
কবিতা আমাদের কাকে কী দিয়েছে-র থেকেও বড়ো কথা কবিতা আমাদের কতখানি মুক্ত করতে পেরেছে, হয়তো সেটিই বারবার উপজীব্য করেছি। মুক্তির পথে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে পেয়েছি এ বাংলার নির্জন কবিদের। তাঁদের শব্দ ব্রহ্ম। তাঁদের উচ্চারণে আন্দোলিত হয় তরুণ প্রাণ৷ বয়স বাড়ে। অথচ মাথা থেকে কেমন ফিকে হয়ে আসে তাঁদের নাম ধাম পরিচয়। আশির দশকের কবি প্রবীর দাশগুপ্ত তেমনই। বিস্মৃত অথচ আমাদের আত্মজন। তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টিগুলিকে ফিরিয়ে এনেছে ‘বোধশব্দ’-এর প্রকাশক সুস্নাত চৌধুরী।
বোধশব্দ প্রকাশ করেছে আশির দশকের বিস্মৃত কবি প্রবীর দাশগুপ্তের সংকলন। প্রবীর দাশগুপ্তের জন্ম ১৯৬৮ সালের ২ মার্চ। মৃত্যু ১৯৮৯ সালের ২৪ মার্চ, মাত্র একুশ বছর বয়সে। খড়গপুর থেকে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন, তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে। প্রকাশক সুস্নাত চৌধুরী এ প্রসঙ্গে জানাচ্ছেন, “কলকাতায় এসে একদল বন্ধু পান প্রবীর, আর বাংলা কবিতা পায় একজন প্রবীর দাশগুপ্তকে। মৃত্যুর এত বছর পরেও তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন সেই বন্ধুরাই, বাঁচিয়ে রেখেছে বাংলা কবিতা।”

প্রবীর দাশগুপ্তের তরুণ বয়সের ছবি
আজ তিন দশক পর পুনরায় তাঁকে ফিরে দেখছে একবিংশ শতক। গ্রন্থবদ্ধ যাবতীয় রচনা, পাণ্ডুলিপি, ফটোগ্রাফ, চিত্রকর্ম এক জায়গায় করা হয়েছে এই সংকলনে। প্রবীর। একা ও রঙিন। কে বলে তিনি বিস্মৃত? কে বলে হারিয়ে যাওয়া কবিরা উপযাপিত হন না? একালের কবিরা এই সংকলন থেকে খুঁজে নিচ্ছেন ব্যক্তিগত কবিতা-ভাবনা কিংবা কবিতায় বেঁচে থাকার রসদ। প্রবীর দাশগুপ্তের একটিমাত্র কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯০ সালে, তাঁর মৃত্যুর পরের বছর। প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্যের তৎকালীন অধ্যাপক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রবীরের বন্ধুরা। সংকলনটির নাম ছিল ‘প্রবীর দাশগুপ্তের কবিতা’। এরপর কবিকে নিয়ে ২০০৮ সালে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে ‘বোধশব্দ’ পত্রিকা। যদিও সেই কাজ শুরু হয় ২০০৩ সাল থেকে। ২৪ পাতার একটি কাগজ, ফলত ছোটো আকারেই কাজটি হয়। সুস্নাত চৌধুরী কথা প্রসঙ্গে বলেন, “তখন আমরা কয়েকজন চেষ্টা করেছিলাম প্রবীরের বাড়ি যেতে। কিন্তু খড়গপুরের সেই বাড়ির কোনো খোঁজ বা ঠিকানা আমাদের কারোরই জানা ছিল না। কবি জয়দেব বসু আমাকে বলেছিলেন, যদি বড়ো আকারে বই করার পরিকল্পনা থাকে, তাহলে আমরা একসঙ্গে প্রবীরের বাড়ি খুঁজতে যাব। কিন্তু জয়দেবদাও চলে গেলেন। ফলে আমাদের সে বাড়ি খোঁজা আর হল না। এছাড়া প্রবীরের কাছের বন্ধু অভীক মজুমদার এত বছর ধরে যখের ধনের মতো আগলে রেখেছিলেন প্রবীরের কবিতা, চিঠি, চিত্রকর্মগুলি। সেগুলি আমাদের হাতে তুলে দেন। তন্ময় মৃধা, অপূর্ব সাহাও নানাভাবে সাহায্য করেছেন।”
প্রবীর চিরকুটে লিখে রাখেন, “তেমন কবিতা চাই, যার প্রত্যেকটি পংক্তি পাঠকের মনে ঘাড়ে কেশর গজানোর শিহরণ সৃষ্টি করে।”

প্রবীর দাশগুপ্তের চিত্রকর্ম
২০০৩ থেকে আজকের ২০২৩ – কুড়ি বছর ধরে সুস্নাত চৌধুরী প্রবীরকে নিয়ে ভেবেছেন, পড়ে থেকেছেন। এর মধ্যেই অরুণাভ পাত্র অসাধ্যসাধন করে খুঁজে বের করেছেন প্রবীরের খড়গপুরের বাড়ি। তাঁর পরিবারের লোকজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। উদ্ধার করে এনেছেন প্রবীরের ব্যক্তিগত খাতা, ছবি।

প্রবীরের হাতে লেখা কবিতা
আর কী কী আছে বইয়ে? আছে প্রবীরের মা ও ভাই উমা দাশগুপ্ত ও প্রসূন দাশগুপ্তের সাক্ষাৎকার; রয়েছে শঙ্খ ঘোষ, মৃদুল দাশগুপ্ত, জয়দেব বসু, তন্ময় মৃধা, রজত রায়চৌধুরী এবং আরও অনেকের সাক্ষাৎকার; প্রবীর প্রসঙ্গে লিখেছেন অভীক মজুমদার, সুমিতাভ ঘোষাল, অচ্যুত মণ্ডল, শমীন্দ্রনাথ মজুমদার, রাকা দাশগুপ্ত, অর্ক দেব প্রমুখেরা। প্রবীরের কবিতার পাণ্ডুলিপি ছাড়াও আছে গদ্য, চিঠি ও চিত্রকর্ম।
প্রবীরের মা উমা দাশগুপ্তের সাক্ষাৎকার পড়ে জানতে পারি তরুণ স্ফুলিঙ্গের মতো উজ্জ্বল সেই ছেলেটির ব্যক্তিগত যাপনের কথা। রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে যাওয়া। তাঁর আদরের বড়ো ছেলে বাবিকে নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলেছেন। বলেছেন, “ছোটো থেকেই বাড়িতে বসে বসে লিখত। …ঠাকুরের সংস্কৃত মন্ত্র থেকে শুরু করে সবই পড়ত। এসব করার জন্য স্কুলের পরীক্ষায় ফার্স্ট-সেকেন্ড হতে পারত না। কবিতা লেখার জন্য বাড়িতে বকুনিও খেত। ওর বাবা তো খুবই খ্যাচ খ্যাচ করত। আবার ভালোওবাসত খুব।”
ছাত্র প্রবীরকে নিয়ে শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, “প্রবীর আমার বিশেষ স্নেহভাজন ছিল। …যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছিল তুলনামূলক সাহিত্য। তবে বাংলা বিভাগে আমার ঘরেও মাঝে মাঝেই আসত। একদিন প্রবীর তার কবিতা দেখাল। …‘কবিতার মুহূর্ত’ বইয়ের সূচনায় আমি যে তরুণের কথা লিখেছিলাম, সে প্রবীরই।”

প্রবীরের একমাত্র কবিতার সংকলন
“কোথাও যাওয়ার কোনো কথা নেই/ ভ্রমণ কাহিনীগুলো নেশা/ সে-মানুষ চ’লে গেছো ভিন্ন শহরে গ্রামে/ আমি তার ফেরার কাহিনী/ ওগো ওফেলিয়া/ বাতাবির ফল প’ড়ে-থাকা মাঠ, ওগো/ আমাকে নেবে না?”
অলৌকিক এই কবিতার রচয়িতা প্রবীর দাশগুপ্ত। দৃশ্যময়তার ব্রিলিয়ান্স। কবিতার নাম ‘পিন্তানিনা সান্তামারি’। প্রবীরের অল্পবয়সী মৃত্যু আমাদের হতবাক করে, অস্থির করে। আর তত বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে তাঁর কবিতা, তাঁর জীবন। মৃত্যু নয়, জিতিয়ে দিয়েছেন আস্ত জীবনকে। কবিতা সেই জীবনের বন্ধু। যেমন কোনো এক চিরকুটে লিখে রাখেন, “তেমন কবিতা চাই, যার প্রত্যেকটি পংক্তি পাঠকের মনে ঘাড়ে কেশর গজানোর শিহরণ সৃষ্টি করে।”
এই বিশেষ সংকলনটিতে সন্ধান পাওয়া প্রবীরের সমস্ত কবিতাই রাখা হয়েছে। লেখার নিচে রচনা কিংবা প্রকাশ সংক্রান্ত তথ্যাদির উল্লেখ রয়েছে। প্রবীরের হাতে লেখা মূল পাণ্ডুলিপির ছবিও যোগ করা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। এছাড়াও সংকলনে অত্যন্ত যত্নসহ ছাপা হয়েছে প্রবীরের নানান চিত্রকর্ম। প্রকাশক সুস্নাত চৌধুরী জানিয়েছেন, “আমাদের হাতে এসেছে প্রবীরের ব্যবহার করা একটি খাতা এবং একটি ডায়েরি। খাতাটি চওড়ায় মোটামুটি দু-শো পনেরো মিলিমিটার এবং লম্বায় দু-শো আটষট্টি মিলিমিটার। মলাট ছাড়া বাঁধানো প্র্যাক্টিক্যাল খাতা। …ডায়েরিটি থেকে রাখা হয়েছে প্রবীরের নানান স্কেচ। ১৯৮৮ সালের এক দুপুরে বন্ধু অভীক মজুমদারের বাড়ি বসে এই ছবিগুলি তিনি আঁকেন।”

বোধশব্দ বিশেষ সংকলন, প্রচ্ছদ সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
আসল কথা হল, বইমেলায় ’২৩-এর মাঝামাঝি কোনো এক দুপুরে সংকলনটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশ হতেই তরুণদের হাতে হাতে এ বই পৌঁছে যায়। তাঁদের গড় বয়স হয়তো পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ। অর্থাৎ বর্তমান প্রজন্মের কাছে প্রবীর দাশগুপ্তের কবিতা অম্লান হয়ে আছে। আজকের প্রেম মধুর করে রেখেছে মৃত্যু-বছরে লেখা ‘ব্রত’ কবিতায় – “যে-জন্ম আমাদের ঝাঁঝালো কেসুতপাতা মদ/ তার কি অনর্থ হ’তে আছে/ ঘাসের বাহান্নপথে পোকাদের হাঁটাহাঁটি গ্রাম/ কেউটের এলেবেলে বিষ প’ড়ে থাকে/ যে-ছেলেটি শান্ত আর যে-মেয়েটি আছাড়ি-পিছাড়ি/ উহাদের দেখা হোক, শালিখঠাকুর-” — প্রেমের নিঃশব্দের পাশে এ কবিতা যেন গোপন ইস্তেহার।
এ আলোচনায় প্রবীর দাশগুপ্তকে ধরা গেল না। তবে বোধশব্দ প্রকাশনীর আলোচ্য বইটি পড়লে অবশ্যই প্রবীর, তাঁর লেখালেখি-শিল্পভাবনা-সময়কাল নিপুণভাবে ধরা যাবে নিশ্চিত। অতএব পাঠকের চোখ যাক সংকলনটিতে। আমরা প্রবীরকে প্রবীরের মতো করে উদযাপন করি।
_____________________________________
প্রবীর – বিশেষ বোধশব্দ সংকলন – প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০২৩ – মুদ্রিত মূল্য ৭৬০ টাকা
(উদ্ধৃতিতে ব্যবহৃত বানানগুলি অপরিবর্তিত)

