
মহাসমারোহে সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হল সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পে, গত ১৭ এপ্রিল, ২০২৩ (সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের ৫০ বছর)। এই উদযাপনের অন্যতম কারণ হল প্রকল্পটির বাঘ সংখ্যা সম্প্রতি বেড়ে হয়েছে ১০০। কতখানি সংকটবহুল ছিল গত ৫০ বছরের যাত্রাপথ? বর্তমানে সত্যিই কি বাংলার চিরপুরাতন ‘ভয়ংকর সুন্দর’-এর সংরক্ষণ প্রসঙ্গে সচেতন হয়েছে সাধারণ মানুষ? এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাস্তুতন্ত্র, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণকে মূলমন্ত্র করে তুলে বাংলার মাটিতে এগিয়ে চলেছে ‘শের – সোসাইটি ফর হেরিটেজ অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল রিসার্চেস’।

শের-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ কুণ্ডু বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রণীত ‘প্রোজেক্ট টাইগার’-এর লক্ষ্য ছিল, বাঘ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে চেতনা বৃদ্ধি করা এবং ভারতবর্ষের জঙ্গলে বাঘ যাতে স্বস্তিতে বেঁচে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করা। তার আগে ভারত জুড়ে নির্বিবাদে বাঘের শিকার চলত এবং নষ্ট করা হত বাঘের আবাসস্থল। ‘প্রোজেক্ট টাইগার’ ভারতবর্ষ জুড়ে বাঘের যে জঙ্গলগুলো রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণের জন্য একটা প্রোটোকল তৈরি করে। সেই মতোই কাজ চলেছে বিগত বছরগুলি যাবৎ।” এক সময় বাঘের হত্যা সুন্দরবনের নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল। জঙ্গল থেকে গ্রামে ঢুকে পড়া বাঘ আর ফেরত যেতে পারত না জঙ্গলে। এর চাইতেও বড়ো সমস্যা ছিল, বাঘের খাবারে মানুষের ভাগ বসানো। বাঘের যারা শিকার অর্থাৎ যাদের খেয়ে বাঘ বেঁচে থাকে যেমন চিতল হরিণ বা শুয়োর (যা বুশমিট নামে পরিচিত), তা মানুষই শিকার করে ফেলত। সুন্দরবনের যে কোনো অনুষ্ঠানে হরিণের মাংস পরিবেশন ছিল অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা।
আজ সে দৃশ্য বহুলাংশে বদলেছে। জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটির সুবাদে পাকা রাস্তা তৈরি করে দেওয়া, পুকুর কেটে দেওয়া বা টিউবওয়েল তৈরি করে দেওয়ার মতো নানান কাজ করা গেছে জঙ্গলপ্রান্তিক গ্রামগুলিতে। এভাবেই, সাধারণ মানুষকে বাঘের পক্ষে আনা গেছে। মানুষ বুঝতে শিখেছে যে অন্যকে মেরে নয়, বরং সহাবস্থানের মাধ্যমে এগিয়ে চলাই সভ্যতার নিদর্শন। জয়দীপবাবু বলেন, “মানুষকে বাদ দিয়ে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ করা কখনোই সম্ভব নয়, এত বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা বারংবার তার প্রমাণ পেয়েছি। তাই মানুষকে সঙ্গে পেতেই বনকর্মীদের এই অক্লান্ত প্রচেষ্টা। অবশ্য, সুন্দরবনে যে সাফল্য এসেছে তাতে জঙ্গলপ্রান্তিক মানুষদের কৃতিত্বও কম নয়। এর আগে জঙ্গল ছেড়ে প্রায়ই বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ত। এটি আটকাতে সবথেকে বেশি যা সাহায্য করেছে তা হল নাইলন নেট ফেন্সিং। আমি মনে করি এটি একটি কালজয়ী সিদ্ধান্ত। এর ফলে একাধারে গ্রামের মানুষ ও বাঘকে একই সঙ্গে আমরা সুরক্ষিত রাখতে পেরেছি।”
শের-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ কুণ্ডু বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রণীত ‘প্রোজেক্ট টাইগার’-এর লক্ষ্য ছিল, বাঘ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে চেতনা বৃদ্ধি করা এবং ভারতবর্ষের জঙ্গলে বাঘ যাতে স্বস্তিতে বেঁচে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করা। তার আগে ভারত জুড়ে নির্বিবাদে বাঘের শিকার চলত এবং নষ্ট করা হত বাঘের আবাসস্থল। ‘প্রোজেক্ট টাইগার’ ভারতবর্ষ জুড়ে বাঘের যে জঙ্গলগুলো রয়েছে, সেগুলো সংরক্ষণের জন্য একটা প্রোটোকল তৈরি করে। সেই মতোই কাজ চলেছে বিগত বছরগুলি যাবৎ।”
অনেক সময়েই দেখা যায় যে সাধারণ মানুষ অর্থ উপার্জনের জন্য মরিয়া হয়ে বাঘ অধ্যুষিত এলাকায় কাঁকড়া ধরতে জলে নামছেন। এর ফলে একদিকে যেমন মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, ঠিক একই দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বাঘেরও ক্ষতি হচ্ছে। এমন ঘটনা আটকানোর জন্য বনদপ্তরের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে সমস্ত সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলিকে, এই মানুষদের জন্য একটা বিকল্প অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে বলেও জানাচ্ছে শের সংগঠন। কারণ যখনই কাউকে কোনো কাজ করতে বারণ করব আমরা, তাকে তার বিকল্প কিছু ব্যবস্থাও করে দেওয়া জরুরি। বর্তমানে আইনিভাবে হরিণের মাংস খাওয়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা গেছে। স্থানীয় মানুষ অনুভব করেছে যে, খাবার না পেলে তবেই বাঘ জঙ্গলের বাইরে বেরিয়ে আসে, ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। পাশাপাশি, কড়া নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণ অনেকাংশে হরিণ শিকার বন্ধ করতে পেরেছে।
তবে শহরের মানুষ, যারা সুন্দরবন থেকে অনেক দূরে বাস করে, তাদের ধারণায় কি বাঘের গুরুত্ব বেড়েছে আগের চাইতে? জয়দীপবাবু বলেন, “শহরের মানুষ আগের চাইতে অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বাঘের ভয়েই সুন্দরবনের বাদাবন কাটতে যেতে সাহস পায় না কেউ। যখন বাঘ থাকবে না, তখন সুন্দরবনে বাদাবনও থাকবে না। আর বাদাবন না থাকলে, ঝড় ঝাপটা প্লাবন যেগুলো সুন্দরবনে বাধা পেয়ে কলকাতার তেমন ক্ষতি করতে পারে না, সেগুলো ‘আনফিল্টারড’ অবস্থায় এসে আছড়ে পড়বে এখানে।”

আজ অনেকেই দেখতেই পাচ্ছেন যে প্রকৃতির উপর নির্বিচারে অত্যাচার চালানোর ফল কীভাবে ভোগ করতে হচ্ছে গোটা দেশকে। ভারতবর্ষ জুড়ে ওয়েটল্যান্ড ভরানো হয়েছে, নির্বিচারে গাছ কাটা হয়েছে, আর আজ আমরা অবাক হয়ে ভাবছি, এমন উত্তরোত্তর গরম বাড়ছে কেন! কেবলমাত্র বাঘ নয়, সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে গেলে যে প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করবার কোনো বিকল্প হতে পারে না, এটুকু বিষয়ে প্রত্যেককে অবগত হতে হবে। বাঘ আর মানুষের সম্পর্কও হয়ে উঠবে সহাবস্থানের। এ বিশ্ব সকলের।

