
বাংলা সাহিত্যের অভয়ারণ্যে অমিয়ভূষণ মজুমদার ছিলেন একজন স্বতন্ত্র প্রজাতি। উপনিবেশিত বাংলা কথাসাহিত্যের মতাদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গীর একেবারে বিপরীতে স্থাপন করেছিলেন ভিন্ন এক পরিসর। সাতাশটি উপন্যাস কিংবা একশো পনেরোটি ছোটোগল্পের লেখক অমিয়ভূষণকে যদি চিনে নিতে পারা যায়, তাহলে অনায়াসে বলা যায় এমন জীবন সম্পৃক্ত অথচ নির্মোহ, এমন সরল অথচ দাম্ভিক অক্ষরশিল্পী বাংলা সাহিত্যের উঠোনে খুব কম অবতীর্ণ হয়েছেন। আজকের এই বাজারি সাহিত্যের যুগে, প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদোয়ার নিচে দাঁড়িয়ে মনে হয় অমিয়ভূষণ মজুমদার একটি শব্দও কোনোদিন না লিখলে কার কী ক্ষতি হতো জানি না, তবে বাংলা সাহিত্যজগৎ কোনোদিন টেরও পেত না যে সময়ের অতল গর্ভ থেকে নির্মোহ ভাবে রত্ন চুরি করে নেওয়ার কৌশল।

“রাজনগর” উপন্যাসের জন্য তিনি পেয়েছিলেন বঙ্কিম পুরস্কার। সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হয় এই পুরস্কার কীভাবে তাঁকে আরো লিখতে অনুপ্রেরণা যোগাবে! তিনি অকপট বলেন “পুরস্কার লেখাকে ভালোও করে না মন্দও করে না। লেখাটা হয় নিভৃতে”।
তিনি আজীবন আখ্যানপ্রেমিক ছিলেন। গল্প বলতে পারাটা যে গভীর একটি শিল্প, তা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন৷ তিনি বলতেন, “আমার মনে যে ভিশনটা আছে সেটাই আমার কাছে গল্প।” লেখক অমিয়ভূষণ এই ‘ভিশন’ (vision) শব্দটির ওপর জোর দিয়েছেন বরাবর। আমাদের মনে পড়বে ‘নির্বাস’ উপন্যাসের শুরুতেই তিনি বলছেন-
“গল্পটা না বলে উপায় নেই। কারণ চেতনায় অন্য কারো জীবনের ছায়া যদি মুহূর্তের জন্যও পড়ে তবে সে বাইরের বিষয় থেকে নিষ্কৃতি পাবার একমাত্র উপায়ই হচ্ছে ছায়াটাকে বিশ্লেষণ করে দেখা, তা নিয়ে আলোচনা করা, অন্য কথায় গল্পটাকে বলে ফেলা”।
উপরোক্ত উদ্ধৃতিতে এটা স্পষ্ট যে তিনি গল্প নির্বাচন করছেন কেবল গল্পের খাতিরেই নয়, বরং একটি নতুনতর ‘ছায়াকে বিশ্লেষণ’ করার খাতিরে। আখ্যানের যে প্রেক্ষিত এবং তার সঙ্গে পাঠকের যে অভিপ্রেত যোগাযোগ, তার নিরীক্ষণ করেছিলেন অমিয়ভূষণ। সচেতনভাবে সময় সচেতনতা না দেখিয়ে ইতিহাসের গর্ভ থেকে মনিমুক্তো কুড়িয়ে এনেছেন। মনে রাখতে হবে যে প্রেক্ষাপটকে তিনি সম্প্রসারিত করতে চেয়েছেন বারবার তার অভিমুখ ঠিক হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে। লেখকের আস্তিত্ত্বিক চিন্তার মূলেই ছিল মানুষ ও ঘটনার ইতিহাস। এবং ইতিহাসের সেই প্রবাহ ধরেই একে একে চলে এসেছেন মধু সাধুখাঁ থেকে নির্বাসের বিমি। তৈরি হচ্ছে উপনিবেশিত বাংলা কথাসাহিত্যের অ্যান্টিথিসিস।
উত্তরবঙ্গের কোচবিহারেই আমৃত্যু কাটিয়েছেন অমিয়ভূষণ। প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল একটি নাটক, ‘দ্য গড অন মাউন্ট সিনাই’। তারপর প্রথম গল্প ‘প্রমীলার বিয়ে’। প্রথম উপন্যাস ‘গড় শ্রীখণ্ড’। স্বাভাবিকভাবেই উত্তরবঙ্গের লোকায়ত সমাজ বিপুলভাবে আশ্রিত হয়েছে তাঁর লেখায়। নদী, পর্বত, উপত্যকা এবং জনমানুষের সান্নিধ্যে তাঁর কথাসাহিত্য মৌলিক ভাস্বরতায় ঋদ্ধ হয়েছে। আমরা যখন গড় শ্রীখণ্ড, চাঁদবেনে, রাজনগর বা মহিশকুড়ার উপকথা পাঠ করি, বিস্ময় জাগে যে মানবজীবনের অত্যাশ্চর্য সব তলদেশগুলো কী নিবিড় মমতায় ছুঁয়ে গেছেন লেখক। কাহিনির কাল নির্বাচনে কিংবা আখ্যানের গতি বিন্যাসে এক বহুস্তরীয় বাস্তব পৃথিবীর পর্দা উন্মোচিত হয়েছে বারবার।

তাঁর লেখায় রয়েছে অনুপুঙ্খ জলযাত্রা, অনন্ত ট্রমা, জীবন পরিক্রমা এবং ‘মায়ের গর্ভের মতো’ সেই আনন্দলোকের অন্বেষণ। মানুষের অন্তর্লীণ যাপন পরিক্রমার তাগিদে অমিয়ভূষণ বিশাল কলেবরের যে ‘গড় শ্রীখণ্ড’ রচনা করেন ঠিক তার পরবর্তীকালে উপন্যাস ‘নয়নতারা’-তে তিনি আর সেই সমাজ ও কালে স্থিত থাকেন না। কেবল থেকে যায় পদ্মা। পরবর্তীতে দুখিয়ার কুঠি, নির্বাস বা রাজনগরে লেখকের আগ্রহ কেবল গল্প বলা বা ভৌগোলিক নির্মিতি নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ইঙ্গিত প্রদানের চেষ্টা করা। ভিন্ন ভিন্ন কালখন্ড নির্বাচন, রহস্যময়তা, উচ্চমার্গের মানবিক বোধ এবং লোকায়ত সম্পৃক্ততা একটি অন্য শিখরে পৌঁছে যায় যখন আমরা পড়ি তাঁর ‘মধু সাধুখাঁ’। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে ভাষাজটিলতা নিয়ে। এই প্রশ্নে অমিয়ভূষণ কমলকুমার মজুমদারের মতোই আপোষহীন। দু’জনেই বিলক্ষণ জানতেন যে উত্তর আধুনিক সময়ে কথাসাহিত্যে নিছক একটি গল্পের চাইতেও গুরুত্বপূর্ন হল তার ভাষা ও প্রকরণ। সেক্ষেত্রে প্রতিটি রচনাই একজন পাঠকের ঋদ্ধতা বা তন্নিষ্ঠতা দাবি করে।
আমরা ওঁর ছোটোগল্পগুলোর কাছেও পৌঁছতে পেরেছি কি? স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলা ছোটোগল্পে বাস্তববোধ-সমাজমনস্কতা এবং প্রতিবাদী চেতনার যে অনন্য সমন্বয় দেখা গেছিল, সেখানে অমিয়ভূষণ মজুমদার উজ্জ্বলতমদের মধ্যে একজন। ‘তাঁতীবউ’ বা ‘উরুন্ডী’-র মতো ছোটোগল্প বিশ্বসাহিত্যে বিরল। সাহিত্যে প্রতীকধর্মীতাকে এক অন্য শিখরে নিয়ে যায় তাঁর ‘পলাদহ’ বা ‘দুলারহিনদের উপকথা’ নামের ছোটোগল্প। তিনি বলছেন গল্প লেখা হল ‘ইনটেনসিভ ডিলাইট’ (Intensive delight)। তিনি মনে করেন, “কিছুর প্রমাণ নয়, কোনো প্রস্তাবও নয়, শুধু বর্ণনা। এর বেশি আমার দাবি নেই”। সমৃদ্ধ পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবেন এই বয়ান কতটা যথাযথ যখন তারা পড়বেন ‘সাদা মাকড়সা’ বা ‘দীপিতা ঘরে রাত্রি’। অমিয়ভূষণের আখ্যানে যাঁরা ঠাঁই পেয়েছেন তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই নিম্নবর্গীয় কৃষিজীবী ছিন্নমূল মানুষ। যেমন মাতালু, কাঁকরু, দুদিয়া, রংবর, আসফাক… এরাই যে সেই অনাদি কাল থেকে প্রবাহিত ইতিহাসের ধারক ও বাহক তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াটাই যেন লেখকের উদ্দেশ্য।

নিভৃতচারী অমিয়ভূষণ সকলের জন্য লেখেননি। তিনি মনে করতেন পদার্থবিদ্যা যেমন সবার বোঝার কথা নয়, ঠিক তেমনি সাহিত্যও সবার জন্য নয় এবং পাঠকের সংখ্যা বাড়লেই যে পাঠ্যের গুণ বাড়ে, এও একেবারে অবান্তর কথা।
অমিয়ভূষণ পাঠের মজা হল এই যে, লেখকের আত্মস্থ করা বিশ্লেষিত ঘটনা ও চরিত্রসমূহ যখন পাঠকের কাছে পরিবেশিত হয়, তা ছেঁড়া কাগজের টুকরোর মতো অসংলগ্ন মনে হয় কিছু ক্ষেত্রে। সেই অসজ্জিত আখ্যানকে ‘ডেকোরেটেড’ করে নেওয়াটা যেন পাঠকেরই দায়িত্ব। ঠিক এখানেই অমিয়ভূষণ একজন অতুলনীয় সপ্রতিভ একজন লেখক। এমন বহুস্তরীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রতিফলিত কথাশিল্প স্বাভাবিক কারণেই প্রবল জনপ্রিয় হয়নি। জনপ্রিয় হওয়ার সেরকম তাগিদও বোধ করেননি লেখক। কলকাতার সাহিত্যবাজার এবং হুজুগে জনপ্রিয়তা থেকে অনেক দূরে নিজস্ব ভূখন্ডে নির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর প্রথম গল্প ‘প্রমীলার বিয়ে’ কলকাতার কোনো পত্রিকায় কেন প্রকাশিত হলো না জানতে চাইলে তিনি বলেন যে, এই গল্প ছাপার মতো যোগ্য পত্রিকা কলকাতায় একটাও নেই। তাঁর আত্মকথনে বারংবার এই দম্ভ আরো অমলিন তীব্রতায় প্রতিভাত হয়। একজায়গায় তিনি বলেন –
“কলকাতা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাইছি না। কলকাতাকে বলতে চাইছি, বেরিয়ে এসো ইংরেজিআনা থেকে, দ্যাখো এই মাতৃভূমি, ভালোবাসো একে, মরবে না। কতদিন আর অ্যাংলো স্যাকসনি মুখোশে থাকবে!”
‘রাজনগর’ উপন্যাসের জন্য তিনি পেয়েছিলেন বঙ্কিম পুরস্কার। সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হয় এই পুরস্কার কীভাবে তাঁকে আরো লিখতে অনুপ্রেরণা যোগাবে! তিনি অকপট বলেন, “পুরস্কার লেখাকে ভালোও করে না মন্দও করে না। লেখাটা হয় নিভৃতে”।

সুতরাং, এটা আজ স্পষ্ট যে, নিভৃতচারী অমিয়ভূষণ সকলের জন্য লেখেননি। তিনি মনে করতেন পদার্থবিদ্যা যেমন সবার বোঝার কথা নয়, ঠিক তেমনি সাহিত্যও সবার জন্য নয় এবং পাঠকের সংখ্যা বাড়লেই যে পাঠ্যের গুণ বাড়ে, এও একেবারে অবান্তর কথা। লেখার মতো পাঠও যে একটি শ্রমসাপেক্ষ কাজ, পাঠককেও একটি লেখার কাছে পৌঁছতে গেলে যে হাড়ভাঙা খাটনি করতে হয়, তাকেই বারবার স্বীকৃতি দিয়েছেন অমিয়ভূষণ। তাই মনে হয় অমিয়ভূষণের লেখা সঙ্গত কারণেই পাঠকের মননকেও ঊর্বর করে তোলে। তাই তিনি জরুরি। তাই বাংলার কথাসাহিত্যে তিনি চিরকালের প্রাসঙ্গিক একজন অক্ষরশিল্পী।
