বর্ণবিদ্বেষ, পিছিয়ে পড়া মানসিকতা শ্রীলা’র বুকে বিষম পাথর হয়ে বসেছিল

উপেক্ষিত, অভিমানী এক অভিনেতার প্রয়াণে

একদিন প্রতিদিন-এর মিনু

৯৭৯ সাল। শ্রীলা তখন ১৬ বছরের কিশোরী। মৃণাল সেন তাঁকে আবিষ্কার করলেন ঠিক এই সময়েই, নাটকের মহড়া থেকে। ‘পরশুরাম’-এ আহ্লাদীর পার্ট দিলেন। সে ছবি মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুপো পেয়েছিলো। পেয়েছিল একাধিক জাতীয় পুরস্কার। এভাবেই অভিনয় জগতে হাতেখড়ি। মৃণালের মোট ছ’টা ছবিতে শ্রীলা কাজ করেছিলেন। ১৯৮০-তে ‘একদিন প্রতিদিন’ যখন বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে ঘুরছে, ছবিটা দেখেন শ্যাম ব্যানেগাল। অবাক হন ‘মিনু’-কে দেখে। যেন বহুদিনের কাঙ্খিত কোনও রত্ন। মৃণালের কাছে খোঁজখবর নিয়ে শ্যাম বলেন ‘একেই তো খুঁজছিলাম’। তারপরই ‘আরোহন’। ওম পুরী, ভিক্টর ব্যানার্জি, ননী গাঙ্গুলিদের সঙ্গে নজর কাড়লেন ‘পাঁচি’র চরিত্রে শ্রীলা। আবার শ্যামের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ এলো। শ্রীলা হিন্দি বলতে পারতেন না। তাই ‘মান্ডি’-তে ফুলমণির চরিত্রটা বোবা করে দিয়েছিলেন শ্যাম। এই হচ্ছেন শ্রীলা মজুমদার।

মান্ডি-র ফুলমণি

বিগত তিন বছর ৩ মাস ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন। গত ২৭ জানুয়ারি চলে গেলেন। অপর্ণা সেন, শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ, স্মিতা পাতিল – কাজ করেছেন বাংলা থেকে শুরু করে হিন্দি বিনোদুনিয়ার বিভিন্ন প্রখ্যাত অভিনেতাদের সঙ্গে। তিনি যে ব্যতিক্রমী অভিনেত্রী, তা বোধহয় আর আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না।

অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারিফযোগ্য ছিল ছিল ওঁর স্বর। ওর বাকভঙ্গিমা। মনে হয় শব্দ বাক্য বোধের একেবারে ভেতর অবধি স্পর্শ করে ফেলত ওঁর কথা বলা।

শ্রীলা ছিলেন আদ্যোপান্ত আবেগপ্রবণ মানুষ। একবার এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর 'চোখ'-এ অভিনয় করছেন যখন, সদ্য স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছেন। একদিন কলেজ যাবেন বলে মিনিবাসে উঠেছেন। শ্রীলা-কে অবাক করে বাসের কন্ডাক্টর বলেছিলেন, “আপনার 'চোখ' সিনেমাটা কাল দেখলাম”। শ্রীলা অবাক হয়েছিলেন ভেবে যে এই ধরনের পেশাজীবী একজনের কাছে ছবিটা পৌঁছেছে। ছবিতে তিনি এবং ওম পুরি এক বিহারি দম্পতির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

শ্রীলার শেষ সিনেমা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পালান’। এ যেন একেবারে বৃত্তপূরণ। ২০০৩ সালে ‘চোখের বালি’ সিনেমায় ঐশ্বর্য রাই বচ্চনের জন্য বাংলায় ডাবিংও করেছিলেন তিনি। টলিপাড়ার অনেকেরই আক্ষেপ, এত দক্ষ অভিনেত্রী হওয়া সত্ত্বেও যোগ্য জায়গা পাননি। 

সিনেমায় শ্রীলার অভিব্যক্তি ছিল দেখার মতো। অভিব্যক্তির অমন প্রকাশ ভারতীয় চলচ্চিত্রের সম্পদ। ‘দামুল’ ছবিতে প্রকাশ ঝা শ্রীলাকে যেভাবে মুখ্য চরিত্র হিসেবে কাজে লাগালেন এ বঙ্গের কেউ তেমন লাগালেন না! নবেন্দু চট্টোপাধ্যায় ‘চপার’ ছবিতে বড়ো ভূমিকায় কাজে লাগালেও তেমন অভিনয় দক্ষতা দেখানোর কোনো সুযোগই ছিল না শ্রীলার। শ্রীলাদের মতো দক্ষ অভিনেত্রীদের দরজা অবশ্য একদিনে বন্ধ হয়নি। ধীরে ধীরে হয়েছে, যেদিন প্রান্তিক মানুষদের কথা বলা বাংলা চলচ্চিত্র থেকে উঠে গিয়েছে। 

অসম্ভব বর্ণবাদী বাঙালি সমাজে শ্রীলা তাঁর সংলাপ-বাচন-অভিনয় প্রতিভা সত্ত্বেও প্রথাগত বিবেচনায় ‘তত রূপসী’ নন বলে মিডিয়ার ফ্ল্যাশ লাইটে সবসময় থাকতে পারেননি। আকালের সন্ধানে ফিল্মে গীতা সেনের স্বামী বিয়োগে সান্ত্বনা দেওয়া শ্রীলার, একবারের জন্যেও মনে হয়নি, তিনি অভিনয় করছেন। খুব ছোটোবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছিলেন। মায়ের ছত্রছায়াতেই বড়ো হওয়া। ছোটো বেলাতেই আকাশবাণীর দৌলতে বেতার জগতের সঙ্গে জুড়ে গেছিলেন। সিনেমার জগতে প্রবেশের আগে বেতার জগতে কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই তাঁর পরিচিতি ছিল। অভাবের জন্য ছোটোবেলাতেই সার্কাস সহ অন্যান্য বিজ্ঞাপনে বাচিক শিল্পীর কাজ করতেন। সেসব ছোটো ছোটো কাজ করেই আনন্দ পেতেন, পরে বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন।  মঞ্চ, ছোটো পর্দা, বড়ো পর্দা সব ক্ষেত্রেই সাবলীল ছিলেন। ২০০৩ সাল নাগাদ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে “আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দাও” যাত্রায় তাঁর মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন।

স্মরণীয় হয়ে থাকবে শ্রীলার গাঢ় নিবিড় করে কথা বলা। শব্দের আশ্চর্য উচ্চারণের কথা। অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারিফযোগ্য ছিল ওঁর স্বর। ওর বাকভঙ্গিমা। মনে হয় শব্দ বাক্য বোধের একেবারে ভেতর অবধি স্পর্শ করে ফেলত ওঁর কথা বলা। ফেলে আসা এক দীর্ঘ সময়, সমাজ, ও ব্যথিত ইতিহাসের কম্পন ও সার্বিক অভিব্যক্তি কণ্ঠে ধরে ফেলেছিলেন শ্রীলা। 

ছবি: সন্দীপ কুমার

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের বর্ণবিদ্বেষ, পিছিয়ে পড়া মানসিকতা একজন অভিনেতার বুকে বিষম পাথর হয়ে বসেছিল। “কেন আমাকে শুধু ‘কালো’ মেয়ের চরিত্রেই ভাবা হয়” –  বড়ো লজ্জার কথা, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁকে এই অভিমান কুরেকুরে খেয়েছিল, যতটা না মারণরোগ।

তথ্যঋণ:

অঞ্জন দত্ত'র নেওয়া সাক্ষাৎকার
শ্রীলার প্রয়াণের পর কলকাতা টিভি-তে শ্যাম বেনেগালের মন্তব্য। 

Developed by DXDasia