
সমাজমাধ্যমে জোয়ার, ভোটবাক্সে ভাটা?
সমাজ মাধ্যম ভোট প্রচারের অন্যতম জায়গা হয়ে উঠেছে। সেই মাধ্যমে কত সহজেই ভোটের প্রচার সেরে ফেলা যায়। অজস্র লোকের কাছে কয়েক মুহূর্তে নিজের দলের আদর্শ, ইস্তেহার, প্রার্থীর বর্ণনা সবকিছু তুলে ধরা যায়। তৈরি করা যায় দর্শকদের মন মতো ভিডিও, ছবি এবং আরও কত মুচমুচে কন্টেন্ট। যা অতি সহজপাচ্য। যে যত মুচমুচে, রঙিন কন্টেন্ট তৈরি করতে পারবেন, তার অনুগামী সংখ্যা হু-হু করে বাড়বে। সেই কন্টেন্ট বেশি শেয়ার হবে। বেশি শেয়ার হলেই আরও বেশি সংখ্যক নেটিজেনদের নজরে আসবে বিষয়টি। যত বেশি নজরে আসবে, সেই দলের বা প্রার্থীর সম্বন্ধে মানুষের কাছে একটা স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হবে। এইভাবেই গড়ে উঠেছে সমাজমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রচারের ভিত্তি। কিন্তু যে প্রার্থীর যত সংখ্যক অনুগামী, তারাই কি তার আসল ভোটার? নাকি সমাজমাধ্যমের অনুগামীর সংখ্যা দিয়ে ভোটের হিসেব কষা যায় না? ভোটমুখী বাংলায় কি সমাজমাধ্যমের অনুগামী সংখ্যা ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলতে পারে? (সোশ্যাল মিডিয়ায় ভোটের প্রচার)
ভোটের বাজারে সমাজমাধ্যমে প্রার্থীর অনুগামী সংখ্যা তাঁর জনপ্রিয়তা মাপার সহজ উপায় হয়ে উঠেছে। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে লাখ লাখ মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। পোস্টে ভেসে আসছে সমর্থনের ঢেউ। দেখলে মনে হবে এই সমর্থনই বুঝি ভোটবাক্সে গিয়ে জমা পড়বে। কিন্তু বাস্তবের গণতন্ত্র এত সরল সমীকরণে চলে না।
ভোটের বাজারে সমাজমাধ্যমে প্রার্থীর অনুগামী সংখ্যা তাঁর জনপ্রিয়তা মাপার সহজ উপায় হয়ে উঠেছে। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে লাখ লাখ মানুষ তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। পোস্টে ভেসে আসছে সমর্থনের ঢেউ। দেখলে মনে হবে এই সমর্থনই বুঝি ভোটবাক্সে গিয়ে জমা পড়বে। কিন্তু বাস্তবের গণতন্ত্র এত সরল সমীকরণে চলে না। বরং এখানে সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক জটিল বিভ্রম। প্রথমেই আসে ভৌগোলিক বাস্তবতার প্রশ্ন। সোশ্যাল মিডিয়ার জগৎ সীমাহীন। এখানে একজন প্রার্থীর অনুগামী ছড়িয়ে থাকতে পারে দেশজুড়ে, এমনকি দেশের বাইরেও। কিন্তু ভোট দেওয়ার অধিকার সীমাবদ্ধ একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে। ফলে যে লাখো ফলোয়ার্সকে আমরা শক্তি বলে ভাবছি, তাদের বড়ো অংশই নির্বাচনের অঙ্কে অপ্রাসঙ্গিক। সংখ্যাটা যত বড়োই হোক, তার কার্যকর অংশটি অনেকটাই ছোটো। অনলাইনে সমর্থন জানানো সহজ, দ্রুত এবং প্রায়শই আবেগ নির্ভর। একটি পোস্টে লাইক দেওয়া বা একটি বক্তব্য শেয়ার করা মানে সেই মুহূর্তের অনুভূতিকে প্রকাশ করা। কিন্তু ভোট দেওয়া একেবারেই অন্য ধরনের সিদ্ধান্ত। এখানে সময়, দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত বাস্তবতা কাজ করে। স্থানীয় সমস্যা, প্রার্থীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ, সামাজিক সমীকরণ, সব মিলিয়ে ভোটের দিন যে সিদ্ধান্তটি তৈরি হয়, তা অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ার উত্তেজনার সঙ্গে মেলে না। সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় জনসংখ্যার তুলনায় ভোটার উপস্থিতি এখনও অনেক কম। এই প্রেক্ষাপটে ফলোয়ার সংখ্যার ভেতরকার কৃত্রিমতাও উপেক্ষা করা যায় না। আজকের ডিজিটাল যুগে জনপ্রিয়তা তৈরি করাও এক ধরনের কৌশল। ফেক অ্যাকাউন্ট, পেইড প্রমোশন, সব মিলিয়ে ফলোয়ার্স সংখ্যাকে ফুলিয়ে তোলা যায় খুব সহজেই। ফলে যে জনপ্রিয়তা চোখে দেখা যায়, তার অনেকটাই বাস্তব সমর্থনের প্রতিফলন নয়, বরং একটি নির্মিত ইমেজ। এই ইমেজ রাজনীতির মঞ্চে আলোড়ন তোলে বটে, কিন্তু ভোটের ফলাফলে তার প্রভাব সবসময় সরাসরি পড়ে না। (সোশ্যাল মিডিয়ায় ভোটের প্রচার)
আরও পড়ুন: ভোটের মরসুমে বাঙালি কি পণ্য?
তবু সোশ্যাল মিডিয়াকে একেবারে অস্বীকার করার জায়গা নেই। এটি আজকের রাজনীতিতে জনমত তৈরির এক শক্তিশালী হাতিয়ার। আলোচনার দিক নির্ধারণ করে, বিষয়কে সামনে আনে, দ্বিধাগ্রস্ত ভোটারদের মনেও প্রভাব ফেলে। এক অর্থে, এটি ভোট তৈরি না করলেও ভোটের পরিবেশ তৈরি করে। একটি ন্যারেটিভ গড়ে তোলে, যার ঢেউ অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ফলোয়ার্স আর ভোটারের মধ্যে সম্পর্ক আছে। কিন্তু তা সরল নয়, সরাসরি নয়। ফলোয়ার্সরা আওয়াজ তোলে, কিন্তু সেই আওয়াজ কতটা বাস্তবের ভোটকেন্দ্রে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে, সেটাই আসল প্রশ্ন। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ঝলমলে প্রচারের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আরেকটি জটিল বাস্তবতা। ভুয়ো খবর ও ন্যারেটিভ ম্যানিপুলেশন। এখানে তথ্য কেবল পৌঁছে দেওয়া হয় না, বরং তা বেছে নেওয়া হয়, সাজানো হয়, কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয়। কোনও একটি ঘটনাকে সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে, তার একটি নির্দিষ্ট দিককে বাড়িয়ে তুলে ধরা হয় আর সেই আংশিক সত্যই ধীরে ধীরে পূর্ণ সত্যের রূপ নিতে শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ, একটি চটকদার হেডলাইন বা একটি আবেগপ্রবণ পোস্ট, এই সবই মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং সেই সঙ্গে তৈরি হয় এক বিশেষ ধরনের ধারণা। (সোশ্যাল মিডিয়ায় ভোটের প্রচার)
ডিজিটাল পর্দার আড়ালে যে চিত্রটি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, সেটি কি সত্যিই বহুমতের প্রতিফলন, নাকি অ্যালগরিদমের ছাঁকনিতে বাছাই করা কিছু নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির পুনরাবৃত্তি? গণতন্ত্রের শক্তি কেবল সংখ্যায় নয়, সেই সংখ্যার পিছনের সচেতনতা ও স্বাধীন চিন্তায়।
এই প্রক্রিয়াটাই আসলে ন্যারেটিভ গঠন। যেখানে বাস্তবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কীভাবে সেই বাস্তবকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অ্যালগরিদম সেই কন্টেন্টকেই সামনে আনে, যা বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে; ফলে যুক্তির চেয়ে আবেগ, তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ভোটারদের সামনে যে চিত্রটি তৈরি হয়, তা সবসময় সম্পূর্ণ বা নিরপেক্ষ নয়। বরং অনেক সময় তা একটি পরিকল্পিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্মাণ। ভোটের আগে তাই তথ্য আর প্রোপাগান্ডার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা যা দেখছি, তা কতটা বাস্তব আর কতটা নির্মিত, এই প্রশ্নটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে জরুরি। এই ন্যারেটিভ তৈরির প্রভাব বোঝাতে একটি ছোটো বাস্তব উদাহরণই যথেষ্ট। কয়েক বছর আগে একটি পুরোনো ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দাবি করা হয়েছিল সেটি নাকি একটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনার দৃশ্য। ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ সেটি শেয়ার করতে থাকে। ক্ষোভ, সমর্থন, প্রতিবাদ সব মিলিয়ে একটি প্রবল জনমত তৈরি হয়। পরে দেখা যায়, ভিডিওটি আসলে অন্য একটি দেশের এবং তার সঙ্গে প্রচারিত ঘটনার কোনও সম্পর্কই নেই। কিন্তু ততক্ষণে সেই ভুল তথ্য মানুষের মনে একটি স্থায়ী ছাপ ফেলে দিয়েছে। এই ঘটনাই দেখায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় বাস্তবের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় তার ব্যাখ্যা, আর সেই ব্যাখ্যাই অনেক সময় ভোটারদের মন গঠনে বড়ো ভূমিকা নিয়ে ফেলে।
যা দেখা যাচ্ছে, যা শেয়ার হচ্ছে, যা নিয়ে মত গড়ে উঠছে, সেগুলো কতটা তথ্যনির্ভর, আর কতটা সুপরিকল্পিতভাবে নির্মিত বাস্তব? ডিজিটাল পর্দার আড়ালে যে চিত্রটি আমাদের সামনে ভেসে ওঠে, সেটি কি সত্যিই বহুমতের প্রতিফলন, নাকি অ্যালগরিদমের ছাঁকনিতে বাছাই করা কিছু নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির পুনরাবৃত্তি? গণতন্ত্রের শক্তি কেবল সংখ্যায় নয়, সেই সংখ্যার পিছনের সচেতনতা ও স্বাধীন চিন্তায়। কিন্তু সেই সচেতনতা যদি ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে কিউরেটেড ফিড, ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ আর ভাইরাল কন্টেন্টের উপর, তাহলে মতামত কতটা স্বতন্ত্র থাকে? যে খবর সামনে বারবার আসছে, যে ছবি বা ভিডিও আবেগকে নাড়া দিচ্ছে, যে ‘ন্যারেটিভ’ বিশ্বাসকে প্রভাবিত করছে, সবকিছুই কি সত্যিই নিরপেক্ষ? নাকি এর পিছনে কাজ করছে এক অদৃশ্য নির্মাণশিল্প, যা অজান্তেই দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে দিচ্ছে? ফলে ভোটের মুহূর্তে যখন বোতামে চাপ দেওয়া হয়, তখন সেই সিদ্ধান্ত কি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, না কি তা ইতিমধ্যেই গড়ে ওঠা এক ডিজিটাল প্রভাবের প্রতিফলন? গণতন্ত্রের মূল কথাই হল স্বাধীন মত, স্বাধীন সিদ্ধান্ত। কিন্তু যদি সেই মত গঠনের প্রক্রিয়াটাই প্রভাবিত হয়, তাহলে স্বাধীনতার ধারণাটাই কি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে না? সত্যিই কি তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, নাকি তথ্যের আড়ালে তৈরি গল্পের ভিতরেই নিজেদের অবস্থান ঠিক করা হচ্ছে?
________________
মতামত লেখকের নিজস্ব
