সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে চিঠির ব্যবহার

১।
চিঠি ছুটি নিয়েছে আমাদের মধ্যে থেকে আজ বহুদিন। মাঝে মেসেজ করতাম, এখন আমরা টেক্সট করি। চটজলদি কথা জানিয়ে দিতে পারি, আবার তাকে মুছেও দিতে পারি। কাজেই এই সময়ে দাঁড়িয়ে চিঠি প্রেরণের গোটা বিষয়টা নিয়ে আমাদের কথা বলা খুবই জরুরি। আর সবকিছু যেমন আধুনিক হচ্ছে, তেমনি আধুনিক হয়ে গেছে আমাদের তথ্য সম্প্রচারের মাধ্যম। আজ কলমের প্রয়োজন নেই, কাগজের প্রয়োজন নেই, কাজের কথা-মনের কথা বা ভাবের কথা বলতে। এমনকী ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে বহু রকম ছবি বা প্রতিকৃতি এসে গেছে। চিঠি লেখা ও পড়ার মধ্যে যে আরাম ও আকুতি ছিল, তা বুঝি এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। আগে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস বসে থাকতে হত চিঠি পাবার জন্য এবং যে চিঠি লিখতো তাকে অনেকটা হিসেব করে সমস্ত কথা বলতে হত। কথ্য ভাষার লিখিত রূপই ছিল একমাত্র উপায় মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য। তাই তার জন্য অপেক্ষা ও পড়ার জন্য উন্মাদনাও ছিল একেবারে অন্যরকম। সেখানে লুকিয়ে আছে কত সুপ্ত ইমোশন।

অপুর সংসার (১৯৫৯)

সেই হারিয়ে যাওয়া চিঠি এবং বাংলা চলচ্চিত্রে চিঠির ব্যবহার, সুনির্দিষ্ট ভাবে বলতে গেলে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় চিঠির ব্যবহার (The use of letters in Satyajit Ray’s films) আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। শোনা যায় মৃণাল সেনের ‘আকাশ কুসুম’ ছবিটি প্রকাশ করার পরে, সত্যজিৎ নিজের আপত্তিগুলি জানিয়েছিলেন ধারাবাহিক চিঠি লেখার মাধ্যমে এবং সেই চিঠিতে উত্তর ও প্রত্যুত্তর, খুবই তিক্ত আকার ধারণ করেছিল। একটা বিষয় অবাক লাগে ভেবে, যে আমরা কত সহজে আজ ঝগড়া করতে পারি, অথচ সেই সময় সম্পূর্ণ ভাবে গুছিয়ে সম্পূর্ণটা লিখে ফেলতে হত, যাতে সমস্ত বক্তব্যকে বুঝিয়ে দেওয়া যায়, এবং তাতে আপামর জাতিরও ভাষা নিয়ে যে বিশাল একটা বিস্মৃতির অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাও হত না। কিন্তু আধুনিকতা আমাদের হাতে দিয়েছে একটা কৌটো যা এখন এক পাতলা প্লেট বিশেষে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে সত্যজিৎ ছিলেন আধুনিক বাঙালি শিল্পী, যেটা প্রতিনিয়ত তাঁর কাজে আমরা লক্ষ করেছি। এখন ফিরে দেখব সেই সব দৃশ্যগুলো, যেখানে সত্যজিৎ একটি চিঠিকে ফ্রেম বন্দি করছেন অতি যত্নে।

২।
ভারতের যেকোনো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একটা বড়ো সমস্যা হল কোনো এক বিশেষ রকম সিনেম্যাটিক স্টাইলকে পেলে তাঁরা আর সেটা ছেড়ে অন্যরকম কিছু ভাবতে পারেন না। সিনেমাতে চিঠি প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা খানিক সেরকম। চিঠি এলেই আমরা দেখতাম, অভিনেতার ঘাড়ের ওপর দিয়ে একটা শট যেখানেই নেওয়া হোক, চিঠির ওপর এক গাদা আলো এবং সেখানে হয় ডিসলভে প্রেরকের ছবি ভেসে উঠবে, বা নেপথ্যে আমরা তার গলার স্বর শুনতে পাব, সে চিঠিটা পড়ছে। কিন্তু সত্যজিতের সিনেমা আধুনিক ও তাঁর কাছে জরুরি চিঠি অভিব্যক্তির পরিবর্তন আনে। পথের পাঁচালি-তে যখন অনেকদিন বাদে সর্বজয়ার কাছে হরিহরের চিঠি আসে, তখন নিয়ম মেনে হরিহরের গলার স্বর পেলেও ক্যামেরা ধরে সর্বজয়ার অভিব্যক্তিকে। সুসংবাদ পেয়ে ক্রমে তা অভাব ও অনটনে মেশানো অভিব্যক্তি থেকে খুশির অভিব্যক্তিতে পরিণত হয়। আবার আরেক ছবি অপরাজিত-তে দেখতে পাই, অপু চিঠি লিখছে, দর্শকও যেন তার লেখনির সঙ্গে সঙ্গে চিঠি পড়ছে। অর্থাৎ বই পড়ার সময় যে ভাবে আমরা রসাস্বাদন করে থাকি, সত্যজিৎ রায়ও সেই ভাবেই দর্শকদের ছবির মধ্যে এনগেজ করতে চাইতেন।

চারুলতা (১৯৬৪)

মনে করে দেখার বিষয়, যখন অপুর কাছে তার মায়ের চিঠি আসে, সে যে ছাপাখানায় কাজ করত তার মালিক, যার আশ্রয়ে সে শহরে থাকছে, তিনি অপুকে উদগ্রীব হয়ে মায়ের চিঠি পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করে সেই চিঠিতে কোনো দুঃসংবাদের কথা বলা আছে কিনা। এই চিঠি লেখা বা হাতের লেখার প্রদর্শনও সত্যজিতের সিনেমাতে গুরুত্ব পেতে শুরু করলো।

পথের পাঁচালি-তে যখন অনেকদিন বাদে সর্বজয়ার কাছে হরিহরের চিঠি আসে, তখন নিয়ম মেনে হরিহরের গলার স্বর পেলেও ক্যামেরা ধরে সর্বজয়ার অভিব্যক্তিকে। সুসংবাদ পেয়ে ক্রমে তা অভাব ও অনটনে মেশানো অভিব্যক্তি থেকে খুশির অভিব্যক্তিতে পরিণত হয়।

৩।
কথা প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাচ্ছে, কালির কলম ব্যবহার করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে লেখা হচ্ছে কলকাতায় হস্টেলের ঠিকানা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকারেও জানা যায় বেশ খাতা কলম নিয়ে বসে তাকে সেই লেখা অভ্যাস করতে হয়, যার ফলে তাঁর লেখার স্টাইলের ওপর সেই অভ্যাসের এক বিরাট প্রভাব পড়ে পরবর্তীকালে। তবে তা অনেক বেশি মাত্রায় স্থান পায় চারুলতা-তে। শটের পর শটে আমরা দেখি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে কলম এবং পাতার পর পাতা জুড়ে তিনি লিখে চলেছেন গল্প ও কবিতা। বোঝাই যাচ্ছে যে এই শটের মাধ্যমে একটাই জিনিস সত্যজিৎ চাইছেন, সেটা হল দর্শকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

ফিরে আসা যাক আবার চিঠিতে। অপরাজিত-র পরে অপুর সংসার। ছবি শুরুই হচ্ছে চিঠি দিয়ে। সেই চিঠি কোনো নেপথ্য কণ্ঠ পাঠও করছে না। চিঠিটা লেখা ইংরেজিতে। টানা হাতের লেখায় খুব বেশি যে পড়ে ফেলা যাচ্ছে তাও নয়, কিন্তু এইটুকু বোঝা যাচ্ছে যে এই চিঠির গুরুত্বে কলেজ জীবনের শেষে অপুর কর্মজীবনে কোনো হিল্লে হলেও হতে পারে। যারা সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে খানিক গভীর ভাবে পড়েন, খোঁজেন ও দেখেন তারা জানবেন, সেই হাতের লেখা আসলে সত্যজিৎ রায়ের। এরপরে সরাসরি ভাবুন সেই দৃশ্য, যেখানে অপু বিয়ের পরে শিয়ালদহ অঞ্চলে রেল লাইন ধরে মেসবাড়ির দিকে হেঁটে আসার পথে চিঠি পড়ে। নেপথ্যে অপর্ণার গলায় সেই চিঠির পাঠ থাকলেও, আমরা অপুর মুখের অভিব্যক্তি দেখতে থাকি। সেখানেও একটা পড়ার ব্যাপার যেন লুকিয়ে আছে, সত্যজিৎ চাইছেন দর্শক থাকুক অপুর মুডের সঙ্গে, কারণ সেখানেই সামনে গিয়ে এক মোক্ষম ঘা দিতে চলেছেন তিনি। এর পরের দৃশ্যেই আমরা দেখবো অপর্ণার ভাই এসে খবর দিচ্ছে যে প্রসব হতে গিয়ে অপর্ণার মৃত্যু হয়েছে। এরপরে আমরা দেখি হাতে লেখার শেষ দৃশ্য, যেখানে অপু তার বন্ধু পুলুকে চিঠি লিখে জানায় তার নিরুদ্দেশ যাত্রার ব্যাপারে, এবং জানায় যে সে তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় ও জরুরি বস্তু উপন্যাসের খসড়া নিয়ে রওনা দিল, লেখা শেষ হলে তাকে পাঠিয়ে দেবে।

অপরাজিত (১৯৫৬)

এখানে লক্ষ করার মতো বিষয়টা হল চিঠির বাক্য গঠন। “পাণ্ডুলিপিখানা সঙ্গে নিলুম” বা “তুমি বিলেত যাচ্ছ, তোমার যাত্রা সফল হোক। আমিও চল্লুম”। বন্ধুর সঙ্গে চিঠির কথোপকথনে কাব্য যেন চলেই আসে। অথচ এর আগে আমরা দেখেছি, সাধু ভাষার ব্যবহার হচ্ছে চিঠি লেখার ক্ষেত্রে। কিন্তু যত সময় এগোতে থাকে সত্যজিতের সিনেমা হয়ে ওঠে আরও আধুনিক। ক্রমেই আমরা দেখব, চিঠির পাঠে পাঠকের অভিব্যক্তিই হয়ে যাবে সত্যজিতের গল্প বলার পাথেয়।

৪।
এরপর মনে পড়ছে, চিঠি লিখতে লিখতে খুন হয়ে যাওয়া। চিড়িয়াখানা। মাঝরাত্তির, গোলাপ কলোনি। পানু গোপাল চিঠি লিখছে। চিঠি শুরু করা হচ্ছে, “শ্রীচরনেষু ব্যোমকেশ বক্সী”। লেখার হাতিয়ার হল সস্তার একটি কলম কালি। পানু গোপালের লেখা পড়া খুবই নড়বরে। ভাঙা হাতের লেখায় চলছে চিঠি লেখা। কাটশটে দস্তানা পড়া হাতে, খুনি “বান্ট ইন্সট্রুমেন্ট” নিয়ে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ একটা আওয়াজ।

আগন্তুক (১৯৯১)

লেখার ক্ষেত্রে হয়তো সত্যজিৎ লিখতেন, “ব্ল্যাক আউট”, কিন্তু আধুনিক সিনেমার মান বুঝি ডিটেইলে। আমরা দেখলাম, ফ্রন্টাল শটে পানু গোপাল কলম ভেঙে হুড়মুরিয়ে সামনের দিকে পড়ে গেল। কেমন ডিটেইল দেখলাম আমরা? পানুগোপালের পরিবারের ঠিকানা নেই, সে কথা বলতে পারে না, মনের ভাব প্রকাশে তার সমস্যা হয়। তাই তাকে ভেবে চিনতে বাক্য গঠন করে লিখতে হয়। সেই কারণে লেখায় আছে সংশয়। এই ডিটেইলের মাধ্যমে সত্যজিৎ একটি করুণ রস উদ্রেক করতে সফল হলেন মোক্ষম আঘাতের আগে। কারণ এর আগে শুধু একবার আমরা পানু গোপালকে দেখেছি, কুকুর ছানা হাতে, ব্যোমকেশের সঙ্গে কথা বলতে। প্রথমবারের দর্শক হিসাবে আমরা জানি না, যে পানু গোপাল মারা যাবে। তাই পানু গোপালের শেষ দৃশ্যে আবার সেই করুণা উদ্রেক করা প্রয়োজন। অতএব চিঠির ব্যবহারের এই ডিটেইল।

অপু বিয়ের পরে শিয়ালদহ অঞ্চলে রেল লাইন ধরে মেসবাড়ির দিকে হেঁটে আসার পথে চিঠি পড়ে। নেপথ্যে অপর্ণার গলায় সেই চিঠির পাঠ থাকলেও, আমরা অপুর মুখের অভিব্যক্তি দেখতে থাকি। সেখানেও একটা পড়ার ব্যাপার যেন লুকিয়ে আছে, সত্যজিৎ চাইছেন দর্শক থাকুক অপুর মুডের সঙ্গে, কারণ সেখানেই সামনে গিয়ে এক মোক্ষম ঘা দিতে চলেছেন তিনি।

৫।
শেষটা করতে হয়, আগন্তুক-এর চিঠি পাঠ দিয়ে, যার মাধ্যমে এই ছবির শুরু। কে আসছে কোথা থেকে আসছে আমরা কিছুই জানি না। ছবি শুরুই হচ্ছে একটা উড়ো চিঠি দিয়ে। কে এই ব্যক্তি, কী তার পরিচয়, কিছুই বলা যাবে না। এক্ষেত্রে ভদ্র ও প্রৌঢ় বাঙালি ব্যক্তিস্বরূপ আগন্তুককে পেশ করার জন্য আবার ব্যবহার করা হল সাধু ভাষার বাংলা। মনে রাখতে হবে সত্যজিৎ সরাসরি চাইছেন যে দর্শক প্রথম থেকেই শরিক হোন দম্পতির, কারণ শেষে গিয়ে তাদেরই চোখ খুলে দেখাতে হবে, কীভাবে বাঙালি জাতি অন্ধের মতো এগিয়ে চলেছে। সেই কারণে চিঠির ডিটেইল, তা পড়ে অভিব্যক্তি ও পরবর্তী কথোপকথন থেকে আমরা প্রথম থেকেই ওদের দোসর, আর মনমোহন মিত্তির আগন্তুকের আয়ং হয়ে থেকে যান।

চিড়িয়াখানা (১৯৬৭)

৬।
সত্যজিতের চিঠি ও তার শট টেকিং নিয়ে আরও বহু ডিটেইল আছে। গুপি গাইন বাঘা বাইন-এর দুটি জরুরি দৃশ্য। একটিতে আছে যুদ্ধের খবর, তা এসেছে হাল্লা দেশ থেকে। এর আগের দৃশ্যেই আমরা দেখেছি, সেখানে নৈরাজ্য চলছে, মন্ত্রী সম্পূর্ণ রাজ্যের বিধাতা হয়ে বসে আছে। সেক্ষেত্রে যে পরোয়ানা এল তাতে যে ভাষা লেখা আছে, তা মূলত সাংকেতিক। কীসের সংকেত দেওয়া আছে? সংকেতে আছে হাতি ঘোড়া ঢাল তলোয়ার, যাতে সাধারণ দর্শক অর্থাৎ আট থেকে আশি বছরের যে কোনো মানুষ কেবল দেখে বুঝে যেতে পারে, তাতে কী বলা আছে।

হীরক রাজার দেশে (১৯৮০)

এরপরে আমরা শেষবারের মতো দেখি শুন্ডি রাজাকে একটি লিখিত আর্জি দেয় প্রধানমন্ত্রী, তাতে লেখা আছে, “এখনও সময় আছে, দূত প্রেরণ করিব কি?” এখানে লক্ষ করার বিষয়, লেখার ধরন। সাধারণত যেভাবে বাংলা হরফ লেখা হয় সেভাবে লেখা হয়নি। ‘ক’-এর মাথাটা ভোঁতা, এমন ভাবে লেখা হয়েছে যাতে কাগজের ওপরে কিঞ্চিৎ কালি ছড়িয়ে যায়। দুর্দান্ত এই ডিটেইলগুলোই সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে চিঠির দৃশ্যগুলোকে তৎকালীন অন্যান্য কাজ থেকে আলাদা করে রাখে।

Written by