যানবাহনের তখন-এখন
ঘোড়া-হাতি-পালকি – অতীতে এগুলো সবই যানবাহন ছিল, যা আজ স্রেফ বিনোদনের অংশ। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাগুলি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শুধু পালকি নয়, ঘোড়া, উট, হাতি ইত্যাদিও সরবরাহ করে। এই রাজ্যে বা তার বাইরে কোনো সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় গেলে দেখা যাবে পর্যটনের একটি অংশ হয়ে উঠেছে ঘোড়া বা উঠ। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে পর্যটকদের মনোরঞ্জন। জঙ্গল ভ্রমনের ক্ষেত্রে এখনও আমাদের ভরসা করতে হয় বিশেষ জিপ গাড়ি বা হাতি ও মাহুত বন্ধুর ওপর। এক্ষেত্রে আমরা ট্রামের কথাও বলতে পারি। ট্রাম যেহেতু এখনও কলকাতার কয়েকটি রুটে এখনও পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে সচল, তাই পুরোপুরি বিনোদন হয়ে উঠেছে বলা যায় না। তবুও আজ ‘ট্রাম মিউজিয়াম’, ‘ট্রাম লাইব্রেরি’, ‘ট্রাম রেস্তোরাঁ’, অত্যধিক ‘ট্রাম-নস্ট্যালজিয়া’ -এসব বারবার মনে করিয়ে দেয় ট্রাম এখন আর প্রাত্যহিক জীবনের অংশ নেই।
পালকি এখন ইভেন্ট ম্যানেজারদের কাঁধে
গ্রামবাংলার সেই গা-ছমছমে ডাকাতের গল্প হোক বা ১৯ শতকের কলকাতার রাজপথ, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরাণী’ থেকে সত্যেন্দ্রনাথের ‘পালকির গান’ – আমাদের সংস্কৃতিতে নানাভাবে নানা অনুষঙ্গে পালকি উঠে এসেছে বারবার। পালকি থেকে উপার্জনের পাশাপাশি পালকির পিছনে বিপুল পরিমান খরচা করতেও পিছুপা হতেন না সাহেবরা। সেসময় অনেকেই ‘প্রাইভেট’ পালকি রাখতেন। প্রথমদিকে পর্তুগীজদের মনে হত পালকি ‘মেয়েলি’ বাহন। পরে অবশ্য সেই বাহনই পর্তুগিজ পুরুষদের পছন্দের বাহন হয়ে উঠেছিল। আধুনিকতার দাপটে একটা সময় মোটর গাড়ির সঙ্গে টক্কর দিতে না পেরে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছিল এই ধ্রুপদী বাহন। শুধু দৈনন্দিন যাতায়াতের ক্ষেত্রেই নয়, যে সব সামাজিক অনুষ্ঠানে পালকি ছিল এক সময় পরম্পরার অঙ্গ, সেখানেও অনায়াসে প্রাচীন এই যানকে অর্বাচীন করে জায়গা করে নিয়েছিল হালফ্যাশনের নানা ডিজাইনের গাড়ি। তবে সম্প্রতি অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে আবার। কিছু লোক এখন রকমারি অনুষ্ঠানে পালকিকেই বেছে নেওয়া শুরু করেছেন। যুগের পাশাপাশি পালটে যায় মানুষের রুচি। সেই রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হয় নতুন ধরনের ফ্যাশন। অনেক সময় তাতে আলাদা চমক আনতে পুরোনোকে নতুনভাবে উপস্থাপিত করা হয়। পালকির ফিরে আসার পেছনে রয়েছে এমনই ফ্যাশনের চাহিদা।

নতুন আঙ্গিকে পালকি ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা অবশ্য কয়েকটি ছোটো শহর আর গ্রামের ইভেন্ট ম্যানেজারদের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল। ‘পালকির গ্রাম’ বলে পরিচিত দাসপুরের দাদপুর, তার পাশাপাশি গোপীগঞ্জ, সরবেড়িয়াতেও ম্যাজিক দেখাছে পালকি। অনয় মাইতি, তাপস ভুইয়াঁর মতো ইভেন্ট ম্যানেজাররা বিয়ে, অন্নপ্রাশনের মতো অনুষ্ঠানগুলোতে পালকি ব্যবহার করে রোজগার ভালোই করছেন। কপাল ফিরেছে পালকির মালিক আর বেহারাদেরও। রবি পাখিরা, নয়ন দাস, উদয় দাস, বাবলু মালিকদের রয়েছে নিজস্ব পালকি। চাহিদা অনুযায়ী পালকি ভাড়া দিয়ে তাঁরা ৬-৮ হাজার টাকা রোজগার করে নেন। একেকটা পালকি তৈরি করতে মোটামুটি খরচ হয় ৪০ হাজার টাকার মতো। এছাড়া কয়েকবছর পরপর রয়েছে মেরামতের খরচ। তবে এইসব পালকির মালিকদের আলাদা পেশা রয়েছে। কেউই সংসার চালানোর জন্য পালকির ওপর নির্ভর করেন না।
তবে সময় অনুযায়ী পালকির সাজেও ঘটেছে বদল। ওয়েডিং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থা ‘পালকি’-র এক সদস্যের কথায়, “এখন বিয়েবাড়িতে লোকজন ময়ূরপঙ্খী পালকি চাইছে বেশি। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাগুলোও বেশি খরচ করে এই ধরনের পালকি তৈরি করাচ্ছে। ময়ূরপঙ্খী পালকিতে সামনের দিকে মুখ করে পাশাপাশি বসে বর-বউ। তিন দিক থেকে তাদের দেখা যায়। পালকির সামনেটা ময়ূরের মুখের আদলে বানানো। পালকির ব্যবহার যত বাড়ছে, তত বাড়ছে বেহারাদের কদরও। দাসপুরের বেহারারা মেদিনীপুর, আরামবাগ, বর্ধমান, তমলুক, হলদিয়ার পাশাপাশি কলকাতা এবং হাওড়াতেও ভালো রোজগার করছেন।”
মাহুত বন্ধু রে…
প্রাচীন ও মধ্যযুগে হাতি রণক্ষেত্রের বাহন হিসেবেও ব্যবহূত হতো। কখনো কখনো রাজা-বাদশাহ এবং আমীর-ওমরাহগণও সৌখিন বাহন হিসেবে হাতি ব্যবহার করতেন। এছাড়াও নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে বাহনের ভূমিকায় হাতির গুরুত্ব ছিল সর্বকালে। বনাঞ্চলের লোকজীবনের জীবিকার অন্যতম অবলম্বনও ছিল হাতি, এখনও অনেকাংশে তাই আছে। শুধুমাত্র জলদাপাড়ায় নয়, গরুমারা, মূর্তি, লাটাগুড়ি অথবা ধূপঝোরা জঙ্গলেও রয়েছে হাতি সাফারি। পশ্চিমবঙ্গ বন দপ্তরের ঘোষাণা অনুযায়ী, সরকারি বন বাংলোতে থাকা পর্যটক ছাড়াও সব স্তরের পর্যটকদের জন্যই হাতির পিঠে চেপে জঙ্গল সফরের সুযোগ আছে। মাথা পিছু জঙ্গলে প্রবেশ মূল্য ১২০ টাকা এবং হাতি সাফারির মূল্য ৯০০ টাকা, সবমিলিয়ে ১,০২০ টাকা।

ঘোড়া ছুটিয়ে…
এই শহরে ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন একদম প্রথম থেকেই বলা যায়। ঘোড়ার গাড়িই একসময়ের ফ্যাশান ছিল কলকাতায়। দু-একজন ইংরেজ নিজস্ব গাড়ি নিয়ে তখন রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতেন। সেসব গাড়ির আমদানি হত ইংল্যান্ড থেকেই। তখনও ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া খাটত না। ব্যক্তিগত গাড়িই চলত রাস্তায়। উনিশ শতকের প্রথম দিকে ঘোড়ার গাড়ি ভাড়ায় খাটতে শুরু করে। পালকিবাহকদের তম্বি মাঝেমাঝেই নাকি সমস্যায় ফেলত শহরবাসীকে। যাতায়াত প্রায় বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে হত। তা ব্রাউনলো নামের এক সাহেব পালকিবাহকদের গুমোর দিলেন একেবারে ভেঙে। ১৮২৭ সালে চার চাকার প্ল্যাটফর্ম বানিয়ে ঘোড়া দিয়ে টানালেন। নতুন গাড়ির নাম হল ব্রাউনবেরি। সস্তায় পুষ্টিকর আর সময় বাঁচানোর এমন সুন্দর ব্যবস্থা পেয়ে শহরবাসী যেন বর্তে গেল। শুরু হল ঘোড়ার গাড়ির ভাড়া খাটা। ব্রাউনবেরির সফলতা দেখে রাস্তায় নামল গ্রিনফিল্ড ব্রুহাম ফিটন গিগ কেরাঞ্চি চ্যারিয়ট এক্কা টাঙা – হরেক প্রজাতির গাড়ি।
আরও পড়ুন: লকডাউন ফিরিয়ে দিয়েছে ‘স্মৃতির সাইকেল’
পালকিকে হারিয়ে দিল ঘোড়ার গাড়ি। আর কিছুদিন পরে ঘোড়ার গাড়ির ঔজ্জ্বল্য নিভু নিভু হয়ে এল ট্রামের কাছে। শহর এগোল। আরো আরো দ্রুত হল- আর রয়ে বসে থাকার দিন গেল একেবারে শূন্যে মিলিয়ে।

বাংলার কিছু জায়গায় বিশেষত নবাবদের শহর মুর্শিদাবাদে এখনও টাঙা চলে। আর আজও যেন দুশো বছরের পুরোনো সময়টাকে বহাল রাখবে বলে কলকাতায় কিছু টাঙা টিকে আছে৷ ভিক্টোরিয়ার মুখ থেকে পার্ক স্ট্রিট ময়দান হয়ে এক চক্কর। হাড়জিরজিরে ঘোড়া। তাকেই টেনেহিঁচড়ে টগবগ করতে রাজি করানো।