নিম্নমধ্যবিত্তের আড্ডায়-গানে-বিতর্কে রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পেয়েছিলেন সমরেশ মজুমদার

প্রয়াত সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের প্রতি শ্রদ্ধা

মরেশের শৈশব জুড়ে একদিকে চা-বাগানের গন্ধ, উত্তরবঙ্গের আংরাভাসা নদী, অন‍্যদিকে তাঁর বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমারু বিমানের শব্দ, বোমার গন্ধ, গুলির শব্দ আর দেশজোড়া উত্তাল হয়ে ওঠা স্বাধীনতা আন্দোলন। এই শান্তি আর বিদ্রোহের দ্বন্দ্বই তৈরি করেছিলো তাঁর মনন, লেখনী, রাজনৈতিক বোধ আর সমাজচেতনা। 

তাঁর প্রথম উপন‍্যাস সাগরময় ঘোষ সম্পাদিত ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘দৌড়’। রেসের মাঠের মানুষের জীবন নিয়ে শব্দজাল বোনার মাধ‍্যমে তদানীন্তন ভারতের ফোঁপরা সমাজ আর অর্থনীতির দাগ মেখে হেঁটে যায় উপন‍্যাসের ‘বিকাশ’ চরিত্রটি। ‘সাতকাহন’-এর দীপাবলির দু’হাত জুড়ে লেগে থাকে আমাদের সমাজে মেয়েদের আত্মপ্রতিষ্ঠা আর সম্মান পাওয়ার চিরন্তন লড়াইয়ের দাগ। ‘ঠিকানা ভারতবর্ষ’ জুড়ে ছড়িয়ে আছে ভারতের সমাজ, সেই সমাজের বদলে যাওয়ার গল্প আর সাধারণ মেয়েদের চোখে লেগে থাকা দিনবদলের স্বপ্ন। 

শিশু সমরেশ

কলকাতায় এসে স্কটিশ চার্চ কলেজে আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও তারপর কলকাতায় লেখনীজীবন হলেও ভুলতে পারেননি শৈশবের শহর জলপাইগুড়ি আর গয়েরকাটা, আংরাভাসা নদী আর চা-বাগান। তাই তাঁর লেখায় উত্তরবঙ্গ লোকালয় ছাড়িয়ে চরিত্র হয়ে ওঠে। কিশোরদের জন‍্য লেখা ‘অর্জুন’ চরিত্রের সঙ্গে হাত ধরে চলে জলপাইগুড়ি শহর, ‘সাতকাহন’-এর দীপাবলির সঙ্গে বেড়ে ওঠে চা-বাগানের চা-পাতাগুলি। নকশালবাড়ি আন্দোলন, প্রেম, বিশ্বাস, রাষ্ট্রীয় অত‍্যাচার, রাজনীতি, ভালোবাসার অপেক্ষা, অপেক্ষার হতাশা ডুবে যায় ‘কালবেলা’য়, অনিমেষের ‘সেবাদাসী’ হয়ে থাকতে চেয়েছিলো যে মাধবীলতা, সে-ই অপমানে গর্জে ওঠে তারই স্বপ্নের পুরুষ অনিমেষের দেওয়া বিবাহ প্রস্তাবে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তার ওপর হওয়া পুলিশি জুলুমের অপমানে উলঙ্গ হয়ে পড়ে রাষ্ট্রযন্ত্র। এতো অসময় আর অনটনের ভিতরে অনিমেষ-মাধবীলতার স্বপ্ন, হতাশা, বোধ সেঁচে ঘরে আসে অর্ক, গোটা ‘কালপুরুষ’ জুড়ে যার ঊজ্জ্বল বোধ ঘিরে থাকে সুসময়ের স্বপ্ন। অর্ক’র জীবনের আয়না জুড়ে গোটা বাংলার বেকারত্বের আর মূল‍্যবৃদ্ধির ছবি এঁকে দেন সমরেশ, ‘মৌষলকাল’-এ। কিন্তু অসময়ে স্বপ্ন হারাতে চান না লেখক, তাই বস্তিতে বেড়ে ওঠা অর্কের মনের ভিতর জেগে থাকে আপাত শান্তিকল‍্যাণ বাজিয়ে চলা ব‍্যবস্থার ঘুণ-শরীর চিরে প্রকৃত দিনবদলের সংকল্প। অসময়ে যা হাঁপিয়ে ওঠে, কিন্তু মরে না।

শুধু উপন‍্যাসে নয়, গল্প আর প্রবন্ধেও সমরেশ মজুমদার তীক্ষ্ণ ও গভীর। তীব্র শব্দজাল আর বিস্তৃত ঘটনাপ্রবাহে আপাত পুণ‍্যপ্রিয় বাঙালি মধ‍্যবিত্ত ঘরে এসে বসে তিন যৌবনগতা দেহপসারিনী, তাদের জীবনের ভিতর থেকে মধ‍্যবিত্ত ড্রয়িংরুমে ছড়িয়ে পড়ে দুঃখ, প্রেম, বঞ্চনা, লড়াই, স্বপ্নমাখা ‘বড় পাপ হে।’ রবীন্দ্রনাথকে তিনি হয়তো বেশি ভালোভাবে খুঁজে পেয়েছিলেন ওপার বাংলায়। তাই ঢাকা ক্লাবের ওয়েটার ছেলেটি যখন বলে যে তার কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলেন এমন একজন কবি যাঁর লেখা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত সেদেশের কোনও পরস্পর প্রতিস্পর্ধী রাষ্ট্রনেতা বা নেত্রীই বদলে দেওয়ার সাহস করেননি, তখন লেখকের মন তৃপ্ত হয় এইটুকু ভেবে যে রবিঠাকুর মধ‍্যবিত্ত এলিট ক্লাস পেরিয়ে নিচে থাকা মানুষের ঘরকেও ছুঁতে পেরেছেন। তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন আশ্রয়, শান্তি, ধর্ম। তিনি রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পেয়েছেন কলেজের ছেলেমেয়েদের আড্ডায়, তথাকথিত রবীন্দ্রবিরোধী হিসাবে খ‍্যাত আবুদুল্লাহ আবু সাইদের কাছে, বিখ‍্যাত কবি, নাট‍্যকার ও ঔপন‍্যাসিক সৈয়দ সামসুল হকের এই জবানে যে রবির গান তাঁকে ক্লান্তির রাতে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, যা পারে না অন‍্য কোনো ঘুমের ওষুধ, খুঁজে পেয়েছেন ঢাকা ক্লাবের ওয়েটারের তৃপ্তিতে। এইখানেই সমরেশের ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’  অনায়াসে সবার হয়ে যান।

আবার লেখকের যুক্তিবাদী মনন আবেগ সরিয়ে রেখে শেষবয়সের হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লিখতে দ্বিধা করে না- “এখন ওঁর উচিত গান না গেয়ে সুর দিয়ে যাওয়া।”

সমরেশ মজুমদার নিজের জীবনে পেয়েছেন বহু স্বীকৃতি। বঙ্কিম পুরস্কার (২০০৯), সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪), আনন্দ পুরস্কার (১৯৮২)। কিন্তু পুরস্কারের আতিশয‍্য তাঁকে তাঁর শিকড় ভোলাতে পারেনি। তাঁর কলমের টানে পাঠকের মনে আঁকা হচ্ছে ছোট্ট শহর, চায়ের দোকান, রাস্তার বাঁক, কালভার্ট, রাস্তার পাশ দিয়ে আর কালভার্টের নিচে দিয়ে বয়ে চলা শান্ত নদী, দুরে থাকা চা-বাগান। কালের বেলা ঘনিয়ে আসছে, নদীর পাড়ে একে একে এসে বসছে অনিমেষ, মাধবীলতা, অর্ক, বিকাশ, দীপাবলি, তিন বিগতযৌবনা দেহপসারিনী, অর্জুন, আরও অনেকে। তারা সেখানে একান্তে বসে থাকবে বহুকাল। এ কালের বেলা ফুরোবার নয়। 

Developed by DXDasia