
হাসানোর কৌশল বদলে গিয়ে ঠাট্টা-তামাশা কি শুধুই ছ্যাবলামো হয়ে উঠেছে?
“ভাবছি মনে, হাসছি কেন? থাকব হাসি ত্যাগ ক’রে,/ ভাবতে গিয়ে ফিকফিকিয়ে ফেলছি হেসে ফ্যাক ক’রে।”
– সুকুমার রায়
প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে আমরা সবাই যখন ইঁদুর দৌড়ে ব্যস্ত, সময় নষ্ট করার মতো সময় যখন কারো কাছেই নেই, সেই সময়ও বন্ধুদের আড্ডায় বা সময়ের ফাঁকে হাতের মুঠোফোনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে হাসির কথা শুনলে বা হাসির কিছু দেখলে আট থেকে আশি সবাই কবি সুকুমার রায়ের এই ‘আহ্লাদী’দের মতোই ফিকফিকিয়ে ফ্যাক করে হেসে ফেলেন অনেকে। আর এই হাসিই আমাদের বিষাক্ত পরিস্থিতির বিষহরি ওষুধ, অনেক যন্ত্রণার বিরুদ্ধে মোক্ষম জবাব। এই কথাকে মনে রেখেই ১৯৯৮ সাল থেকে প্রতিবছর মে মাসের প্রথম রবিবার পালন করা হয় বিশ্ব হাসি দিবস (World Laughter Day)। বিশ্ব হাস্য যোগ আন্দোলনের উদ্যোক্তা ডক্টর মদন কাটারিয়া-র উদ্যোগে ১৯৯৮ সালের ১০ মে ভারতের মুম্বাই শহরে প্রথম পালিত হয় হাসি বা হাস্য দিবস। শুধু মনের অসুখ নয়, নির্মল হাসি শরীরের বিভিন্ন জটিল অসুখেরও উপশম করতে পারে এ কথা আজ বিজ্ঞানসম্মত ভাবে সত্য।
পেশাগত প্রতিযোগিতার দুনিয়ায় লোক হাসানোটাও অনেকের পেশা। তবে দিন বদলায়, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাচ্ছে অনেককিছু। বদলেছে গোপাল ভাঁড়দের উত্তরসূরি ও তাঁদের লোক হাসানোর ধরনও।
ভারতীয় অলংকার শাস্ত্র বলে প্রতিটি মানুষের মনে আটটি ভাব চিরস্থায়ী। যথা- রতি, হাস, শোক, ক্রোধ, উৎসাহ, ভয়, জুগুপ্সা ও বিস্ময়। পরিবেশ বা নীতিবোধ অনেকক্ষেত্রে এই ভাবগুলি নিয়ন্ত্রণ করলেও কখনোই তা বিলুপ্ত হয় না। এই হাস্ ভাব থেকে হাস্যরসের উৎপত্তি। মানসিক চাপ হালকা করে নতুন উদ্যমে কিছু শুরু করার মনের জোর দেয় হাস্যরস। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজসভায় বিদূষক বা ভাঁড়ের পদ প্রমাণ করে যুগে যুগে মানুষ স্বীকার করেছে হাসির গুরুত্বকে। তাঁদের বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা রাজসভায় অন্য মাত্রা দান করত। প্রসঙ্গতঃ কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভার বিদূষক গোপাল ভাঁড়ের নাম উল্লেখযোগ্য। গোপাল ভাঁড়ের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও গোপাল ভাঁড়ের গল্পের জনপ্রিয়তা যে সবরকম তর্ক-বিতর্কের ঊর্ধ্বে সেকথা বলাই বাহুল্য। সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের (মতান্তরে মধ্য এশিয়ার) মোল্লা নাসিরউদ্দিনের জনপ্রিয়তাও সর্বজনবিদিত।
পেশাগত প্রতিযোগিতার দুনিয়ায় লোক হাসানোটাও অনেকের পেশা। তবে দিন বদলায়, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাচ্ছে অনেককিছু। বদলেছে গোপাল ভাঁড়দের উত্তরসূরি ও তাঁদের লোক হাসানোর ধরনও। কোনো জায়গায় সমবেত হয়ে রসিকের কাছ থেকে মজার কথা শুনে হাসতে যাওয়ার পাশাপাশি ইন্টারনেটের দৌলতে রসিকরাও এখন পৌঁছে যান মানুষের হাতের মুঠোয় মুঠোয়। হাস্যরসাত্মক অভিনয় দেখতেও মানুষের আগ্রহ চিরদিনের। তাই এখন শুধু নাটক বা যাত্রা নয়; সিনেমা, ছোড়োপর্দার ধারাবাহিক বা ওয়েব সিরিজ সর্বত্রই হাসির যোগান দিতে প্রস্তুত থাকেন পরিচালক, প্রস্তুত থাকেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।
ছোটোপর্দা বা ইন্টারনেটের দুনিয়ার বাইরে স্ট্যান্ডআপ কমেডি-র অনুষ্ঠান কলকাতায় ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু টিকিট কেটে যেভাবে মানুষ সিনেমা বা থিয়েটার দেখতে যান, টাকা খরচ করে হাসতে আসেন কি আদৌ?

তনিমা সেন/ অভিনেত্রী
কতটা বদলেছে হাসানোর কৌশল? এই প্রসঙ্গে বর্ষীয়ান অভিনেত্রী তথা কমেডিয়ান তনিমা সেন বঙ্গদর্শন.কম-কে জানাচ্ছেন, “আমার অভিনয় জীবন শুরুর আগে থেকেই শুরু হয়েছিল অভিনয় দেখার পর্ব। ছোটোবেলায় তো টিভি আসেনি, তখন অভিনয় দেখা মানে ছিল হলে গিয়ে নাটক বা সিনেমা দেখা। তখন নাটকের মঞ্চেই দেখেছি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, রবি ঘোষের মতো দিকপাল অভিনেতাদের অভিনয়। সে সময় প্রায় প্রতিদিনই হাউসফুল হত প্রতিটা শো, এমনকি দর্শকদের হাসির রোলে মাঝে মাঝে সংলাপ থামিয়ে দিতে হত অভিনেতাদের। তবে হাসানোর ক্ষেত্রে একটা মাত্রাবোধ, একটা পরিমিতি বোধ আগাগোড়াই বজায় থাকতো। সেই ছায়াটুকু নিয়ে আমি অভিনয় জগতে এসেছি, এই মাত্রাবোধটুকু। কাজের ক্ষেত্রে তা বজায় রেখে চলেছি সবসময়।” অভিনয় ছাড়াও টেলিভিশনে জনপ্রিয় হাসির শোগুলো কেমন লাগে? এই প্রসঙ্গে তনিমা জানান, “শুধুই হাসির শোগুলোতে অনেকক্ষেত্রে শিল্পীকে অনেক শিখিয়ে পড়িয়ে মঞ্চে আনা হয়, ফলে শিল্পীর স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ হয়। তবে, নিয়মের বাঁধন না থাকলে মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও থাকে একথা অস্বীকার করা যায় না।” এখন কেন এই মাত্রাবোধের অভাব দেখা যায়? এই ব্যাপারে তিনি জানান, এখন ইন্টারনেটের দুনিয়ায় সবকিছুই অত্যন্ত সহজলভ্য, এই সহজলভ্যতার কারণেই হয়তো এই প্রজন্মের মধ্যে মাত্রাবোধ কমে গেছে।

উন্মেষ গাঙ্গুলি/ কন্টেন্ট নির্মাতা
বাঁকুড়া মিমস-এর জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতা উন্মেষ গাঙ্গুলি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “বড়োদের জোকসের জনপ্রিয়তা আছে সত্যি কথা কিন্তু আমাদের ঘোতন, টুকাই বা যদুবাবুর মতো পারিবারিক কনটেন্টের জনপ্রিয়তাও যথেষ্ট।” তাঁর মতে সবরকম দর্শক আছেন বলেই সবরকম হাসির ভিডিও জনপ্রিয় হয়।
ছোটোপর্দা বা ইন্টারনেটের দুনিয়ার বাইরে স্ট্যান্ডআপ কমেডি-র (Stand-Up Comedy) অনুষ্ঠান কলকাতায় ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু টিকিট কেটে যেভাবে মানুষ সিনেমা বা থিয়েটার দেখতে যান, টাকা খরচ করে হাসতে আসেন কি আদৌ? তরুণ স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান অনিরুদ্ধ বল জানান, “শুধু কমেডির জন্য হল ভাড়া করে শো বাংলাতে এখনও ততটা হয় না। প্রায় সাড়ে তিনবছর আগে আমরা যখন শুরু করেছিলাম তখন একটি নাটকের দলের শো শুরু হওয়ার আগে আমরা শো করতাম। এরপর আমাদের দলের সদস্য বেড়েছে। আমরা বিভিন্ন ক্যাফে বা রেস্তেরাঁতে গিয়েও শো করেছি। তাতেও বেশ কিছু সমস্যা ছিল। এরপরে হল বুক করে আমরা শো করতে শুরু করি, তবে অর্থনৈতিক ভাবে খুব বেশি লাভবান হইনি, কারণ টিকিটের দাম খুব কম। এছাড়াও অনেক খরচ সামলে সেভাবে লাভ থাকে না। তবু ভালোবেসে এই কাজ আমরা করে চলেছি।”

শান্তনু মিত্র নিয়োগী (বাঁদিকে), অনিরুদ্ধ বল (ডানদিকে)/ স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান
শোয়ের দর্শক প্রসঙ্গে অনিরুদ্ধ জানান, “আমরা ভাবতাম হয়তো শুধু তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাই আমাদের শো দেখতে আসবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন বয়সের মানুষও স্ট্যান্ডআপ কমেডির শো দেখতে আসছেন, উপভোগ করছেন। এটা আমাদের কাছে প্রাপ্তি।”
স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান শান্তনু মিত্র নিয়োগী, যিনি একসময় বেসরকারি এক চ্যানেলের কমেডি রিয়্যালিটি শোয়ের প্রতিযোগী ছিলেন, তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, টিভি এবং মঞ্চ – এই দুই ক্ষেত্রে পার্থক্য বিস্তর। মঞ্চে সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়, অনেক বেশি স্বাধীন ভাবে কাজ করা সম্ভব হয়।
খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো মনপ্রাণ খুলে হাসতে পারাও মানুষের ন্যুনতম চাহিদা। প্রাণখোলা হাসি ভালো থাকার পাসওয়ার্ড। তাই শুধু বছরে একটি দিন নয়, নির্মল হাসির ছোঁয়াচে বছরের প্রতিটা দিনই বিশ্বের সবার কাছে হয়ে উঠুক হাসির দিন, প্রাণ খুলে বাঁচার দিন। শুধু একটা জিনিস খেয়াল রাখার চেষ্টা করা যায়, তামাশা/ঠাট্টা/কৌতুক যেন ছ্যাবলামোর সমার্থক না হয়ে ওঠে।
