টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর ৬০৮ নম্বর ট্রামের পুজোর সাজ

রাজ্য পরিবহন নিগম ও এশিয়ান পেইন্টসের উদ্যোগে নতুন রঙে ট্রাম

“রাস্তা চলেছে যেন অজগর সাপ/ পিঠে তার ট্রামগাড়ি পড়ে ধুপধাপ” ছোটবেলায় সহজ পাঠে পড়া এই কবিতা থেকে আজকের “চল রাস্তায় সাজি ট্রামলাইন…”। এরকম কবিতার পংক্তি থেকে বাংলা গান – বারবার উঠে এসেছে কলকাতার ট্রাম। আসলে ঢং ঢং শব্দে কলকাতার নাগরিক জীবনের ঘুম ভাঙিয়ে যে জনযান দেড়শো বছর ধরে বহন করে চলেছে রোজকার নাগরিক ব্যস্ততা, তার প্রতি কলকাতাবাসীর আবেগ তো থাকবেই। ঠিক যেমন আছে দুর্গাপুজোকে ঘিরে, যা আজ জগৎসভায় সম্মানিত। আর এই বছর পুজোয় কলকাতায় ঢাকের শব্দের সঙ্গে মিলে গেছে ট্রামের ঘণ্টার শব্দ‌। কলকাতার প্রাচীনতম যান-এর ১৫০ বছরে টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো-তে ৬০৮ নম্বর ট্রাম সেজে উঠেছে পুজোর রঙে, যা শহরের বুকে সগৌরবে ঘুরতে শুরু করেছে ১৬ অক্টোবর থেকে।

২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজোকে UNESCO হেরিটেজ সম্মান-এ সম্মানিত করেছিল, তা আজ সকলেরই জানা। আর ২০২৩ সালে কলকাতা ট্রামের ১৫০ বছর চলছে। তাই কলকাতার দুই গর্ব এবার একইসঙ্গে চাক্ষুষ করতে চলেছেন কলকাতাবাসী। রাজ্য পরিবহন নিগম এবং এশিয়ান পেন্টস্-এর যৌথ উদ্যোগে একটি ট্রামকে রাঙিয়ে তোলা হয়েছে। থিম, দুর্গাপুজো ও তার রীতিনীতি।‌ ট্রামটির একটি কামরায় উঠে এসেছে কলকাতার কুমোরটুলি যা প্রাক্পুজো পর্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সিঁদুরখেলা, ধুনুচি নাচ সবই উঠে এসেছে এই অঙ্গরাগে। অবিন ডিজাইন স্টুডিওর তত্ত্বাবধানে এই কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। রাজ্য পরিবহন নিগমের এক আধিকারিক বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “ইতিমধ্যেই এই ট্রামকে ঘিরে কলকাতার মানুষের উদ্দীপনা চোখে পড়ার মতো। ১৬ তারিখ থেকে এই ট্রাম যাত্রী পরিবহনের জন্য পথে নেমেছে, তবে ভাড়ার কোনো পরিবর্তন হয়নি।” 

কলকাতায় ট্রাম পরিবহন শুরু হয় ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। তখন ছিল ঘোড়ায় টানা ট্রাম। তবে ৩.৯ কিলোমিটারের ট্রামের এই প্রথম পথ বন্ধ হয়ে যায় মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই, ওই বছরেরই ২০ নভেম্বর। এরপরে ট্রাম হয়েছে বাষ্পচালিত। অবশেষে বিংশ শতাব্দীর প্রথম লগ্নেই কলকাতার রাজপথে পথ চলা শুরু করলো ইলেকট্রিক ট্রাম।‌ মেট্রো পূর্ব যুগে ট্রামই রোজ বয়ে নিয়ে চলেছে নাগরিক জন জীবনকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আজ সে প্রবীণ।

 

দ্রুত গতির বাস, ট্যাক্সি অ্যাপ নির্ভর গাড়ি, বাইকের ভিড়ে ট্রাম তার অস্তিত্ব এখনও টিকিয়ে রেখেছে কলকাতা শহরে। তবে দ্রুতলয়ের জীবনে এখানেও তার প্রাসঙ্গিকতা এখন প্রশ্নের মুখে। কমেছে অনেক ট্রামরুট। তবুও দূষণহীন এই যানকে টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য পরিবহন নিগম। পুজোর থিমে সুসজ্জিত ট্রাম রাস্তায় চালানোর পাশাপাশি এবছরেও বাতানুকূল ট্রামে কলকাতার পুজো পরিক্রমার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর দিন সকাল ১০টায় এসপ্ল্যানেড ট্রাম ডিপো থেকে রওনা দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন বিখ্যাত পুজোমণ্ডপ ঘুরে আবার এসপ্ল্যানেডে ফিরবে ট্রামটি। এই বিশেষ পরিষেবাটির ভাড়া জন প্রতি ৬০০ টাকা (৫বছর ও তার ঊর্ধ্বে)‌। অনলাইন এবং অফলাইন উভয়ভাবেই বুকিং করা সম্ভব। এই ধরনের পরিষেবা কলকাতাবাসীর কাছে ট্রামকে নতুনভাবে আকর্ষণীয় করে তুলবে বলে মনে করেন পরিবহনকর্মীরা।

কলকাতার একদা লাইফলাইন ট্রামের গুরুত্ব আজকের জেন ওয়াইয়ের কাছে কতটা তা হয়তো প্রশ্ন সাপেক্ষ, তবে কলকাতার নস্ট্যালজিয়ায় ট্রামের গুরুত্ব থেকেই যাবে। সড়কপথে লোহার চাকার এই ঘড়ঘড় শব্দকে উপেক্ষা করতে পারেননি‌ সমকালীন চিত্র পরিচালকরাও‌‌। আর দূষণ যখন শহরের মুখ ক্রমশ ঢেকে দিচ্ছে কালো চাদরে, তখন ট্রাম সফর এখনও অক্সিজেন জোগাচ্ছে শহরবাসীর বুকে।
 

Post Tags
Developed by DXDasia