এই সংকটকালে সাহিত্য উৎসবের প্রয়োজনটা ঠিক কোথায়?

‘জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো’

‘জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো’… পাকিস্তানে বসে ‘ডায়ালগ-ইন গ্লোবাল বেঙ্গলি লিট-ফেস্ট’-এর পর্দা উন্মোচন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের এই গানের লাইনটিই স্মরণ করছিলেন মাসকাওয়াদ এহেসান। ২০২০ থেকে ২০২১। লকডাউন, শারীরিক দুরত্ব, মাস্ক, স্যানিটাইজার -এসবের বেড়াজাল থেকে বেরোতে পারেনি তামাম দুনিয়া। এতকিছুর মধ্যে, পৃথিবীর এই সংকটকালে সাহিত্য উৎসবের প্রয়োজনটা ঠিক কোথায়?

মাসকাওয়াদ এহসান, শুরুতেই যাঁর কথা বলছিলাম। মাসকাওয়াদ বাংলা ভাষা তথা আপামর বাঙালির কাছে গর্ব করার মতো একজন ব্যক্তিত্ব। ভাষার এমন সংকটের দিনেও তিনি পাকিস্তানে একটি বাংলা অনলাইন পত্রিকা সম্পাদনা করেন এবং ‘ডায়লগ-ইন’ সাহিত্য উৎসবের প্রারম্ভিক অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন তিনিই। এর থেকেই আন্দাজ করা যায় সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের বাংলা ভাষার প্রতি আবেগ ফুরিয়ে যায়নি, তা অফুরান। মাসকাওয়াদের সঙ্গে প্রারম্ভিক অনুষ্ঠানের একেবারে শুরুতেই ছিলেন বাংলা সাহিত্যজগতের দুই গুণীজন, সম্পাদক-লেখক ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায় এবং বাংলাদেশের সোনালী যুগের কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন।

চিড়িয়াখানার বন্দি পশুপাখিদের দেখে আনন্দ উপভোগ করতো যে মানুষ, সে নিজেই আজ বন্দি। বলছিলেন ত্রিদিববাবু। তাঁর কথায়, এই লকডাউনে বেশিরভাগ মানুষই সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর হয়ে পড়েছেন। তবে সবকিছুর উর্দ্ধে রয়েছে বই। এই দুঃসময়ে বইয়ের মতো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে আর কীই বা! একজন সারাদিন কতই বা ওয়েব সিরিজ দেখত পারে! বইয়ের বিকল্প বইই। ফোন-ল্যাপটপ-ট্যাব ইত্যাদি ডিভাইসে বই পড়া যায় কিন্তু, বই ছোঁয়া যায় না। বইয়ের ঘ্রান নেওয়া, হাতে নিয়ে পাতা উল্টে পড়া, কিছুটা পড়ে রেখে দিয়ে আবার পড়া…বইকে নিজের মতো উপভোগ করাটা খুব জরুরী বলেই মনে করি। এসব ব্যাপারে আমি পুরোনো পন্থী। তবে, হ্যাঁ, যেভাবেই হোক শেষপর্যন্ত ভাষার সঙ্গে, সাহিত্যের সঙ্গে, মননের সঙ্গে জুড়ে থাকাটাই একান্ত কাম্য।

পশ্চিমবাংলায় যে কণ্ঠস্বর আমরা মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় শুনতে পাই, সেই একই কণ্ঠস্বরে ঋদ্ধ পূর্ববাংলার সেলিনা হোসেনের কলম। সাহিত্য উৎসবের আলোচনায় তিনি বলছিলেন, সাহিত্যের জন্য কোনও মহামারি নেই, সাহিত্য এই সবকিছু থেকে উর্দ্ধে। কারণ জীবন ও মৃত্যুর এই যে যৌথ উদযাপন, এই যে নতুন সংকটের সম্মুখীন হয়েছি আমরা, তা বিশ্বসাহিত্যে নতুন আবেদন নিয়ে আসবে। প্লেগের সময় থেকে আমরা সেরকমই দেখে আসছি। কাফকা থেকে শুরু করে তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের বয়ানে উঠে এসেছে মহামারির ছবি। সৃষ্টি হয়েছে নতুন আঙ্গিক।কথাগুলো দৃঢ়স্বরে বলতে বলতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছিলেন সেলিনা। মনে করছিলেন সাহিত্যজগতের নক্ষত্র কোভিডের প্রকোপে হারিয়ে গিয়েছেন। মনে করছিলেন আনিসুজ্জামান-কে। তিনি বলছিলেন, অনেকে চলে গিয়েছেন ঠিকই কিন্তু, রেখে গিয়েছেন তাঁদের অমর সৃষ্টি। তাই মৃত্যু সকলের জন্য নয়।

ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায়, সেলিনা হোসেইন ছাড়াও ‘ডায়ালগ-ইন গ্লোবাল বেঙ্গলি লিট-ফেস্ট’-এর সূচনা পর্বের মূল্যবান আলোচনায় যুক্ত হয়েছিলেন পবিত্র সরকার, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণা বসু, অভীক মজুমদার, সুবোধ সরকার, শ্রীজাত, আব্দুল গফফর চৌধুরী, সইফুল্লা মাহমুদ দুলাল, মন্দাক্রান্তা সেন-সহ আরও বিশিষ্টরা। তাঁরা সকলেই যুক্ত হয়েছিলেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে ইন্টারনেট যুগে বাংলা সাহিত্যের ভবিষৎ ও ভাষার বিবর্তন, অনুবাদ জগত, বিশ্বের দরবারে বাংলা সাহিত্য, কবিতা শ্রাব্য রূপ আবৃত্তি ও গান।

সোশ্যাল মিডিয়ার খারাপ দিক গুলো যত সহজে চোখে পড়ে, ভালো দিক গুলো অত সহজে নয়। লকডাউনের সময় থেকে সারা বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ এবং জনসংযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। তাই পরিশেষে একথা বলাই যায়, শারীরিক দূরত্ব বিধির কাঁটাতার পেরিয়ে, সামাজিকভাবে ‘আরও বেঁধে বেঁধে’ থাকতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং সর্বপ্রথম এত বড়ো পরিসরে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য উৎসব। বিশ্ব সাহিত্যকে একজায়গায় আনতে ভারতীয় নলেজ বেসড সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ডায়লগ-ইন’ ( Dialoguein)-এর এই মহা-উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায় ‘বঙ্গদর্শন’।

 

Developed by DXDasia