ওল্ড কারেন্সি বিল্ডিংয়ে শিল্পগাথার বুননে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার আলাপন

শিল্পী- প্রদীপ দাস

ত ২০ মে, ২০২৫ কলকাতার ঐতিহাসিক ওল্ড কারেন্সি বিল্ডিংয়ে সূচনা ঘটল এক বৃহৎ প্রদর্শনীর, যার নাম- Meterial as Metaphors: A Dialogue of Art Forms। ন্যাশনাল গ্যালারি অফ মডার্ন আর্টের আয়োজনে এবং বসু ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই সুবৃহৎ প্রদর্শনী সমগ্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের ৫৩ জন শিল্পীর ২৪০টি কাজকে ধারণ করে আছে। প্রদর্শনীটির কিউরেটর সায়ন্তন মৈত্র, যিনি জনশিল্প নিয়ে চর্চা করছেন গত দুই দশক ধরে। প্রিন্ট, টেক্সটাইল, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ফটোগ্রাফি, ভিডিও, শব্দশিল্প প্রভৃতি বিবিধ শিল্প মাধ্যমের মধ্যে যেন রচিত হয়েছে এক কাল্পনিক সংলাপ। ভারতবর্ষের ঐতিহ্য আর আধুনিকতাকে বিভিন্ন শিল্প-মাধ্যমের রূপকাশ্রিত কথনে জুড়ে চলে এই প্রদর্শনীটি।

শিল্পী- কে.জি. সুব্রহ্মণ্য

ওল্ড কারেন্সি বিল্ডিংয়ের একতলার এক সুবিশাল কক্ষে প্রদর্শিত হচ্ছে রাজা রবি বর্মার প্রেসে তৈরি ৩৮টি ওলিওগ্রাফ। এগুলির বিষয়বস্তু মূলত কৃষ্ণলীলা ও রামকথা।

শিল্পী কে.জি.সুব্রহ্মণ্যর তৈরি তিনটি ছোটো ভাস্কর্য প্রদর্শিত হচ্ছে এখানে। মাটি, কাঠ আর ধাতু দিয়ে তৈরি এই ভাস্কর্যগুলির মধ্যে রয়েছে প্রাণীদের আকার নিয়ে নিরীক্ষা। অনেকটা খেলনার অবয়বে তৈরি এই শিল্পকর্মগুলি শিল্পীর শিল্পচর্চার এক ভিন্ন দিককে উন্মোচিত করেছে।

ওল্ড কারেন্সি বিল্ডিংয়ের একতলার এক সুবিশাল কক্ষে প্রদর্শিত হচ্ছে রাজা রবি বর্মার প্রেসে তৈরি ৩৮টি ওলিওগ্রাফ। এগুলির বিষয়বস্তু মূলত কৃষ্ণলীলা ও রামকথা। বাৎসল্য থেকে শুরু করে শৃঙ্গার, কৃষ্ণ-জীবনের বিচিত্র লীলা এগুলির উপজীব্য৷ কৃষ্ণের বস্ত্রহরণ, নৌকাবিলাস, জলক্রীড়া, মথুরাগমন ইত্যাদি নানাবিধ পৌরাণিক আখ্যান চিত্রিত হয়েছে। এই কক্ষের একেবারে শুরুতেই আছে ফাইভার গ্লাসের তৈরি প্রায় আট ফুট লম্বা একটি হনুমানের মূর্তি যে তার তর্জনী তুলে রয়েছে আকাশের দিকে। শিল্পী জয়শ্রী চক্রবর্তীর অসামান্য চিত্রকলাটি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ছবিটির নাম: Midday Light। সাদা ক্যানভাসের ওপর শিল্পী এক মধ্যদিনের আলোকে পরিস্ফুট করেছেন৷ গাছের শিকড়ের বিমূর্ততাকে আরও প্রকট করেছে ধাতব তারের ব্যবহার। এই প্রয়োগের ফলে চিত্রভাষা দ্বিমাত্রিক থেকে ত্রিমাত্রিক ব্যঞ্জনায় পৌঁছেছে।

কৃষ্ণলীলা- রাজা রবি বর্মা

এই প্রদর্শনীর আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হল বিহারের দুটি বিশেষ লোকশিল্প- সোহরাই ও খোবর। এই আদিবাসী শিল্পকলা মধুবনীর মতো তেমন জনপ্রিয় নয়। আদিবাসী মহিলারা দীপাবলিতে মাটির বাড়ির দেওয়ালকে সুসজ্জিত করতে এই শিল্পকলার প্রয়োগ ঘটান, তবে এখানে দেওয়ালের পরিবর্তে কাগজের ওপরে তারা এঁকেছেন।

আরেকটি খুব উল্লেখযোগ্য কাজ শিল্পী প্রদীপ দাসের The Medicine for a Good Citizen। একটি সাইকেলকে গড়ে তোলা হয়েছে প্রচার গাড়ির মতো করে, যার বিক্রয়যোগ্য পণ্য হল ‘চিন্তাহরণ চূর্ণ’, অর্থাৎ মানুষের চিন্তাকে যা হরণ করতে পারে। দেওয়ালে অঙ্কিত সাদাকালো চিত্র, কাস্ট আয়রনের অবয়ব, শব্দ প্রক্ষেপণ যন্ত্র, লাউড স্পিকার ইত্যাদি মিলিয়ে একটি মিশ্র মাধ্যমের ইনস্টলেশন। গ্রামবাংলার প্রচলিত প্রচার গাড়িকে মাধ্যম করে এক বৃহত্তর সমাজের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহকে ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন শিল্পী।

শিল্পী সঞ্চয়ন ঘোষের ইনস্টলেশনে শ্রমজীবী মানুষের জীবন সংগ্রামের ছবি ফুটে ওঠে। জলছাদ করার সময় শ্রমিকেরা যে ছাদ পেটানোর গান গেয়ে ওঠেন, তার নানা দিক প্রদর্শিত হয়েছে। ছাদ পেটানোর নানা উপকরণ কড়াইতে রাখা রয়েছে ঝুলন্ত অবস্থায়, আর তার সামনে টাঙিয়ে রাখা আছে সুবিস্তৃত জাল। চায়না বাউরি, মোঙ্গলি বাউরি, পরী বাউরি, জ্যোৎস্না বাউরি, শ্রমিকের নাম, তাদের ছবি মিশে রয়েছে এই শিল্পকর্মে।

শিল্পী সুমাক্ষী সিনহা সাদা সুতোর বুননে গড়ে তুলেছেন আলো ছায়ার খেলা৷ একটি ঘোরানো সিঁড়ির অবয়বে ঝুলতে থাকা বিমূর্ত প্রায় ভারহীন এই অংশটি একদিকে নির্মাণ আর অন্যদিকে অবক্ষয়ের প্রক্রিয়াটি দর্শকদের কাছে তুলে ধরে।

শিল্পী- মল্লিকা দাস সুতার

শিল্পী মল্লিকা দাস সুতারের Can We Think It’s a Femur? ইনস্টলেশনটি খুব স্বল্প পরিসরে উৎপাদন, শক্তি আর অস্তিত্ব রক্ষার সমীকরণটিকে উপস্থাপন করে। ফিমার আমাদের শরীরের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্থি। আসলে ফিমারের রূপকে এই শিল্পকর্মটি শক্তির প্রকৃত উৎসের অনুসন্ধান করে। শক্তি কি বাহ্যিক কোনো উপকরণ, নাকি শক্তি আভ্যন্তরীন এক সত্তা যা পরিবর্তনশীল! ফিমারের প্রতীকী আকারের মধ্যে ছড়ানো রয়েছে গমের বীজ, যা থেকে ক্রমেই অঙ্কুরোদগম হয়, সৃষ্টি হয় চারাগাছ। উৎপাদনের যে চিরকালীন প্রক্রিয়া, তার মধ্যেই কার্যত শক্তিতত্ত্ব সুপ্ত হয়ে থাকে। শিল্পীর আরেকটি কাজের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতির প্রতি মানুষের কর্তব্যের বার্তা। সারা বিশ্বের প্রাকৃতিক ভারসাম্য যখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন, তখন প্রকৃতিদেবীর কাছে মানুষেরও কিছু দায়বদ্ধতা থেকে যায়। এই শিল্পকর্মে ‘VOW’ এই ইংরেজি অক্ষরগুলির মধ্যে বীজ থেকে বেড়ে ওঠে নবজাতক উদ্ভিদ।

শিল্পী- জাহ্নবী খেমকা

শিল্পী জাহ্নবী খেমকার শিল্পকর্মটি নৈশব্দ্যের জাল বুনে দেয়। In the baby pink Letter to My Mother – এই কাজটিতে রয়েছে রঙ্গোলির মতো মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা নকশা, যার সচল ছবিতে প্রতিক্ষণেই খুলে যায় শব্দের নানা উৎসমুখ। অথচ সেই শব্দ অশ্রুতই থেকে যায়। দর্শকদের সঙ্গেও এক অনিবার্য সংলাপ গড়ে ওঠে এই শিল্পকর্মটির।

সোহরাই শিল্প

এই প্রদর্শনীর আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হল বিহারের দুটি বিশেষ লোকশিল্প- সোহরাই ও খোবর। এই আদিবাসী শিল্পকলা মধুবনীর মতো তেমন জনপ্রিয় নয়। আদিবাসী মহিলারা দীপাবলিতে মাটির বাড়ির দেওয়ালকে সুসজ্জিত করতে এই শিল্পকলার প্রয়োগ ঘটান, তবে এখানে দেওয়ালের পরিবর্তে কাগজের ওপরে তারা এঁকেছেন। এই শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন হাজারিবাগের পুতলিগঞ্জ, রুদান দেবী প্রমুখ। প্রদর্শনীতে তাঁরা সরাসরি ছবি আঁকছেন। ছবিতে ফুটে উঠছে প্রকৃতি ও পশুপাখির নানারকম মোটিফ। গ্রামের উৎপাদন ব্যবস্থা আর প্রকৃতির সম্পর্কের রহস্যগুলো এইসব চিহ্নে আর আলপনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

এছাড়াও একেবারে একতলার একটি কক্ষে প্রদর্শিত হচ্ছে শিল্পী মনু পরেখের আঁকা ১৬টি মনস্তাত্ত্বিক পোর্ট্রেট। সামগ্রিকভাবে এই প্রদর্শনী কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে বিভিন্ন শিল্পমাধ্যম এবং বস্তুজগৎ অতিক্রম করা তাদের দেশ-কাল নিরপেক্ষ শৈল্পিক আবেদনকে। ওল্ড কারেন্সি বিল্ডিংয়ে এই প্রদর্শনী চলবে আগামী ২০ জুলাই পর্যন্ত, সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত (সোমবার বাদে)। কোনো প্রবেশমূল্য নেই।

Written by