আর কি কখনও পুনরুজ্জীবিত হবে কাটোয়ার কাগজের তৈরি মুখোশ শিল্প?

 

শ্রাবণের হালকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো শীতল হাওয়ার ধাক্কায় নৃত্য করে মাটিতে ঝরে পড়ছে। মেঘাচ্ছন্ন অপরাহ্ন কাটোয়ার বল্লবপাড়া ফেরিঘাটের নিস্তরঙ্গ পরিবেশকে আরও স্মৃতিমেদুর করে তুলেছে। ওপার থেকে এপারে যাত্রীরা আসছে আর চলে যাচ্ছে। কিন্তু কারো কোলাহল করার কোনো ইচ্ছে নেই। তারা যেন শান্ত হয়ে গন্তব্যের পথে এগিয়ে চলেছে। এই ফেরিঘাটের পাশেই হরিসভা পাড়া। আর সেখানে বসে স্মৃতির অতল গভীরে শান্ত নিস্তরঙ্গভাবে ডুবে যান বছর সত্তরের কার্তিক দাস। একটা সময় ছিল যখন কাটোয়ার কাগজের তৈরি মুখোশ বললেই কার্তিক দাসের নাম সবার আগে আসত। কাটোয়ার রথ ও চড়কের মেলাগুলো আলো করে থাকতো তাঁর তৈরি মুখোশে। এমনকী অন্যান্য জেলাতেও পাড়ি জমাতো হনুমান, অসুর, বাঘ, সিংহ, জোকার, ভাল্লুক, কঙ্কাল, বেড়াল মুখোশগুলো।

 

একটা সময় ছিল যখন কাটোয়ার কাগজের তৈরি মুখোশ বললেই কার্তিক দাসের নাম সবার আগে আসত। কাটোয়ার রথ ও চড়কের মেলাগুলো আলো করে থাকতো তাঁর তৈরি মুখোশে। এমনকী অন্যান্য জেলাতেও পাড়ি জমাতো হনুমান, অসুর, বাঘ, সিংহ, জোকার, ভাল্লুক, কঙ্কাল, বেড়াল মুখোশগুলো।

বংশ পরম্পরা মেনে দশকের পর দশক ধরে এই শৈল্পিক শৈলীকে কাটোয়ার বুকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কার্তিক দাস। তাঁর দুই ছেলে দীপঙ্কর ও পঞ্চানন দাসও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। একটা মরশুমে পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে প্রায় দুই হাজারেরও বেশি মুখোশ তৈরি করতেন তিনি। রথ ও চড়ক এলেই স্থানীয় গবেষক থেকে শুরু করে টিভি চ্যানেলের ভিড় লেগে থাকত তাঁর বাড়ির গলিতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে চাহিদা কমতে শুরু করে। কোভিড মহামারী পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে গত চার বছর ধরে মুখোশ তৈরি পুরোপুরি বন্ধ। জীবিকা নির্বাহের জন্য কার্তিক দাসের পরিবার শুধুমাত্র মাটির কাঠামোর প্রতিমা নির্মাণ করে চলেছেন। এখন আর কেউ আসে না তাঁদের বাড়ির গলিতে। রথ ও চড়ক এলে মুখোশ তৈরির ব্যস্ততা কার্তিক দাসের বাড়ির বারান্দায় আর দেখা যায় না। শুধু পড়ে রয়েছে প্রায় ১২টির মতন মুখোশ এবং কয়েকটি ধুলোপড়া মুখোশের ছাঁচ।

কাগজ ব্যবহার করে এই ধরনের মুখোশ কীভাবে তৈরি হতো সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কার্তিক দাসের পুত্র দীপঙ্কর দাস জানিয়েছেন, প্রথমে মাটি দিয়ে এক খোলের মুখোশের ছাঁচ তৈরি করতে হয়। এই ছাঁচ কখনও বাঁদরের হতে পারে, তো কখনও জোকার আবার প্রয়োজন মতো অসুরের। এরপর খবরের কাগজের ছোটো টুকরো করে তার সঙ্গে বাড়িতে নির্মিত আঠা মিশিয়ে আস্তরণ বা পোটি তৈরি করে ছাঁচে বসাতে হয়। ছাঁচে বসানো কাগজের তৈরি প্রথম আস্তরণের ক্ষেত্রে খুবই কম আঠা ব্যবহার করা হয়। এইভাবে একাধিক আস্তরণ তৈরি করে ছাঁচে বসানো হয়। ছাঁচের মধ্যে কোনো ভাবে যাতে আঠা না লেগে যায় সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথম আস্তরণে কম আঠা দেওয়া হয়। পরবর্তী আস্তরণগুলোতে আঠার পরিমাণ তুলনায় বেশি থাকে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় ন্যূনতম ১০টিরও বেশি আস্তরণ দেওয়া হয় ছাঁচের মধ্যে। আস্তরণটা একটু মোটা হলেই সেগুলি ছাঁচ থেকে কাঁচা অবস্থায় তুলে নিয়ে রোদে শুকিয়ে তার ওপর মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। মাটির প্রলেপ শুকিয়ে গেলে খড়িমাটি দিয়ে রঙের প্রাথমিক ভিত গড়ে তোলা হয়। তারপর প্রয়োজনমতো বাজার চলতি রং দিয়ে মুখোশগুলোকে প্রাণবন্ত করে তোলা হয়। প্রসঙ্গত, মাটির প্রলেপ দেওয়ার আগেই মুখোশের চোখগুলো ফোটানো হয়। শিল্পীর কথায় মাটি গুলে মুখোশের মুখে আস্তরণ দিলেও তার ওজন হালকা থাকে। রং করার সুবিধার্থে এবং কাগজের ভাঁজ যাতে বোঝা না যায় সেই কারণে মাটি গুলে আস্তরণ দেওয়া হতো।

 

গ্রামীণ শিশুদের মনোরঞ্জনের পাশাপাশি নাটক ও যাত্রার জন্য মুখোশ তৈরির বরাত মিলত। এমনকী নির্বাচনী প্রচারে মুখোশের চাহিদা ছিল। তাই স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলির কর্মীরাও আসতেন কার্তিকবাবুর কাছে। আজ সবই স্মৃতি হয়ে থেকে গিয়েছে। প্রচারের আলো থেকে আলোকবর্ষ দূরে থাকার কারণে কাটোয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে এখানকার মাটি থেকে উঠে আসা মুখোশ শিল্প। শিল্পীর কাছে এখন শুধু পড়ে রয়েছে একরাশ স্মৃতি এবং তার সঙ্গে খড়িমাটির আস্তরণ গায়ে মেখে থাকা ১২টি মুখোশ। তার ওপর পড়েছে ধুলো। এছাড়াও তিনটি ধুলো ভর্তি মুখোশের মাটির ছাঁচ রয়েছে। তার মধ্যে একটি ভেঙে গিয়েছে। প্রিয়জনের মৃত্যু হলে তার পরিজনরা যেমন তার ব্যবহৃত জিনিসগুলি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চায়। সেগুলোর মধ্যে তার প্রিয় মানুষের ঘামের গন্ধ শ্বাস-প্রশ্বাসের ছায়া যেমন লেগে থাকে। ঠিক তেমনই এগুলোই স্মৃতি-সম্বল হয়ে রয়েছে শিল্পীর কাছে। পুরোনো রং করা মুখোশের ছবিগুলো রয়ে গিয়েছে শিল্পীর মোবাইলের গ্যালারিতে। সেইগুলো তিনি প্রতিবেদককে দেখালেন। মুখোশগুলোর মৌখিক অভিব্যক্তি দেখলে মোহিত হতে হয়। খড়ি মাখা সাদা মুখোশের শরীরে যেদিন আবার রামধনুর রং খেলা করে বেরোবে, সেদিন হয়তো বহু জন্মান্তর পেরিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে কাটোয়ার মুখোশশিল্প।

প্রচারের আলো থেকে আলোকবর্ষ দূরে থাকার কারণে কাটোয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে এখানকার মাটি থেকে উঠে আসা মুখোশ শিল্প। শিল্পীর কাছে এখন শুধু পড়ে রয়েছে একরাশ স্মৃতি এবং তার সঙ্গে খড়িমাটির আস্তরণ গায়ে মেখে থাকা ১২টি মুখোশ। তার ওপর পড়েছে ধুলো।

 

বর্তমান সময় ছৌ ও গমিরা মুখোশ বাংলার সীমান্ত ছাড়িয়ে ভিন রাজ্যেও পাড়ি দিচ্ছে। হস্তশিল্প মেলায় পুরুলিয়া জেলার প্যাভিলিয়ন গোটাটাই চলে যায় ছৌ নাচের মুখোশের দখলে। প্রচারের কারণেই এগুলো সম্ভব হয়েছে। তেমনই আগামী দিনে প্রচারের আলো এবং জনসচেতনতা গড়ে উঠলে কাটোয়ার মুখোশও বিশ্ব জয় করবে।

Written by