। হামেশাই সেখান থেকে বের হত বুনো হাতি। পা বা শুঁড়ে পিষে শুধু মানুষই মারত না, ঘরবাড়িও ভেঙে ফেলত। কাছেপিঠে যে দু-চার ঘর মানুষের বসবাস ছিল, তাদের ছেলেমেয়েদের কাছে শিক্ষা ছিল দূর অস্ত। শিশুদের বেঁচে থাকার অস্ত্রই ছিল পাশের বালাসন নদীর চরে গিয়ে পাথর ভাঙা। কিংবা জঙ্গলে গিয়ে কাঠ কুড়নো। সে বস্তির একটা নাম ছিল বটে, কিন্তু আজকের মতো উন্নয়নশীল বস্তি তা ছিল না একদমই। বস্তি ঘেঁষে উঠে গিয়েছে সুউচ্চ হিমালয়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে বস্তি থেকে স্পষ্ট দেখা যায়, কার্শিয়াং কিংবা মিরিক শহরের আনাচকানাচ।
তবে নব্বইয়ের দশকে এইরকম এক বস্তিতে গিয়ে শহুরে একজন মহিলার পক্ষে বসবাস শুরু করা কম সাহসের কাজ ছিল না। শিলিগুড়ি চার্চ রোড ছেড়ে জোসিন্টা কমলা কিন্তু সেই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন বেশ কয়েক বছর আগেই। বিবাহ বিচ্ছেদের পর তাঁর শিশু সন্তানদের নিয়ে তরাইয়ের সেই গা ছমছমে বস্তি এমএম তরাইয়ে গিয়ে থাকতে শুরু করেন। কিন্তু এর উদ্দেশ্য কী?
জোসিন্টা কমলা বঙ্গদর্শনকে জানিয়েছেন, “এমএম তরাই তখন ঘন জঙ্গল। একপাশে পাহাড়, আরেক পাশে বেংডুবি এমইএস ছাউনি। কিন্তু সে বস্তির শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত ছিল। তা দেখেই আমি স্থির করি শিশুদের শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসতে এই বস্তিতে পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করব।”
এমন এক অসম্ভব ভাবনা থেকেই তিনি সেখানে বসবাস শুরু করেন। হাতির উৎপাতে ঝুঁকি তো ছিলই। তবুও এলাকার পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি ঝুঁকি নিয়েছিলেন।
১৯৯১ সালে জোসিন্টা কমলার সেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। শিলিগুড়ি মহকুমার প্রত্যন্ত একটি বস্তি তরাইয়ের এমএম তরাই। শিশু সন্তানদের নিয়ে সে বস্তিতে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘর তৈরি করেন কমলা। রোমহষর্ক ঘটনা প্রত্যক্ষও করেছেন কয়েকবার। বস্তিতে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। রাতে ঘরে ঘরে জ্বলতো কুপি বা লন্ঠন। এমন রাতও গিয়েছে, কখনও হাতি এসে বেড়ার ফাঁক দিয়ে শুঁড় মেলে ধরেছে। কী আর করার থাকে তখন! কোলের শিশুকে নিয়ে দৌড়ে চিৎকার করে পালিয়ে বেঁচেছেন। না, বস্তি ছাড়েননি।
রাত্রে গ্রামে কোনও শিশু বা মহিলা অসুস্থ হলে বা সন্তানসম্ভবা মায়ের প্রসব যন্ত্রণা হলে, তাঁদের পাশে গিয়েও দাঁড়িয়েছেন কমলা। রাতেই তাঁদের পৌঁছে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। সেইসব পুরনো দিনের কথা উঠলে আজও শিহরণ জাগে তাঁর মনে।
সময় বদলেছে। আজ সেই এমএম তরাই আর নেই। অনেক বাড়িঘর হয়েছে। বস্তিতে বিদ্যুৎ এসেছে। যদিও এখনও শিলিগুড়ি মহকুমার প্রত্যন্ত এলাকা হিসাবেই সেই স্থানটি চিহ্নিত। কমলার হাতে তৈরি ছেলেমেয়েরা আজ বহু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ শেষ করে অনেকেই আজ ভারতীয় সেনাবাহিনী বা অন্য কোনও কোম্পানিতে কর্মরত।
সেই গ্রামে আজ মেয়েদের নিয়ে সংস্কৃতির পরিবেশ তৈরি করেছেন কমলা। সেইসঙ্গে শিক্ষা বিস্তারের কাজ তো চলছেই। পাশাপাশি লকডাউনের সময় বহু দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্য বা ত্রাণ বিলি করেছেন। গ্রামের মধ্যে শরীরচর্চাও শুরু হয়েছে। অসহায় অভুক্ত শিশুদের নিজের বাড়িতে এনে আশ্রয় দিচ্ছেন তিনি। কমলা এ প্রসঙ্গে জানান, “জীবনের আর কী আছে! যতক্ষণ জীবন আছে, ততক্ষণ নিজের সংসার সামলে অসহায় গরিব মানুষের জন্য সময় দিলে কোনও ক্ষতি তো নেই।”
বড়োদিন হোক বা নতুন বছর! অসহায় মানুষের সেবা কর্মসূচি চলতেই থাকে। এই সামাজিক ও মানবিক কর্মসূচিকে অন্যরাও ব্যতিক্রমী হিসেবে উল্লেখ করছেন। শিলিগুড়ি রাজবংশী রিপ মিনিস্ট্রির সমাজসেবী কৌস্তুভ দত্ত বা সমাজসেবী প্রিসকিল্লা ইলোরা লাকড়া সকলেই এক বাক্যে বলেন, “কমলাদিদির কাজ সত্যি স্যালুট জানানোর মতো। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় থেকে ওই কাজকে তারিফ করতেই হয়।”
জোসিন্টা কমলাকে স্যালুট জানাচ্ছে বঙ্গদর্শন।