
ছোটোবেলায় যখন রেলগাড়ি দেখতাম, তখন সব সময় মনে হত, বেড়াতে যাব। এখনও যখন রেলগাড়ি দেখি, সবার আগে তাই মাথায় আসে, বা মাথায় আসে যে এই রেলগাড়ি আমার বাড়ি যাচ্ছে। রেলগাড়ির বহমানতা ঝকম ঝকম আওয়াজ এক অদ্ভুত ডোপামাইনের ক্ষরণ ঘটায় মাথার ভিতরে। আনমনা মন চঞ্চল ও চনমনে হয়ে ওঠে। আবার ফরাসি প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক জিল দেলোজের সিনেমা ১-এ আমরা পাই সেই বক্তব্য যা ফিল্মের চলনকে সরাসরি রেলগাড়ির গতিময়তার সঙ্গে তুলনা করে। রেলগাড়ির যাত্রাই সেই প্রথম চলন যা একই সঙ্গে ফ্রেম ও গতিময়তাকে একসাথে নিয়ে আসে। ক্রমাগত চলতে থাকা ল্যান্ডস্কেপ। (ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা)
তবে ভারতের ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন রেলগাড়ি বয়ে আনত সমন বার্তা। ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা যখন দেখেছি, বারবার সেখানে এই রেলগাড়ির উল্লেখ এসেছে। রেলগাড়ি আদপেই ঋত্বিক ঘটকের ছবির ম্যাকগাফিন। এই ম্যাকগাফিন বিষয়টা কী সেটা একটু বলা দরকার। ম্যাকগাফিন শব্দটির প্রবক্তা বিখ্যাত মার্কিন পরিচালক আলফ্রেড হিচকক। ম্যাকগাফিন হল সেই বস্তু যা গল্প বা ফিল্মের প্লটের এক বিশেষ অর্থ বহন করে। ঋত্বিক ঘটকের সিনেমায় সেই বিশেষ অর্থ হল ডিসপ্লেসমেন্ট বা স্থানচ্যুতি (কিছুক্ষেত্রে উৎখাত)। (ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা)
রেলগাড়ি কি শুধুই ডিসপ্লেসমেন্টের প্রতীক? তা বোধহয় নয়। মেঘে ঢাকা তারা-তে রেলগাড়ি কখনও স্থানচ্যুতি, কখনও তা হয়ে ওঠে জীবনের বাহক, আবার সেই রেলগাড়িই হয়ে ওঠে প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যেকার সংযোগ আবার কখনও তাদের মধ্যেকার ব্যবধান।
বাড়ি ফেরা হবে না। এই দেশই এখন তার নতুন বাড়ি। এই বিষয়টাকেই বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন ঋত্বিক তাঁর প্রায় প্রতিটি সিনেমাতে। প্রাথমিক দুটো ছবি, অর্থাৎ নাগরিক (Nagarik) ও অযান্ত্রিক (Ajantrik)-কে বাদ দিলে ডিসপ্লেসমেন্টের কথা বাকি সব ফিল্মেই আনেন ঋত্বিক ঘটক এবং সেই কারণেই বারবার তাঁর প্রয়োজন হয় ম্যাকগাফিনের। পার্টিশনের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাব রেলগাড়ির কী মাহাত্ম্য! যে রেলগাড়ি করে মানুষজন তাদের ভিটে ছেড়ে দেশ ছেড়ে উচ্ছেদ হয়ে চলে যাচ্ছে, আবার সেই রেলগাড়ি বয়ে আনছে মৃত লাশ। সেই রেলগাড়িই আবার এপার ওপারের সীমান্ত বেঁধে দিচ্ছে। কিন্তু শুধুই কী রেলগাড়ি ডিসপ্লেসমেন্টের প্রতীক? (ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা)
মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০)
মেঘে ঢাকা তারা (Meghe Dhaka Tara) ছবিতে আমরা প্রথম দেখতে পাই রেলগাড়ি, একদম শুরুতেই। সেই বিখ্যাত লং-শটটির পরে, আমরা যখন নীতা ও শংকরকে প্রথম কম্পোজিট শটে দেখি, একইসঙ্গে দেখি বিস্তৃত জমির প্রান্তে রেলগাড়ি ছুটে চলেছে। ফ্রেমের কম্পোজিশন এমনই যে তা দেখে মনে হয়, নীতার মস্তিষ্কের ভাবনার প্রতিরূপ যেন এই রেলগাড়ি। ঠিক যেমন শাস্ত্রে উল্লিখিত, এই সংসার মহামায়ার ভাবনারই এক প্রতিরূপ, বা তার ভাবনা থেকেই এই বিশ্ব চরাচরের জন্ম। তাহলে কী দাঁড়াল? রেলগাড়ি কি শুধুই ডিসপ্লেসমেন্টের প্রতীক? তা বোধহয় নয়। মেঘে ঢাকা তারা-তে রেলগাড়ি কখনও স্থানচ্যুতি, কখনও তা হয়ে ওঠে জীবনের বাহক, আবার সেই রেলগাড়িই হয়ে ওঠে প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যেকার সংযোগ আবার কখনও তাদের মধ্যেকার ব্যবধান। (ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা)
কোমল গান্ধার (১৯৬১)
কোমল গান্ধার (Komal Gandhar) ছবিতে, সেই ট্রেন হয়ে ওঠে ঘর ছাড়া মানুষের চিৎকারের প্রতীক। “দোহাই আলি” একটি সমবেত চিৎকার। ইতিহাসের হাহাকার। যা বর্তমানকেও তোলপাড় করছে। কিন্তু সেই তোলপাড় গিয়ে আছড়ে পরে বাফারে। রেলগাড়ি আর ওপারে যেতে সক্ষম নয়। খেয়াল করার বিষয়, মেঘে ঢাকা তারা-তে রেলগাড়ি বহমান সময়কালকে ধরে, বাস্তুহারা মানুষেরা এপারে এসে তাদের জীবন যাপন করছে। ভাঙাচোড়া জীবন। কিন্তু কোমল গান্ধারে সেই জীবনই যেন থমকে যাচ্ছে বারবার। তা ওপারের বাংলায় যেতে পারে না। পদ্মাপারে দাঁড়িয়ে ভৃগু এবং অনসূয়া দুজনেই ভাবে, কীভাবে তারা ফেলে আসা শৈশব, ফেলে আসা দেশে ফিরে যাবে। কিন্তু রেলগাড়ি আর ওপারে যাবে না কোনোদিনও। রেলগাড়ি বা রেলপথের উল্লেখ দুবার আসে কোমল গান্ধারে। তার মধ্যে আমরা দেখি, ঋত্বিকের জীবনের এক বর্ণাঢ্য আখ্যান। যা স্থান পায় এপার বাংলার রুক্ষ ভূমিতে, পার্বত্য অঞ্চলে ও পদ্মাপারে। আবার ফিল্মের একদম শেষে এসে আমরা দেখি ভৃগু সেই রেললাইনের পারেই প্রেম নিবেদন করছে অনসূয়াকে। যেন সেই আখ্যান ইতিহাসে উপহাসকে মেনে নিয়ে গল্পের পাত্রপাত্রীকে একটা সমাপতন দিচ্ছে। যে রেলপথ ছিল বিভেদের প্রতীক, সেই রেলপথই হয়ে ওঠে সংযোগের প্রতিমূর্তি।
সুবর্ণরেখাতে রেলকে ম্যাকগাফিন হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, একটা টাইম মেশিনের মতো। এই টাইম মেশিনকে বাহক করেই ঋত্বিক দর্শককে নিয়ে যান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে, এক নব্য রামায়ণ প্রত্যক্ষ করতে। বিদ্যুতের মতো ট্রেনের গতি। যেখান হুইপ প্যানের সঙ্গে হয় জাম্পকাট।
সুবর্ণরেখা (১৯৬৫)
এর পরে রেলগাড়ি আসে, সুবর্ণরেখায় (Subarnarekha)। ঈশ্বরকে যেতে হবে কলকাতা ছেড়ে ঘাটশিলার কাছে ছাতিমপুর বলে এক ছোট্ট জায়গায়। সেও উৎখাত হয়ে আসা এক মানুষ, তার ওপর দায় এক মা-মরা বোন সীতা ও তার সঙ্গে কুড়িয়ে পাওয়া মা-হারা অভিরাম। এখানে রেলগাড়ি জীবনের ও কালের ধারার বাহক। সুবর্ণরেখাতে রেলকে ম্যাকগাফিন হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, একটা টাইম মেশিনের মতো। এই টাইম মেশিনকে বাহক করেই ঋত্বিক দর্শককে নিয়ে যান বাংলাদেশের অভ্যন্তরে, এক নব্য রামায়ণ প্রত্যক্ষ করতে। বিদ্যুতের মতো ট্রেনের গতি। যেখান হুইপ প্যানের সঙ্গে হয় জাম্পকাট। ঈশ্বর ও হরপ্রসাদ সরে আসে রেসের মাঠে এবং সেই বিদ্যুৎ গতির শব্দ হয়ে ওঠে সীতার গলায় পুকার – “আ”।
মজার বিষয় হল, ম্যাকগাফিন ব্যবহার হলেও, ঋত্বিক এমন আত্মস্থ করে বিষয়কে সাজিয়েছেন ফ্রেমে, যা রামানুজনের মতোই তাকে ইতিহাসের পাতায় ফিল্মের দুনিয়ায়, ইউনিক করে রাখে। রেলের ব্যবহার সত্যজিৎ রায় প্রথমে করলেও তাকে একেবারে এক অন্য কাব্যময়তায় নিয়ে যান ঋত্বিক। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার দরুন, রেল স্টেশনের সঙ্গে এক অন্য রকমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তার কারণ ঋত্বিক সেই সময় স্পেশাল করেস্পন্ডেন্ট হিসাবে কাজ করতেন। উদ্বাস্তু পরিবেষ্টিত স্টেশন চত্বর, মধ্যরাতে রেলগাড়ি থেকে পরিবারের পর পরিবার নামছে, সেই দৃশ্যই যেন জীবিত হয়ে ওঠে, বাড়ি থেকে পালিয়ে (Bari Theke Paliye) ছবিতে। যেখানে কাঞ্চন প্রথম শিয়ালদহতে নেমে স্টেশন জোড়া যেন সেই দৃশ্যই দেখতে পায়।
ঋত্বিক ঘটক জীবদ্দশায় যেকটি সিনেমার নির্মাণ করেছেন, সেখানে যে থিম মূলত উঠে এসেছে, তা হল ডিসপ্লেসমেন্ট। কারণ যে সময়ের কবি তিনি তখন তাঁর কাছে ডিসপ্লেসমেন্টের এই কাব্যের কথা বলাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য মনে হয়েছে।

