
জীবনানন্দ লিখে গিয়েছেন, ‘মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে,/ প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন এখনও ঘাসের লোভে চরে।’ সবুজ গালিচার ময়দানে ঘোড়া চরছে, ঘাস খাচ্ছে দেখলেই জেগে ওঠে ফটোগ্রাফার সত্ত্বা, মনে উঁকি দেয় কলকাতাপ্রেমী, মহানগরের নস্টালজিয়া। ছবি তুলে ‘ডিসপ্লে পিকচার’ বা ‘কভার ফটো’ পোস্ট করে তবে শান্তি! কিন্তু সভ্যতার ভার বইতে বইতে সে’ঘোড়াগুলি কতটা ক্লান্ত তার খোঁজ কি কেউ নেয়? ঘোড়াগুলির ভবিষ্যৎ কী? সেই প্রশ্ন তুললো ‘আ ডাইং ফিউচার’। মঙ্গলবার তথ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হল ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। ওরা সবার বোঝা বয়ে গেল, ওদের বোঝা বইবে কে? একুশ মিনিটের তথ্যচিত্রে দর্শকদের বার বার একই প্রশ্নে তাড়া করে গেলেন পরিচালক অঙ্কিতা নস্কর। বাধ্য করলেন ভাবতে।
কুকুর, বিড়ালদের দাবি আদায়ে বহু পশুপ্রেমীরা ভাবেন, লড়াই করেন। একাধিক সংস্থা আছে। কিন্তু ঘোড়ার জন্য, ওদের হকের লড়াই লড়বে কারা?
হ্যাঁ, ‘আ ডাইং ফিউচার’ ওদের কথা বলে ওরা সভ্যতাকে গতি দিয়েছিল, ওরা আজও মানুষের বোঝা বইছে, আনন্দ-বিনোদন যুগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু ওদের ভবিষ্যৎ আঁধারে ঢাকা। ভিনদেশী যোদ্ধারা ঘোড়ায় চেপে এসেছিল ভারতে, তখনই ঘোড়ার আগমন ঘটেছিল উপমহাদেশে। তারপর আঠারো ও উনিশ শতকে কখনও ফিটন গাড়ি টেনে, আবার কখনও ট্রামের চাকা গড়িয়ে মহানগরবাসীদের গন্তব্য পৌঁছে দিত ঘোড়ারা। যুগ বদলেছে, সময় পাল্টেছে আস্তে আস্তে প্রয়োজন ফুরিয়েছে ঘোড়াদের। এখন ঘোড়ারা অবহেলার পাত্র, উপেক্ষার পাত্র। নাচার, অসহায়। উপেক্ষার ছবিটা স্পষ্ট করে বুনেছেন পরিচালক।
শহরে ঘোড়াদের এখন মূলত চারটি ক্ষেত্রে দেখা যায়। রেসের মাঠে, মাউন্টেন পুলিশের কাজে, ঘোড়াগাড়িতে আর বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান আয়োজনে নিছক বিনোদনের জন্য। যেমন অনেকে আজকাল ঘোড়ায় চেপে বিয়ে করতে যান। ঘোড়পুলিশ এবং রেসের মাঠের ঘোড়ারা যত্নে থাকে। ওরা সংকটে নেই। চিন্তা নেই চিকিৎসা নিয়ে। খাবারও পর্যাপ্ত। কিন্তু বাকি দু’টি কাজ যে ঘোড়াগুলি করে? ওরাই বিপন্ন। ওদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
ঘোড়ার গাড়ি টানে মূলত ব্যক্তিগত মালিকানার ঘোড়ারা। ওদের দিয়ে কর্মক্ষমতার বেশি খাটানো হয়। ওরা রোগ, সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। যথাযত চিকিৎসা জোটে না। পশু চিকিৎসকেরা ক্যাম্প করেন, ওষুধ দেন সঙ্গে বিশ্রামের পরামর্শও দেন। বোঝা-টানা ঘোড়াদের কপালে আর বিশ্রাম মঞ্জুর হয় না। ময়দানের শুষ্ক ঘাস ওর খাবার। চরে নিজেদের খাদ্যের ব্যবস্থা ওদের নিজেদেরই করতে হয়। অপুষ্টির শিকার হয়ে শরীরে বাসা বাঁধে আলসার। পা ভেঙে যায়। বেরিয়ে পড়ে পাঁজর। সাজানোর জন্য ব্যবহৃত জিনিসের ওজনে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘক্ষণ চোখ বেঁধে রাখার ফলে এসে পড়ে স্থায়ী অন্ধত্ব। এই ঘোড়াগুলি যেন সভ্যতার দধীচি। বৃদ্ধ হয়ে রোগ, অনাহারে ভুগতে ভুগতে একদিন মরে ময়দানেই পড়ে থাকে ওদের দেহ। তারপর শেষ ঠিকানা হয় ধাপার মাঠ। ওদের মধ্যে কেউ কেউ কোনওমতে বেঁচে যায় রুগ্নদশায়, হয়তো চামড়া, মাংসের জন্য বিক্রি করে দেওয়া হয় না সেই ঘোড়াগুলিকে।
অপুষ্টির শিকার হয়ে শরীরে বাসা বাঁধে আলসার। পা ভেঙে যায়। বেরিয়ে পড়ে পাঁজর। সাজানোর জন্য ব্যবহৃত জিনিসের ওজনে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘক্ষণ চোখ বেঁধে রাখার ফলে এসে পড়ে স্থায়ী অন্ধত্ব। এই ঘোড়াগুলি যেন সভ্যতার দধীচি।
একদলের জোটে আরাম, ভবিষ্যৎ সমৃণ। আর একদল ঘোড়ার ভবিষ্যৎ তিমিরে ডোবা। দুই ধরনের ছবিই তুলে ধরেছে পরিচালক। এই বৈপরীত্যই যেন ‘আ ডাইং ফিউচার’র মূল ভিত্তি। তথ্যচিত্রে ময়দানের ঘোড়াদের প্রতি শহরবাসীর দৃষ্টিভঙ্গিও ফুটে উঠেছে। উঠেছে জোরালো প্রশ্ন, প্রশ্ন তুলেছেন সহ নাগরিকেরা কিন্তু সমাধানের পথ অজানা। কতকটা অসম্ভবও! আবহমানকাল থেকে ঘোড়া জড়িয়ে গিয়েছে সভ্যতার সঙ্গে। অতীতে ওরা ছিল সভ্যতার অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। দ্রুত সফরের প্রধানতম মাধ্যম। তারপর ধীরে ধীরে বিকল্প এসেছে, প্রয়োজন কমতে কমতে এখন কার্যত মূল্যহীন ওরা। তবুও বিনোদনের উপাদান হিসাবে রয়ে গিয়েছে কেউ কেউ। ভবিষ্যতে হয়তো সেটাও থাকবে না। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের এহেন সফর ভালো অনুভূতির পাশাপাশি মনকে বিষাদে ভরায়।
কুকুর, বিড়ালদের দাবি আদায়ে বহু পশুপ্রেমীরা ভাবেন, লড়াই করেন। একাধিক সংস্থা আছে। কিন্তু ঘোড়ার জন্য, ওদের হকের লড়াই লড়বে কারা? কয়েকজন আছেন। তাঁদের সংখ্যাও নগণ্য! হয়তো সবাই ঘোড়াদের নিয়ে ভাবেনও না।
প্রযোজক সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্পাদক নীল মালাকার এবং পরিচালক অঙ্কিতা নস্কররা যেন ঘোড়াদের দাবি আদায়ের লড়াইটা শুরু করলেন, প্রশ্ন তুলে দিলেন। মহানগরের নাগরিকদেরও যেন সওয়াল করতে বললেন, এই কারণেই সময়ের সাপেক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘আ ডাইং ফিউচার’ তথ্যচিত্রটি।
