চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী প্রতিমার উচ্চতা কেন ২৫-২৭ ফুট? জানুন ইতিহাস

গদ্ধাত্রী পুজো আসন্ন। যে পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে চন্দননগরের নাম। সম্প্রতি মায়া আর্ট স্পেসের আড্ডায় বসেছিলেন চন্দননগরের তিন বাসিন্দা। প্রাক্তন অধ্যাপক ও লেখক ড: বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ দেবাশিস মুখোপাধ্যায় (দেমু) এবং অধ্যাপক ও গ্রাফিক ডিজাইনার পিনাকী দে। মায়া আড্ডায় এদিনের মূল আলোচনা ছিল চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো এবং পুজোতে আলোর ব্যবহার ও ইতিহাস নিয়ে।

উপস্থিত রয়েছেন পিনাকী দে,দেবাশিস মুখোপাধ্যায় (দেমু) এবং ড. বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (বাঁদিক থেকে)

চন্দননগরের বিশেষত্বই হল, এখানকার জগদ্ধাত্রী মূর্তি হয় বিশালাকার, যার উচ্চতা প্রায় ২৫ থেকে ২৭ ফুট। হয়তো প্রতিমায় বলপূর্বক দেবত্ব আরোপ করার জন্যই এমনটা করা হয়েছিল আদিতে। সে সময়ে চন্দননগরে ফরাসিরা রাজত্ব করত। বলাই হত যে, “এই পুজো সাহেব-মেমদের টুপি ফেলে দেবে”।

হিন্দু দেবী জগদ্ধাত্রী, দেবী দুর্গার অপর রূপ। উপনিষদ মতে, তাঁর নাম উমা হৈমবতী। কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে বাংলার যে জায়গাগুলিতে মহাসমারোহে জগদ্ধাত্রী পুজো উদযাপিত হয়, তার মধ্যে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হল হুগলি জেলার চন্দননগর এবং নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর। মনে করা হয়, ১৭৬২ সালে কৃষ্ণনগরের তৎকালীন শাসক রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এই পুজোর সূচনা করেন। তাঁর আদেশেই নাকি চন্দননগরেও শুরু হয় জগদ্ধাত্রী পুজো। চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো ঘিরে প্রতি বছর অগণিত মানুষের সমাগম ঘটে, তা আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে চন্দননগর দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে তার দক্ষ আলোকসজ্জার জন্য।

এদিন ড: বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দেবাশিস মুখোপাধ্যায় দুজনের কথোপকথনেই উঠে আসে চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোর নানান মাহাত্ম্য, পুরাণকথা ও উদযাপনের ইতিহাস। যা আজও সাধারণ মানুষের অজানা। জগদ্ধাত্রী মূলত তান্ত্রিক দেবী, তাঁর উপাসনা সম্পূর্ণ তন্ত্র মতে করা হয়। এই পুজো আগে কৃষ্ণনগরে শুরু হয়েছিল না চন্দননগরে, সে বিষয়ে ধোঁয়াশা রয়েই যায়। কৃষ্ণনগরের বেশ কিছু জায়গায় দেখতে পাওয়া যায় যে জগদ্ধাত্রীর সঙ্গে থাকা সিংহটির মুখ সামনের দিকে, অর্থাৎ দর্শকদের মুখোমুখি। এই সিংহের আদল অনেকখানি টেরাকোটা মূর্তির মতো। এমন মূর্তি চন্দননগরের কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। তাছাড়া কৃষ্ণনগরের মূর্তি যথেষ্ট ছোটো। কিন্তু চন্দননগরের বিশেষত্বই হল, এখানকার জগদ্ধাত্রী মূর্তি হয় বিশালাকার, যার উচ্চতা প্রায় ২৫ থেকে ২৭ ফুট। হয়তো প্রতিমায় বলপূর্বক দেবত্ব আরোপ করার জন্যই এমনটা করা হয়েছিল আদিতে। সে সময়ে চন্দননগরে ফরাসিরা রাজত্ব করত। বলাই হত যে, “এই পুজো সাহেব-মেমদের টুপি ফেলে দেবে”। অর্থাৎ, ফরাসিরা যখন প্রতিমার মুখদর্শন করবার জন্য মাথা উঁচু করবেন, তখন তাঁদের টুপি পড়ে যাবে। এভাবে দেবীর মহিমা অবচেতনেই জনসাধারণের অবচেতনে প্রোথিত হবে। মূর্তিটিকে যাতে অস্বাভাবিক রকমের বড়ো বলে মনে হয়, সে জন্য এক ধরনের ইলিউশন রাখা হয় মূর্তি তৈরির ক্ষেত্রে। দেবীর প্রতিমা এবং সিংহ ও হাতি আলাদা ভাবে তৈরি করে তারপর তা একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, এই রেওয়াজ নাকি এখনও চলছে। আর মূর্তি দুটির মাঝের দূরত্ব ঢাকতে শোলার সজ্জা ব্যবহার করা হয়।

অধ্যাপক বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘চন্দননগর জগদ্ধাত্রী পুজোর বিবরণ ও কয়েকটি ভুল তথ্যের কথা’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ নয়, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের বিশ্বস্ত অনুচর দাতারাম সুর রাজার অনুদান নিয়ে ১৭৬২ সালে প্রথম গৌরহাটি গ্রামে তাঁর বিধবা কন্যার বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো অনুষ্ঠান করেছিলেন। প্রথম দিকে এই পুজো ছিল রাজাদের। পরে সামন্ত, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। জানা যায় চন্দননগরের বারোয়ারি পুজোর সময়কাল ১৭৯০। উপনিবেশ স্থাপনের উদ্দেশ্যে ফরাসিদের চন্দননগরে আগমনের পরেই এখানে সর্বজনীন জগদ্ধাত্রী পুজো-র সূচনা হয়।

বৈদিক যুগের পর আধুনিককালে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে চন্দননগরে প্রথম সর্বজনীন জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন হয়। সেই সময় চন্দননগর নদীবন্দর দিয়ে প্রধানত তাঁত বস্ত্র রপ্তানি হত। ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে গঙ্গার তীরে চাউল পট্টিতে সর্বপ্রথম সর্বজনীন জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু হয়। এজন্য চাউলপট্টিকে আদি পুজো বলা হয়। প্রথম থেকেই পুজো এখানে চারদিনের। এরপর ব্যবসায়ীরা জিটি রোডের পশ্চিমে নিজেদের এলাকায় পুজো শুরু করেন। পরে ব্যবসায়ীরা কিছু দূরে আলাদাভাবে পুজো শুরু করেন। নাম হয় কাপড়েপট্টির পুজো। পরে ময়দাপট্টির ব্যবসায়ীরা চাউলপট্টির কিছু দূরে আলাদাভাবে পুজো শুরু করেন। নাম হয় ময়দাপট্টির পুজো। অপর নাম মাড়োয়ারিপট্টির পুজো। যার পোশাকি ও বর্তমান নাম লক্ষীগঞ্জ চৌমাথা। সবজি বিক্রেতারাও চাউপট্টি থেকে আলাদা হয়ে পুজো শুরু করেন। লক্ষ্মীগঞ্জ বাজার এখানে মুলো বিক্রি হত, সেই স্থানের পুজো শুরু হয়। মুলোপট্টির পুজো নামে পরিচিত সেটি। যার পোশাকি নাম লক্ষ্মীগঞ্জ বাজার। লক্ষীগঞ্জ ব্যবসায়ীদের এই চারটি প্রধান পুজো। পুজোর খরচা বহন করেন ব্যবসায়ীরাই।

Written by