
কান-এর মতো চলচ্চিত্র উৎসবে আলোকিত হচ্ছে ‘মার্কেট’, ‘ফেস ভ্যালু’, ‘ট্রেন্ড’
হিসেব অনুযায়ী বিগত ২৫ বছরে, ভারতে হাজার হাজার সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তার মধ্যে এ পর্যন্ত কান চলচ্চিত্র উৎসবে মনোনীত ছবির সংখ্যা মাত্র ১২টি। এর মধ্যে পুরস্কার জিতেছে ৭টি ছবি। মুরলি নায়ার (Marana Simhasanam, 1998), মনীশ ঝা (A Very Very Silent Film, 2002), রিতেশ বাত্রা (The Lunchbox, 2013), নীরজ ঘেওয়ান (Masaan, 2015), অস্মিতা গুহ নিয়োগী (Catdog, 2020), পায়েল কাপাডিয়া (A Night of Knowing Nothing, 2021) এবং শৌনক সেন (All That Breathes, 2022) -এঁরাই হলেন সেই ৭ বিজয়ী পরিচালক। এছাড়া সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে ২০১৯ সালে কান-এর একটি বিশেষ কারিগরি পুরস্কার পেয়েছিলেন মধুরা পালিত। আর এই বছরই ৭৬তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের (76th Cannes Film Festival) প্রতিযোগিতা বিভাগে (লা সিনেফ) একমাত্র ভারতীয় ছবি হিসেবে মনোনীত হয়েছে কলকাতার পরিচালক যুধাজিতের ‘নেহেমিচ’ (স্বল্প দৈর্ঘের ছবি)। ২৪ মে দুপুরে ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়েছে কান-এর বুনুয়েল থিয়েটারে ।
এঁদের কাউকে দেখেছেন, কোটি কোটি টাকার জামাকাপড় পরে রেড কার্পেট নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে প্লাস্টিক-হাস্যবদনে একের পর এর পোজ দিয়ে যাচ্ছেন? চেনেন এঁদেরকে? হলফ করে বলা যায়, এর উত্তর হবে- ‘না’। এঁদের বদলে কান-এ ভারতীয় হিসেবে উদযাপিত হচ্ছেন ঐশ্বর্য রাই বচ্চন, এষা গুপ্তা, মানুষী চিল্লার, উর্বশী রাউতেলা, সারা আলি খান, দীপিকা পাডুকোন, সোনম কাপুররা। এঁরা প্রত্যেকেই আমাদের দেশের জনপ্রিয় অভিনেতা। একটি প্রথিতযশা চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁরা যোগ দিচ্ছেন, তা-ও খুব ভালো কথা। কিন্তু আমরা জানি, কান-এ মনোনীত কোনও ছবির সঙ্গে এঁরা কোনও ভাবেই যুক্ত নন। শুধু ভারতীয় বলে নয়, অন্যান্য দেশের চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদেরও একই ভাবে অকারণে রেড কার্পেটে মুখোজ্জ্বল করতে দেখা গেছে – রোজই সামনে আসছে একাধিক তারকার ‘লুক’। ফি বছর এই প্রবণতা বাড়ছে। এখন প্রশ্ন হলো, কাদের নিয়ে আমরা মাতামাতি করছি? কী নিয়ে হইচই হচ্ছে সামাজিক মাধ্যম বা সংবাদ মাধ্যমে? বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে এঁদের উপস্থিতির ভূমিকাটা ঠিক কী?

কান-এ নন্দিতা দাস
সম্প্রতি এই প্রশ্নগুলি নিয়ে নিজের সোশাল মিডিয়ায় একটি বিবৃতি দিতে দেখা গেছে ভারতীয় পরিচালক-অভিনেত্রী নন্দিতা দাসকে। এর আগে এই প্রশ্ন বা সমালোচনা উত্থাপিত হয়নি এমনটা নয়। তবু, এবার নন্দিতার বক্তব্য বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে। তাঁর কথায়,’মানুষ ভুলতে বসেছে, এটি আসলে চলচ্চিত্রের উৎসব, পোশাকের নয়।’ প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে ৭১তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে Un Certain Regard Award পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছিল নন্দিতা-পরিচালিত 'মান্টো'। নন্দিতাও একাধিকবার কান চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে গিয়েছেন। সেই সব উপস্থিতির কিছু ছবিও আপলোড করেছেন, বেশিরভাগ ছবিতেই তাঁর সাজপোশাক যেন ‘পাশের বাড়ির মেয়েটির’ মতো। শাড়ির সঙ্গে ছিমছাম সাজ। এক্ষেত্রে পোশাকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শাড়িতেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম পান।
ফ্যাশন জগত সহ বিনোদনের সঙ্গে সম্বন্ধীয় একাধিক বিষয়ের বৃহৎ বাজার তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র উৎসবগুলিকে কেন্দ্র করে। প্রকাশ্য মার্কেট ছাড়াও, সিনেমা প্রদর্শন বা কান-এ মুখ দেখানোর জন্য তৈরি হয়েছে ছদ্মবেশী মার্কেট। এভাবে মনোযোগ বা ‘হাইপ’ কেনাবেচা চলছে অহরহ।
তবে হ্যাঁ, এখানে বলা প্রয়োজন নন্দিতা শাড়িতে আরাম পান বলে পরেন, অন্যরা নাই পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে নিজের পোশাক কেমন হবে, তা ঠিক করার অধিকার প্রত্যেকেরই আছে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, শুধুমাত্র ভারতীয় অভিনেতাদের সাজ-প্রদর্শন বলে নয়, বেশ কয়েক বছর ধরে কান-এ গুরুত্ব পাচ্ছে আবিশ্বের ফ্যাশন-ইন্ডাস্ট্রি। যেমন, জনপ্রিয় ফ্যাশন ডিজাইনার ডুয়া লিপা-র ‘লা ভ্যাকানজা’ নামের একটি ফ্যাশন সিরিজ এবারের কান চলচ্চিত্র উৎসবে সকলের নজর কেড়েছে দারুণ ভাবে। ইতালিয়ান ভাষায় এর অর্থ ‘ছুটি’। ইভনিং গাউন, বিকিনি এবং টেরি কটন বিচওয়্যার রয়েছে এর মধ্যে। আপত্তি এখানেও। আসলে, যে সময়ের কান চলচ্চিত্র উৎসবের কথা মনে করে আজ এই আপত্তিকর প্রসঙ্গগুলি উঠছে, তা আর নেই। কান উৎসবে এখন আর শুধু চলচ্চিত্রই প্রদর্শন করা হয় না। এটি একটি সমৃদ্ধিশালী বাজার, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানির চিত্রনাট্য কেনা থেকে শুরু করে সিনেমার বণ্টন ও বাণিজ্যের স্বার্থে সিনেমাগুলোকে এক ছাদের তলায় নিয়ে আসা হয়। ফ্যাশন জগত সহ বিনোদনের সঙ্গে সম্বন্ধীয় একাধিক বিষয়ের বৃহৎ বাজার তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র উৎসবগুলিকে কেন্দ্র করে। প্রকাশ্য মার্কেট ছাড়াও, সিনেমা প্রদর্শন বা কান-এ মুখ দেখানোর জন্য তৈরি হয়েছে ছদ্মবেশী মার্কেট। এভাবে মনোযোগ বা ‘হাইপ’ কেনাবেচা চলছে অহরহ।

কান-এ পুরস্কার নিচ্ছেন শৌনক সেন

কান-এ পুরস্কার নিচ্ছেন পায়েল কাপাডিয়া
আর, এসব কারণেই বোধহয় প্রকৃত ছবি, আসল প্রতিভারা থেকে যাচ্ছেন নেপথ্যে। শুরুতে যে প্রসঙ্গে কথা বলছিলাম, পায়েল কাপাডিয়া, শৌনক সেন বা যুধাজিতদের বদলে কেন উদযাপিত হচ্ছেন ফয়েল-ফ্যাশানিস্তা ঐশ্বর্য রাই বচ্চন বা দীপিকা পাড়ুকোনরা! নতুন মুখ বাজারে বিক্রয়যোগ্য নয় বলে, বাজারদর এখনও নির্ধারিত হয়নি বলে? অভিনেত্রী Emma Watson-এর একটি বিবৃতি এক্ষেত্রে মনে পড়ছে- “As consumers, we have so much power to change the world by just being careful in what we buy.”। কান-এর মতো চলচ্চিত্র উৎসবে আলোকিত হচ্ছে ‘মার্কেট’, ‘ফেস ভ্যালু’, ‘ট্রেন্ড’। আমরা ভুলে যাচ্ছি, Cannes আসলে চলচ্চিত্রের উৎসব।
