
কী খাবেন আর খাবেন না, ভেবে দেখুন
সুগার, ডায়বেটিস, ওবেসিটিতে ভুগছেন অথচ ঠাণ্ডা নরম পানীয় ছাড়া আপনার চলে না? আপনার এই দুশ্চিন্তার সুযোগেই মার্কিন বহুজাতিক ‘দ্য কোকা-কোলা’ কোম্পানি বাজারে এনেছিল ‘ডায়েট কোক’। আপনিও মনের আনন্দে ঢক ঢক করে খেলেন, কিন্তু টের পেলেন না ‘বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা’।
ডায়েট কোকের বোতলগুলিতে উপাদানের জায়গায় কোম্পানির তরফে বড়ো বড়ো করে লিখে দেওয়া আছে, “CONTAINS CAFFEINE", “CONTAIN NON-CALORIC SWEETENER”। আর মূল উপাদান হিসেবে এই ডায়েট কোক-এ থাকে কার্বনেটেড ওয়াটার, অ্যাসিডিটি রেগুলেটর (৩৩৮, ৩৩১ iii), সুইটনারস (৯৫১, ৯৫০), প্রিসারভেটিভ (২১১), ক্যাফেইন (১০এমজি/১০০জি), কালার (১৫০ডি), ফ্লেভারস (ন্যাচারাল ফ্ল্যাভারিং সাবস্ট্যান্সেস)। এই যে সুইটনার (৯৫১, ৯৫০) ব্যাবহার করা হচ্ছে ডায়েট কোকে, একবার গুগল করে দেখুন তো, এই সুইটনার (৯৫১, ৯৫০) সম্বন্ধে কী বলা হচ্ছে? গুগল আপনাকে যা দেখাবে তাতে কপালে দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ পড়তে বাধ্য। সুইটনার ৯৫১ বা ‘অ্যাসপারটেম’ (Aspartame) হলো কার্সিনোজেনিক অর্থাৎ মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী। এ নিয়ে বিতর্ক ছিল বহুদিন ধরেই, সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গবেষণাকারী শাখা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (IARC) একটি প্রতিবেদন ফের উস্কে দিল এই প্রসঙ্গ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের মাধ্যমে অ্যাসপারটেমের নমুনা পরীক্ষা করে এতে ক্যান্সার জীবাণু থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে WHO। এবার কোন কোন জিনিস থেকে মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে- সেই তালিকায় অ্যাসপারটেমকে রাখা হচ্ছে। আগামী ১৪ জুলাই এই কৃত্রিম চিনিকে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী যৌগ বলে ঘোষণা করবে IARC।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) ১৯৮১ সালে অ্যাসপারটেম ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। এরপর থেকে পাঁচবার এর নিরাপত্তা পর্যালোচনা পর্ব চলে। বর্তমানে প্রায় ৯০টি দেশে এই কৃত্রিম চিনি ব্যবহার করা হয়। এক চামচ সাধারণ চিনির তুলনায় ২০ গুণ বেশি মিষ্টি কৃত্রিম এই চিনি। কোকাকোলা, ডায়েট সোডা, চুইংগাম এবং আরও কিছু নরম পানীয়তে অ্যাসপারটেম ব্যবহার করা হয়। বাজারে যে সব ‘ইনস্ট্যান্ট টি’ বা তৈরি করা চা পাওয়া যায় তার মধ্যে ৯০ শতাংশতেই এই যৌগ থাকে। অথচ, বিশ্বজুড়ে এক বিপুল বাজার তৈরি করে রেখেছে এই ধরনের পণ্য।
মূলত চিনি উৎপাদন হয় আখ এবং বিট থেকে। সঙ্গত কারণেই তার রঙ হওয়া উচিত লাল। এটিকে ব্লিচ করে সাদা করা হয় যেমন ভাবে আমাদের জামাকাপড় পরিষ্কার করা হয়।
IARC এর আগেও এই সব খাদ্য পণ্যকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ঘোষণার পর বাজারে এর বড়ো প্রভাবও পড়েছিল। অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যে ব্যবহৃত উপাদান বদলাতে পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিল। তারপর আবার যে-কে-সেই!
তবে, সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান একজন মানুষ কতটুকু পর্যন্ত খেতে বা পান করতে পারেন— এই তথ্য জানায় না IARC। এ বিষয়ে মতামত দিয়ে থাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরেক অঙ্গ সংস্থা জেইসিএফএ (JECFA)। এ সংস্থাটি ১৯৮৩ সাল থেকে বলে আসছে, একজন মানুষ সীমিত পরিমাণ অ্যাসপার্টেম গ্রহণ করতে পারেন। চলতি মাসে জেইসিএফএ আবার নতুন করে অ্যাসপার্টাম নিয়ে নতুন মতামত প্রকাশ করবে।
প্রসঙ্গত, মূলত চিনি উৎপাদন হয় আখ এবং বিট থেকে। সঙ্গত কারণেই তার রঙ হওয়া উচিত লাল। এটিকে ব্লিচ করে সাদা করা হয় যেমন ভাবে আমাদের জামাকাপড় পরিষ্কার করা হয়। সাধারণ ভাবে চিনিতে পাওয়া যায় গ্লুকোজ এবং ফ্রুক্টোজ। ফ্রুক্টোজ আমাদের শরীরে ব্যবহৃত না হয়ে সোজা লিভার এবং প্যাঙ্ক্রিয়াস কে ফ্যাটি অ্যাসিডে ভরিয়ে দেয়। সেখানে গুড় থেকে পাওয়া যায় গ্লুকোজ, সুক্রোজ, প্রচুর মিনারেল এবং ভিটামিনস, যেগুলি সাদা চিনিতে পাওয়া যায় না। গুড় থেকে মিনারেল হিসেবে ক্যালসিয়াম ফসফরাস ম্যাগনেসিয়াম পটাশিয়াম আয়রন জিংক এবং কপার ভালো পরিমাণে পাওয়া যায়। এই মিনারেলগুলো আমাদের শরীরে খুব সামান্য পরিমাণে লাগে। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবে যদি অতিরিক্ত হয় সেটা আমাদের শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। সুক্রোজ আমাদের শরীরে কাজে লেগে যায়। ফলিক অ্যাসিড এবং ভিটামিনে ভরপুর গুড়ে যেহেতু বেশি মাত্রায় সুক্রোজ (ডাই স্যাকারাইড) থাকে তাই যেকোনো ডায়াবেটিক রোগী নিশ্চিন্তে খেতে পারেন, যেখানে সাদা চিনি খাওয়া মানে সরাসরি বিষ খাওয়া। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বারবার ফুড ইন্ড্রাস্ট্রিগুলোকে সাদা চিনির উপরে ‘Injurious to Health’ লিখতে বলছে।
চিনির বিকল্প হিসেবে প্রতিদিন মধু খাচ্ছেন, তা খাঁটি তো? সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বা সিএসই জানিয়েছিল, এদেশে বিক্রি হওয়া বেশ কিছু নামি ব্র্যান্ডের মধুতে চিনির সিরাপ বা বিভিন্ন কৃত্রিম সুইটনার দেওয়া হয় ভেজাল হিসেবে। কয়েক মাস আগে একটি জনৈক ইংরেজি সংবাদপত্র এই ভেজালের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং এর কারণে যেধরনের স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা রয়েছে, তা তুলে ধরেছে একটি প্রতিবেদনে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!

তাহলে উপায়? সাদা চিনির বিকল্প হিসেবে যতটা সম্ভব ব্যবহার করুন খাঁটি গুড়, খাঁটি মধু। সম্ভব না হলে অল্প পরিমানে চিনি খান। ভেজালহীন, ১০০% খাঁটি খাদ্যদ্রব্য বিক্রির জন্য অনেকদিন ধরেই নির্ভরযোগ্য অবস্থান ধরে রেখেছে ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ নামে একটি ছোটো বানিজ্যিক সংস্থা। বিজ্ঞাপনের চটক নয়, এই সংস্থার ইউএসপি হল ‘খাঁটি খাবার’। তাঁরা মনে করেন, খাবার জিনিস খাঁটি হলে এমনিতেই চাহিদা তৈরি হয়, দেখনদারির প্রয়োজন পড়ে না। আর সেকারণেই এই বিপণির মধু, গুড় বেশ জনপ্রিয়। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ‘বঙ্গদর্শন’-কে স্টোর-এর পক্ষ থেকে রোহিত সেন বলেন, “যে মধু আমরা ক্রেতাদের পৌঁছে দিই, তা সরাসরি সুন্দরবনের মৌলিদের থেকে সংগ্রহ করা। তাঁরা মৌচাক থেকে মধু বের করে পাত্রে ভরে আমাদের সরাসরি দেন। গরম করেন না, কোনো কিছু যোগও করেন না। আমরা সেগুলিকে কাচের বোতলে ভরে সরাসরি কাস্টমারের হাতে তুলে দিই। আমাদের মধু তাই ভেজালহীন, সবথেকে খাঁটিও বলা চলে। গুড়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।” আইআইটি খড়গপুর (এএফটি ল্যাব)-এ পরীক্ষিত এবং প্রত্যায়িত সার্টিফিকেট দেখিয়েছেন রোহিত। সেখানে প্রত্যেক উপাদানের পরিমান উল্লেখ করা আছে শতাংশের হিসেবে।
তাই, আমাদেরই ঠিক করতে হবে কী খাবো, কী খাবো না। ভেজাল খাবেন না খাঁটি, তা নির্ধারণের ক্ষমতা কিন্তু একমাত্র ক্রেতাদের হাতেই। অভিনেত্রী-সমাজসেবক এমা ওয়াটসন একবার বিবৃতিতে বলেছিলেন, “As consumers, we have so much power to change the world by just being careful in what we buy.”।
_______________________
তথ্যসূত্র: ডিআরসিএসসি (DRCSC), https://drcsc.org/, খাবার নিয়ে ভাববার আছে, TONA FARM, রয়টার্স
