উদ্যোগে অভেদ ফাউন্ডেশন
“ও স্যার, AI এলে কি চাকরি থাকবে?”
“লাইফ সায়েন্স পড়লে কি শুধু ডাক্তারই হওয়া যায়?”
“আমি গুছিয়ে কথা বলতে পারি না।”
“মনখারাপ হলে কী করব?”
না না, এ কোনো পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নয়। এসব সহজ অথচ গভীর প্রশ্নের জন্ম ছেলেমেয়েদের মনে। যে মন ভবিষ্যৎ নিয়ে কৌতূহলী, একটু ভীত অথচ জানতে আগ্রহী। দীর্ঘদিন ধরেই এমন প্রশ্ন বারবার শুনে আসছিলেন অভেদ ফাউন্ডেশন-এর কর্ণধার বিশ্বজিৎ মিত্র। সেখান থেকেই ভাবনার জন্ম। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু উত্তর দিলেই হবে না। এমন এক পরিসর দরকার, যেখানে প্রশ্ন করাটাই হবে শেখার শুরু। সেই ভাবনাই রূপ নেয় চারদিনের শীতকালীন ক্যাম্পে। নাম: উন্মেষ।
অভেদ ফাউন্ডেশন একটি অলাভজনক ও অ-রাজনৈতিক সংস্থা। যাঁদের আদর্শের মূলে রয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ। গ্রামের দরিদ্র, মেধাবী ছেলেমেয়েদের স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপ দেওয়ার পাশাপাশি তারা বিশ্বাস করে, সহায়তা মানে শুধু আর্থিক সাহায্য নয়, পাশে থাকাও। ছেলেমেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, দিশা দেখানো এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো পর্যন্ত হাত ধরে থাকা। এই ভাবনাতেই গাঁথা তাদের কাজের মূল সুর।

পড়াশোনার চাপে যখন অনেক কিছুই শুধু নম্বরের হিসেবে আটকে যায়, ঠিক তখনই এমন উদ্যোগ তাদের ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, আর শেখার আনন্দকে চিনতে শেখায়, নতুন করে…
উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই ক্যাম্পে অংশ নেওয়া ছেলেমেয়েরা সবাই সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রী। ঠিক এই বয়সেই কিন্তু সবার মনে প্রথমবার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন জাগে, তাই না! নিজের ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ আসে, আবার ভয় আর কৌতূহল একসঙ্গে কাজ করে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে এমন পরিসর তৈরি হওয়া কতটা দরকার, তা ওদের প্রশ্ন, আগ্রহ আর চোখের ভাষাই এই দু-চারদিনের উছ্বাসে বুঝিয়ে দিয়েছে। পড়াশোনার চাপে যখন অনেক কিছুই শুধু নম্বরের হিসেবে আটকে যায়, ঠিক তখনই এমন উদ্যোগ তাদের ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, আর শেখার আনন্দকে চিনতে শেখায়, নতুন করে…
এবারের ক্যাম্পে নতুন করে স্কলারশিপ পাওয়া ৩২ জন ছেলেমেয়ে যোগ দিয়েছিল। চারদিন ধরে তারা শিখেছে অনেক কিছু। জেনেছে, শেখা মানে কেবল মুখস্থ বিদ্যা নয়। শেখা মানে ভাবা। শেখা মানে অনুভব করা। এবং অবশ্যই প্রশ্ন করা। তাদের দিন শুরু হত যোগচর্চা দিয়ে। শরীরের সঙ্গে মনের যে যোগ, সে সুতো ধরেই চলত অনুশীলন…
অধ্যাপিকা ও মনোবিদ ড. শ্রীময়ী তরফদার creative art therapy-র মাধ্যমে দেখিয়েছেন, রং, রেখা আর কাগজও হতে পারে মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম। সহজ শিল্পচর্চার মাধ্যমে কীভাবে মন ভালো রাখা যায় এবং চাপ সামলানো যায়, সেই অভিজ্ঞতা রং-তুলিতে পেয়েছে শিশুরা।
বিশ্বজিৎ মিত্র কেরিয়ার কাউন্সেলিংয়ে বোঝান, এই সময়ে দাঁড়িয়ে সঠিক পথে এগোনো মানে আগে নিজেকে সঠিকভাবে চেনা। অধ্যাপক পার্থ ঘোষ মহাকাশ ও বিজ্ঞানের কথা বলে শিশুদের কৌতূহল বাড়িয়েছেন। সুজিত গুহ সহজ ভাষায় AI ভবিষ্যতে কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে তা ব্যাখ্যা করেছেন। চিন্ময় ঘোষ hands on robotics ও machine learning-এর মাধ্যমে প্রযুক্তিকে বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছেন।
এছাড়াও জেনেটিক্স নিয়ে কথা বলেন গৌতম বসু, বিজ্ঞান বিষয়ে আলোচনা করেন সূর্যাশিস গুপ্ত। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক সুমিত মন্ডল marine biology-র উদাহরণ দিয়ে দেখান, life science-এর জগত বৈচিত্র্যময় ও তার পরিধি কতখানি। এছাড়াও এই বিষয়টি পড়ে কত ধরনের কাজ করা সম্ভব, সে বিষয়ে এ আলোচনা অনেকটা স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে ছেলেমেয়েদের।
আমি, একটি সেশনে general communication techniques, উচ্চারণের শুদ্ধতা নিয়ে কথা বলেছি। কীভাবে পরিষ্কার ও গুছিয়ে কথা বলা যায়, কোন কোন বিষয়ে নিয়মিত অনুশীলন এ বিষয়ে সাহায্য করে, তা সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। Communication-এর বিভিন্ন ধরন, আবেগ বোঝার ক্ষেত্রে নবরসের প্রসঙ্গ এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এর সঙ্গে ছিল ওদের শ্রুতিনাটকের রিহার্সাল, যেখানে তারা শেখা বিষয়গুলো কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছে।
১৭ থেকে ২০ ডিসেম্বর, ক্যানিং-এর বন্ধুমহল ক্লাব যেন পরিণত হয়েছিল এক আনন্দমেলায়। এই ক্যাম্পের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি হয়তো এই আনন্দ। নির্ভেজাল আনন্দ এবং অবশ্যই শিশুদের চোখে জেগে ওঠা নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করার সাহস।

এর বাইরেও ছিল গান, খেলাধুলা, বিতর্ক, শ্রুতিনাটক প্রতিযোগিতা এবং অবশ্যই হাসি-আড্ডা। শ্রুতিনাটক প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন পার্থ বসু ও রাতুলা বসু। প্রথম দিনই শিশুরা ইচ্ছে গাছের পাতায় লিখে দিয়েছিল নিজেদের স্বপ্ন।
১৭ থেকে ২০ ডিসেম্বর, ক্যানিং-এর বন্ধুমহল ক্লাব যেন পরিণত হয়েছিল এক আনন্দমেলায়। এই ক্যাম্পের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি হয়তো এই আনন্দ। নির্ভেজাল আনন্দ এবং অবশ্যই শিশুদের চোখে জেগে ওঠা নির্দ্বিধায় প্রশ্ন করার সাহস। কারণ ভবিষ্যৎ তো গড়ে ওঠে সেখান থেকেই! চারাগাছে জল না দিলে যেমন বৃক্ষ হয় না, তেমনই ঠিক সময়ে এইসব ছেলেমেয়েদের কৌতূহলী মনের যত্ন না নিলে, অনেক সম্ভাবনাও শুকিয়ে যায়…
এই ছোটো ছোটো চারাগাছগুলোর শিকড় যত ছড়াবে, তারা যত ডালপালা মেলে ধরবে, সমাজ তত সুন্দর হবে। সবাই মিলে যদি এমন চারাগাছদের লালন করা যায়, তবে সমাজ সুন্দর হবে। এভাবেই, মানুষ হওয়ার শিক্ষার মধ্যে দিয়ে…