পড়শি : বিভেদহীন প্রেম দিবস উদযাপন করছে কলকাতার এই ক্যুইয়ার-ক্যাফে

Valentine’s Day বিশেষ প্রতিবেদন

লকাতায় এখন যাকে বলে ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র ক্যাফে! ‘কোনটা ছেড়ে কোনটায় যাবো’ ভেবে দিশেহারা অবস্থা ক্যাফেখোরদের। এই যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা ক্যাফেগুলোর মধ্যে বেশকিছু কিন্তু নিজস্ব থিম বা বৈশিষ্ট্যের জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কোনওটা সাবেকি, কোনওটা ইকো-ফ্রেন্ডলি, কোনওটা সিনেম্যাটিক, কোনওটা আবার দেবব্রত বিশ্বাসের গানের সুরে বাঁধা। এই তালিকায় নতুন সংযোজন দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্কে অবস্থিত ‘পড়শি’। তবে একে বোধহয় শুধু ক্যাফে বলা যাবে না; পড়শি আরও বেশি কিছু। বিকল্প ভাবনার মানুষদের জন্য নতুন এক দিগন্ত। পড়শি ছাড়া কলকাতায় স্বঘোষিত ক্যুইয়ার-ক্যাফে আর আছে বলে জানা নেই। শুরু থেকেই Valentine’s Day-তে পড়শি বলছে, ভালোবাসায় ‘আমরা-ওরা’ নেই। প্রত্যেক বছরই ১৪ ফেব্রুয়ারি মানে, প্রেম দিবসে পড়শি-তে থাকে স্পেশাল টাচ। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

পড়শি কিন্তু যেমন তেমন ক্যাফে নয়। ক্যাফের পাশাপাশি এটি একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, লাইব্রেরিও। খুব সস্তায় এখানে আঞ্চলিক খাবার পাওয়া যায়। তাই ক্যাফে না বলে, ওঁরা বলছেন ক্যান্টিন।

পড়শি ‘স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি’-র একটি প্রয়াস। প্রসঙ্গত, ‘স্যাফো’ পূর্ব ভারতের প্রথম রেজিস্টার্ড এলজিবিটিকিউ (সমকামী-উভকামী ও রূপান্তরকামী নারী) অধিকার সংগঠন, যা পরবর্তীতে হয় ‘স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি’ (Sappho For Equality)। যেটা বলছিলাম, পড়শি কিন্তু যেমন তেমন ক্যাফে নয়। ক্যাফের পাশাপাশি এটি একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, লাইব্রেরিও। খুব সস্তায় এখানে আঞ্চলিক খাবার পাওয়া যায়। তাই ক্যাফে না বলে, ওঁরা বলছেন ক্যান্টিন। স্যান্ডউইচ, নুডলস, পাস্তা, চিজ চিকেন ওমলেট, ফিস ফ্রাই, পাউরুটি চিকেন স্টু, ম্যাগি – স্ট্রিট ফুড বলতে আমরা যা বুঝি মোটামুটি সেই সবই। এখানকার মাটন বল, কিমা পরোটার সুখ্যাতি আছে। ১৪ ফেব্রুয়ারির জন্য পড়শি-র খানাপিনায় থাকছে বিশেষ অফার। মেনু ছাড়াও, এই প্রেম দিবসে রয়েছে বিশেষ চমক। কিছু লুকিয়ে রাখা অপ্রকাশিত কথাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছে পড়শি।

সম্প্রতি পড়শি-তে এসেছিলেন বিশিষ্ট লেখক-বক্তা অরুন্ধতী রায়, সঙ্গে ‘স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি’-র কো-ফাউন্ডার মিনাক্ষী সান্যাল

বিশেষ কারোর উদ্দেশ্যে এমন অনেক কথাই থাকে, যা আমরা কখনও সামনা সামনি বলে উঠতে পারি না। একটি অনলাইন লিংকের মাধ্যমে এরকম বেশ কিছু চিঠি, ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে প্রেরকের নাম না জানিয়ে প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে এই ক্যাফে। “এর মাধ্যমে এমন একটা পরিসর তৈরি করা, যেখানে ভয়, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সরিয়ে আমাদের আবেগ, অনিভূতিরা স্থান পাবে।” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলছিলেন, স্যাফো-র ম্যানেজিং ট্রাস্টি কোয়েল ঘোষ।

এমনিতে পড়শিতে নানা ধরনের ইভেন্টস চলতেই  থাকে। গিগ শো, স্ট্যান্ড আপ কমেডি, নাচ, গান, নাটক, বইপ্রকাশ, ফিল্ম স্ক্রিনিং বা যেকোনও শিল্প মাধ্যমের প্রদর্শনী চলে সীমিত সংখ্যায় শ্রোতা/দর্শকের উপস্থিতিতে। আগেই বলেছি, পড়শি হলো বিকল্প ভাবনার মানুষদের জন্য খোলা দিগন্ত। একজন কমিউনিটির মানুষ এখনও সেভাবে সমাজে নিজেদের প্রকাশ করতে পারেন না আর পাঁচটা মানুষের মতো। থাকে অনেক অনেক বাধ্যবাধকতা, শর্ত, প্রত্যাখ্যান। স্যাফো 'পড়শি' শুরু করে ঠিক এই জায়গা থেকেই। LGBTQ+ কমিউনিটির জন্য তো বটেই, পড়শি প্রত্যেক মানুষের সমানাধিকারের কথা বলে। পড়শিতে তাই কোনও ট্যাবু নেই। মন খুলে হাসি মজা আড্ডা তর্ক বিতর্ক  খাওয়াদাওয়া চলে। কমিউনিটির যাঁরা পড়শির দেখাশোনা করেন প্রত্যেকেই স্বাধীন ভাবে কাজ করেন, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয় না কিছুই। খাবার বানানো থেকে অতিথি আপ্যায়ন, নিজে হাতে পারফিউম বা ব্যাগ বানানো সবই তাঁরা করে থাকেন। এভাবেই সমাজে বা নিজের পরিবারেই নিগৃহিত কমিউনিটির মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়, একটা মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠেছে পড়শি। 

 

সমকামী, রূপান্তরকামী-সহ সকল প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের সম্পর্কে তীব্র কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে দেশের প্রায় সমস্ত কোণেই। গ্রাম-মফস্‌সলের অবস্থা এক্ষেত্রে আরও করুণ। তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে রূপান্তরকামীদের মানবাধিকার বিষয়ে পরিচালিত সমীক্ষা বলছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার, পরিবার ও বিবাহ, এমন নানান গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রূপান্তরকামীরা অ-রূপান্তরকামী মানুষদের সমান অধিকার ভোগ করেন না আদৌ। ‘স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি’ তাঁদের কথা ভেবেই, আর পড়শি হয়ে উঠছে তাঁদের স্বপ্নের সামিয়ানা।

'পড়শি' অর্থাৎ প্রতিবেশি। সেই দিক থেকে এই নাম একটা সমান্তরাল সমাজের কথাই ইঙ্গিত করছে। কমিউনিটির মানুষ ছাড়া পড়শি নিয়ে অন্যান্যদের প্রতিক্রিয়া বা আগ্রহ কেমন? কোয়েল বলছিলেন, "আমাদের যেটা সবথেকে ভালো লাগছে, পড়শি শুধুমাত্র কমিউনিটির মানুষদের হয়ে ওঠেনি। LGBTQ+ কমিউনিটি ছাড়াও অন্যান্যরা আসেন ডেট করতে, আড্ডা দিতে। কেজো মানুষেরা আসেন অফিস মিটিং সেরে নিতে। কেউ কেউ আবার এখানকার কর্মীদের ব্যাকগ্রাউন্ড, কমিউনিটির মানুষদের গল্প, স্ট্রাগলের ব্যাপারে শুনতে চান। মোটামুটি আমরা যেমন চেয়েছিলাম সেরকম ভাবেই এগোচ্ছে পড়শি।" 

পড়শি ঠিকানা- 
পি -১৮৯, যোধপুর পার্ক, কলকাতা – ৭০০০৬৮ 

Post Tags
Developed by DXDasia