অগ্নিশুদ্ধি- কলকাতার পুজো-শিল্প ৩

কলকাতার পুজোর ইতিহাসে এই প্রথম আর্ট কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা একত্রিত হয়ে কাজ করছে

এবারে এস বি পার্কের পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম বছরের একদম শুরুতে। যেহেতু সেরামিক্স বা পোড়ামাটি নিয়ে কাজ করব ভেবেছিলাম, তাই resource খোঁজা শুরু করেছিলাম সেইমতো। ঘটনাচক্রে জুটে গেল আটজন। আমার দুই ছাত্র দেবজিৎ চক্রবর্তী, অসীম পাল এবং এই বছরে স্নাতকোত্তর পাশ দেওয়া তিনজন নীপা মজুমদার, সৌভিক দাস আর ওয়াঙ্কা ভট্টাচার্য। এছাড়াও আমার আরও দুই ছাত্র সঞ্জয় সামন্ত এবং ধ্রুব ঘোষ-ও সহযোগিতা করে যাচ্ছে নানাভাবে।

ঘটনাচক্রে আমরা সবাই গভঃ আর্ট কলেজের সেরামিক্স বিভাগের ছাত্র/ছাত্রী। এবারের কাজটা যেহেতু মাটি পুড়িয়ে অন সাইট করা হচ্ছে, তাই সবাইকেই এর প্রকরণ পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। মনে হয় কলকাতার পুজোর ইতিহাসে এই প্রথম আর্ট কলেজের একটা নির্দিষ্ট ডিপার্টমেন্টের ছাত্র/ছাত্রী এবং পাসআউট-রা একত্রিত হয়ে কাজ করছে। এটা সম্ভব হয়েছে সেরামিক্স মাধ্যমটির জন্য। যখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এটার এই মাধ্যমে কাজ করব, তখনই এই resource প্যাটার্নটাকে দেখে নিতে হয়েছিল। 

বছরের গোড়ায় আমরা প্রায় তিনমাস কাজ করেছি একটা ইট-ভাটায়। সেখানে একটি নির্দিষ্ট মাপের ইট বানিয়েছি এবং তাতে বর্তমান বছর, স্থান এবং উপলক্ষ্য, এসব উল্লেখ করে নেম প্লেট বানানো হয়েছে। যেমন ইটে লেখা আছে এস বি পার্ক। এর ফলে কোথায় পুজোটা হচ্ছে তা নির্দিষ্ট হয়ে গেল। উপলক্ষ্য যেহেতু দুর্গাপুজো, তাই ‘দুর্গা-মা’-এর উল্লেখ থাকছে আর সময় হিসাবে ১৪২৫ সন লেখা থাকছে। এছাড়াও কিছু জ্যামিতিক নকশা সম্বলিত ইট-ও বানানো হয়েছে। রায়চকের ইট-ভাটার মালিক সত্যবাবু। অতি সজ্জন এবং শিল্পমনস্ক ব্যক্তি। নিজের ব্র্যান্ডের বাইরে অন্য নামে ইট করে দিয়েছেন বিনা বাক্যব্যয়ে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এই ইটগুলো দিয়ে মূল স্থাপত্যের একটা সাপোর্ট সিস্টেম করা হয়েছে। 

এই পুজোর স্থাপত্যটির মজা হল এটা একটা নির্দিষ্ট টেকনিককে সার্ভ করতে করতে তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ আমরা যে চুল্লিগুলো নির্মাণ করেছি সেগুলোকে পোড়ানো হয়েছে। পোড়ানো যাবে, এমনভাবেই তার গড়ন-গঠন সম্পূর্ণ হয়েছে। ফলত পুরো নির্মাণটি একটি নির্দিষ্ট পারপাস-কে সার্ভ করতে করতে তৈরি হয়েছে।

কলকাতার পুজোর দর্শক প্রধানত ঠাকুর দেখতে বেরোয়। এখনও সবার মুখে এ কথাটাই ফেরে। মণ্ডপ দেখতে যাবার উদ্দেশ্যে কেউ ঘর ছেড়ে বেরোয় না। মণ্ডপ দেখাটা সেকেন্ডারি। আমাদের কাজটা এই জায়গা থেকেই শুরু করা। স্থাপত্য বা মণ্ডপটিকে এমনভাবে রচনা করা, যাতে মানুষ দেখতে দেখতে ক্রমশ কৌতূহলি হয়ে ওঠে এর নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রতি। তাই সেই নির্মাণ সৌকর্যকেই রেখে দিয়েছি প্রাঙ্গন জুড়ে, যেখানে সমগ্র স্থাপত্যটির জন্মবৃত্তান্ত রক্ষিত রইল। 

সন্দেহ নেই কাজটা অত্যন্ত কঠিন ছিল শুরুতে। কিন্তু ক্রমাগত এর সঙ্গে থাকতে থাকতে সহজ হয়ে পড়ছে ব্যাপারটা। এমনকি সংগঠনের সবাই এই নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেছেন নিজেদের। এখানেই তো একটা উৎসবের সাফল্য। এভাবেই তো জনসাধারণ শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

কৌশিক সেনগুপ্ত আমাদের সঙ্গে যুক্ত আছে একেবারে শুরু থেকে। ওর কাজ নিয়মিত ছবি তুলে যাওয়া। কালক্রমে যা ডিজিটাল আর্কাইভ হিসাবে সংরক্ষিত হবে। আত্মবিস্মৃত জাতি আমরা। এতে করে নিজেদের বদনাম যাতে ঘোচানো যায়। কলকাতার রাস্তার ধারে এমন একটি কাজ হয়েছিল যা এদেশের কালচারাল পোর্টফোলিও হতে পারে, এটা অন্তত জানুক সবাই। আর পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও এক উৎসবের বার্তা যাক।

Developed by DXDasia