হেরিটেজ বেসিকের স্বীকৃতি পেল ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির ‘দ্য প্যালেস রিসর্ট’

স্থাপত্যরীতি, প্রাচীনত্ব, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক কক্ষ থাকলে কোনও নির্মাণকে হেরিটেজ বেসিক-এর স্বীকৃতি দিতে পারে ভারতের পর্যটক মন্ত্রক। শুধু তাই নয়, নজর দেওয়া হয় আরও কিছু বিষয়ের ওপর। যেমন- এই স্বীকৃতি পেতে গেলে নির্দিষ্ট অঞ্চলটিকে হতে হবে প্লাস্টিক মুক্ত, থাকলে হবে অগ্নি নিরাপত্তার ছাড়পত্র, ভালো নিকাশি ব্যবস্থা। সবদিক বিবেচনা করেই সম্প্রতি হেরিটেজ বেসিকের শংসাপত্র পেয়েছে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির দ্য প্যালেস রিসর্ট।

হেরিটেজ বেসিক-এর স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে ভারত সরকারের পর্যটন স্থানে রাজবাড়ির নাম অন্তর্ভুক্ত হবে। বিদেশে ভারতীয় দূতাবাসে এ দেশের গন্তব্য তালিকায় থাকবে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি প্যালেস।

১৫৯২ সাল নাগাদ মুঘল সম্রাট আকবর বাংলার পশ্চিম অংশের বনাঞ্চল জয় করতে নির্দেশ দেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজপুত সেনাপতি মান সিংহকে। মান সিংহের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মচারী তথা বীর যোদ্ধা সর্বেশ্বর সিংহ প্রবল বিক্রমে ঢুকে পড়লেন অরণ্যে। একের পর এক যুদ্ধে মাল রাজাদের পরাজিত করে গড়ে তোলেন নিজের রাজত্ব। রাজধানী স্থাপিত হয় ঝাড়গ্রামে। ‘মল্ল দেব’ উপাধি নিয়ে সর্বেশ্বর বসেন সিংহাসনে, যে উপাধি তাঁর উত্তরাধিকারীরা পেয়ে থাকেন বংশানুক্রমে। রাজা নরসিংহ মল্ল দেব এবং তাঁর পরামর্শদাতা তথা দেওয়ান রায় বাহাদুর দেবেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্যের আমলে গৌরবের শীর্ষে পৌঁছয় ঝাড়গ্রাম। ঝাড়গ্রাম শহরকে আধুনিক পরিকল্পিত নগরে পরিণত করা হয়। ১৯৩১ সালে ৩০ একর জুড়ে রাজপ্রাসাদ নির্মিত হয় নতুনভাবে। পূর্ব-ভারতে ইন্দো-আরবীয় স্থাপত্যের অন্যতম সেরা উদাহরণ এই অট্টালিকা।

ঝাড়গ্রাম রেল স্টেশন থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে এই প্রাসাদে আজও বাস করেন মল্ল দেব রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীরা। প্রাসাদের কিছু অংশ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত। প্রধান ভবনটি ইতালীয় রীতিতে বানানো, জৌলুস দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। উঠোন এবং বাগানও মনোরম করে সাজানো। চারদিকে ছড়িয়ে পুরোনো দিনের স্মৃতি। বেশ কিছু চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছে এখানে। যেমন ‘সন্ন্যাসী রাজা’ কিংবা ‘দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’। একতলায় রয়েছে সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অতিথি নিবাস, ভ্রমণার্থীদের জন্য আরামদায়ক থাকার বন্দোবস্ত। প্রাসাদের বাকি অংশে যেতে অবশ্য বিশেষ অনুমতি লাগবে।

রাজপ্রাসাদের অতিথি নিবাসে পা রেখেছেন বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। যেমন ভারতের ভাইসরয় (১৯৩১ থেকে ১৯৩৬ সাল) লর্ড উইলিংডন, ভারতের শেষ গর্ভনর জেনারেল চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারী, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং মোরারজি দেশাই, মহানায়ক উত্তম কুমার এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

ঝাড়গ্রাম রাজপরিবারের তরফে চার বছর আগে হেরিটেজ বেসিকের জন্য আবেদন জানানো হয়েছিল। ইন্ডিয়া টুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জ্যোতির্ময় বিশ্বাসের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল রাজবাড়ি পরিদর্শন করে, চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার পরই মিলেছে এই স্বীকৃতি। হেরিটেজ বেসিক-এর স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে ভারত সরকারের পর্যটন স্থানে রাজবাড়ির নাম অন্তর্ভুক্ত হবে। বিদেশে ভারতীয় দূতাবাসে এ দেশের গন্তব্য তালিকায় থাকবে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি প্যালেস। বিদেশি পর্যটকরা অনায়াসে আসতে পারবেন বাংলার ঐতিহাসিক স্থানটিতে। পশ্চিমবঙ্গে ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি প্যালেস চার নম্বর হেরিটেজ বেসিক। এই স্বীকৃতির প্রভাব পড়বে দেশ তথা রাজ্য-পর্যটনে, এমনটাই মনে করা হচ্ছে।

Written by