
রাজনীতি থেকে কেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে যুবসমাজ?
মধ্যবিত্ত পরিবারের গুরুজনেরা রাজনীতি নিয়ে বারবার সাবধান করেন তাঁদের সন্তানদের। বলেন রাজনীতি থেকে শতহস্ত দূরে থাকতে। তাঁরা সন্তানদের সরকারি কলেজে ভর্তি করতে ভয় পান এই রাজনীতির জন্য। সরকারি কলেজ মানেই তো রাজনীতির পীঠস্থান, এই চিন্তাধারা আমাদের দোসর। সরকারি কলেজ মানেই, সেখানে একটা ইউনিয়ন রুম থাকবে, দলের ঝাণ্ডা থাকবে, দাদারা থাকবে। যেমনটা সিনেমা, সিরিয়াল, নাটক, উপন্যাসে দেখানো হতো। তারপর একদিন সেখানে গণ্ডগোল হবে, মারপিট হবে এইসব ভয়ে অনেক গুরুজনেরাই তাঁদের সন্তানদের বেসরকারি কলেজে ভর্তি করছেন। তাঁদের দাবি, সেখানে অন্তত রাজনীতি নেই। সত্যি নেই কি? এই দুনিয়ার কোথায় রাজনীতি নেই? এই যে রাজনীতি নিয়ে যে ভীতি ছোটো থেকেই আমাদের ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, সেটা কি আদৌ সঠিক? রাজনীতির সম্যক জ্ঞান কি আমাদের প্রয়োজন নেই? যুবসমাজের রাজনীতির প্রতি কি সত্যিই অনীহা?
আগের প্রজন্ম যেখানে রাজনীতিকে আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখত, সেখানে জেনজি রাজনীতিকে দেখছে একটি সুসংগঠিত ক্ষমতার কাঠামো হিসেবে। যেখানে ইমেজ, প্রচার এবং প্রভাব অনেক সময় আদর্শের জায়গা দখল করে নেয়।
ছোটো থেকেই রাজনীতি নিয়ে যে জুজুটা আমাদের ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, সেই জুজুর ভয়ে আমরা আরও ভীত হয়ে পড়ি। ছোটোবেলায় আমাদের ঘুম পাড়ানোর এই কৌশল, যৌবনের প্রাকপর্বেও গুরুজনেরা ব্যবহার করেছেন। সেই কৌশলের প্রয়োগও হয়েছে অব্যর্থ। আমরা প্রথম থেকেই মনে করতে শুরু করেছি, রাজনীতির মতো বাজে জিনিস এ পৃথিবীতে আর দুটো নেই। কিন্তু এই পৃথিবীর চালিকা শক্তি, রাজনৈতিক নেতাদের হাতে। সেখানে একজন প্রশাসনিক প্রধান কোনও একটি রাজনৈতিক দলের চিহ্নে জিতে আসেন। তবুও যুবসমাজের কাছে রাজনীতি মানে আগডুম বাগডুম। কারণ, আমাদের গোড়ায় গণ্ডগোল।
রাত্রিবেলায় পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে, ক্লাসের প্রথম হওয়া ছাত্রটি এগিয়ে এসেছে, এমন উদাহরণ বিরল। উপরন্তু পাশের পাড়ার কাল্টু, যে রাজনীতি করে সে জান কবুল করে ছুটে এসেছে। কারণ এটাই তো সক্রিয় রাজনীতির ধর্ম। কলেজস্তরের রাজনীতিতে কোনও ছাত্রের সামান্য অসুবিধাকে যে দাদা বা দিদি আগ্রহ সহকারে দেখেছে, সমাধান করেছে সেই তো আসল রাজনীতির পরিচয় দিয়েছে। আন্দোলনের সামনের স্তরে থেকে যে ছেলেটা অবিরাম লাঠিচার্জ সহ্য করেছে, সেই তো রাজনীতির মানেটা বুঝেছে। কিন্তু বর্তমান রাজনীতিতে যুবসমাজের তীব্র অনীহা! ‘ওইসব করে কী হবে’ যুক্তি দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেও রাজনীতি তো সর্বত্র। আমরা কেউই দিনের শেষে রাজনীতিকে উপেক্ষা করতে পারি না।
আজকের যুবসমাজ সক্রিয় রাজনীতির অংশ হতে চাইছে না। কারণ তাদের মনে ভয় এবং হাজারও অনিশ্চয়তা। Centre for Monitoring Indian Economy-এর তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলিতে শিক্ষিত যুবকদের বেকারত্বের হার বহুক্ষেত্রেই ২০-৩০% মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতি তাদের কাছে আদর্শ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র নয়, বরং একটি অনিশ্চিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রায়শই আর্থিকভাবে অস্থিতিশীল পথ বলে মনে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলির অভ্যন্তরীণ কাঠামো, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মূলত প্রবীণ এবং প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত, ফলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের প্রান্তিক এবং অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছে। একই সঙ্গে রাজনীতিকে ঘিরে দুর্নীতি, সহিংসতা এবং ব্যক্তি স্বার্থের যে জনধারণা তৈরি হয়েছে, তা যুবকদের মধ্যে একধরনের মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। তারা মনে করে, রাজনীতি সমাজ পরিবর্তনের আদর্শবাদী ক্ষেত্রের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা ও প্রভাবের খেলা। ফলত, আজকের যুবসমাজ রাজনীতিকে পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছে, যেখানে তাদের অংশগ্রহণের বাস্তব সুযোগ, নিরাপত্তা এবং তাৎপর্য তিনটিই সীমিত। এই বোধই তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে ক্রমশ দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ভারতের যুবসমাজ ও রাজনীতির সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যকে সামনে এনেছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ১৮-২৯ বছর বয়সী যুব ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২১-২২ কোটি, যা মোট ভোটারের প্রায় ২২-২৩%। অর্থাৎ, সংখ্যার বিচারে যুবসমাজ ভারতের গণতন্ত্রের একটি বৃহৎশক্তি। কিন্তু এই বিপুল উপস্থিতি সত্ত্বেও বাস্তব রাজনৈতিক কাঠামোয় তাদের প্রতিনিধিত্ব এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। বিভিন্ন নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের মধ্যে ৪০ বছরের নিচে প্রার্থীর হার ২০-২৫% বেশি নয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এই হার আরও কম। অর্থাৎ যুবসমাজ ভোটার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ক্ষমতার কাঠামোয় তারা কার্যত প্রান্তিক।
ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আজকের জেনজি-র উপর। তারা শুধু ভোটার হয়ে থাকবে, নাকি একসময় নিজেরাই নেতৃত্বের দায়িত্ব তুলে নেবে, তার উপরই নির্ধারিত হবে আগামী ভারতের রাজনৈতিক চরিত্র।
অতীতে এই দেশে যুবসমাজ রাজনীতিতে অনেক বেশি সক্রিয় এবং প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। অনেকক্ষেত্রে তারাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ভগৎ সিং এবং ক্ষুদিরাম বসুর মতো বিপ্লবীদের বয়স ছিল মাত্র ১৮-২৫ বছরের মধ্যে। একইভাবে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস-এর অসহযোগ (১৯২০) এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)-এ হাজার হাজার ছাত্র-যুবক সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। পরবর্তী সময়েও এই ধারা বজায় ছিল। ১৯৭৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণ-এর নেতৃত্বে বিহার থেকে শুরু হওয়া ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিল ছাত্র ও যুবসমাজ। এই আন্দোলনের ফলেই ১৯৭৭ সালে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার পরাজিত হয়েছিল। একইভাবে ১৯৭৯-১৯৮৫ সালের আসাম আন্দোলন, যা অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন-এর নেতৃত্বে হয়েছিল, সেটিও মূলত ছাত্র-যুবকদের আন্দোলন ছিল। বাংলার নকশাল আন্দোলন (১৯৬৭-৭২)-এর ক্ষেত্রেও দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের বড়ো অংশই ছিল ছাত্র ও তরুণ। সেইসময় রাজনীতি যুবকদের কাছে শুধু পেশা ছিল না, বরং আদর্শ, প্রতিবাদ এবং সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম ছিল। কিন্তু বর্তমান তরুণ সমাজ, যাদেরকে আমরা জেনজি বলে থাকি, তারা কি রাজনীতি নিয়ে একটুও সচেতন? কারণ আগামী দিনে তারাই তো দেশের কাণ্ডারি। জেনজি সমাজ-রাজনীতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছে আবার সম্পর্ক স্থাপনও করছে। তারা রাজনীতির প্রতি উদাসীন নয়, বরং গভীরভাবে সচেতন। কিন্তু সেই সচেতনতা সরাসরি অংশগ্রহণে নয়, বরং পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণে বেশি প্রকাশ পাচ্ছে। আগের প্রজন্ম যেখানে রাজনীতিকে আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখত, সেখানে জেনজি রাজনীতিকে দেখছে একটি সুসংগঠিত ক্ষমতার কাঠামো হিসেবে। যেখানে ইমেজ, প্রচার এবং প্রভাব অনেক সময় আদর্শের জায়গা দখল করে নেয়। ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠার ফলে তারা রাজনীতিকে খুব কাছ থেকে, প্রতিনিয়ত, মোবাইলের পর্দায় প্রত্যক্ষ করছে ফলে তাদের মধ্যে একধরনের সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে, তীব্র প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত সাফল্যের চাপ তাদের বাস্তব বাদী করে তুলেছে। তারা এমন কোনও ক্ষেত্রে নিজেদের যুক্ত করতে দ্বিধা বোধ করছে, যেখানে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং প্রতিষ্ঠা পেতে দীর্ঘসময় লাগে।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই ভারতীয় রাজনীতির ভবিষ্যতের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। কারণ, যে প্রজন্ম আজ দূর থেকে রাজনীতিকে বিচার করছে, হতে পারে আগামী এক-দুই দশকের মধ্যে তারাই দেশের প্রধান ভোটার, নীতিনির্ধারক এবং নেতৃত্ব হয়ে উঠবে। যদি রাজনীতি তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, তাহলে তারাই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে। যেখানে ব্যক্তি পূজার বদলে নীতি এবং আবেগের বদলে যুক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। কিন্তু যদি রাজনীতি তাদের কাছে একইভাবে দূরবর্তী, অবিশ্বাস্য এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাবে। অর্থাৎ ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আজকের জেনজি-র উপর। তারা শুধু ভোটার হয়ে থাকবে, নাকি একসময় নিজেরাই নেতৃত্বের দায়িত্ব তুলে নেবে, তার উপরই নির্ধারিত হবে আগামী ভারতের রাজনৈতিক চরিত্র।
_______________
মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব
