ভোটের মরসুমে বাঙালি কি পণ্য?

‘বাঙালি বাঁচাও’ লড়াই শুরু করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন

তটা পথ পেরোলে তবে বাঙালি বলা যায়? কতটা পথ পেরোলে তবে বাঙালি হওয়া যায়? এই উত্তরের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মাথা ঝিম ধরে আসে। বসন্ত রং পাল্টে ফেলে। ফিরে যায় পরিযায়ী পাখিদের দল। ঝরে যায় আদুরে পলাশ। আবার একটা ভোট চলে আসে। আবার ভুলে যাই, কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলাম। বাংলা, বাঙালিকে কতটা কাটাছেঁড়া করলে উত্তর পাওয়া যেতে পারে? বাঙালির অস্মিতায় কতটা শান দিলে পার হতে পারে ভোটের বৈতরনী? ভোট আসলেই কেন মনে পড়ে বাঙালি, অবাঙালি, বহিরাগত তকমা? বাঙালি কি ক্রশম ভোটের বাজারের খেলনা হয়ে উঠেছে? ভোট এলেই কেন রাজনৈতিক দলের মনে পড়ে, বাঙালি নিজের সংস্কৃতি ভুলে যাচ্ছে? ভোট এবং বাঙালির অস্মিতা কেন গুলিয়ে যাচ্ছে একে অন্যের সঙ্গে?

সমাজমাধ্যমে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলা বানানের বিচ্ছিরি অবস্থা। যে যা পারছে লিখছে। বানানের আসল শিকড়কে কেউ খুঁজতে যাচ্ছে না। যে ক্রমাগত ভুল বানান লিখে ভরিয়ে দিচ্ছে, সে কি বাঙালি নয়? অথবা যে বাঙালি ছেলে বা মেয়ের বিয়েতে ঘটা করে হলদি, সংগীত ইত্যাদি অনুষ্ঠান করছেন তাঁকে কি বাঙালি বলা যাবে না? যে লোকটা এই বাংলায় জন্ম নিয়েও মাছ, মাংস খায় না, তাকে কি বহিরাগত তকমা দেওয়া যায়? যে ছেলেটা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করে একফোঁটাও বাংলা লিখতে শিখল না, তাকে কি বাঙালি বলা যায়? ভোট এলেই দেখা যায়, বিভিন্ন সংখ্যালঘু বিষয় নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বাঙালি এখন সেই খাতায় নাম লিখিয়েছে। মনে প্রাণে বাঙালি হয়েও, কাজে বহিরাগত হয়ে উঠেছে একটা গোটা জাতি। ফলে সেই জাতিকে বাঁচানোর লড়াই শুরু করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন। তারাও ভোটের বাজারে মুনাফা লুটছে আর বাঙালি হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে।

যে ক্রমাগত ভুল বানান লিখে ভরিয়ে দিচ্ছে, সে কি বাঙালি নয়? অথবা যে বাঙালি ছেলে বা মেয়ের বিয়েতে ঘটা করে হলদি, সংগীত ইত্যাদি অনুষ্ঠান করছেন তাঁকে কি বাঙালি বলা যাবে না? যে লোকটা এই বাংলায় জন্ম নিয়েও মাছ, মাংস খায় না, তাকে কি বহিরাগত তকমা দেওয়া যায়?

বিগত এক বছরে বারবার শোনা গিয়েছে, বাঙালি বিদ্বেষের কথা। বাঙালি দেখলেই তেড়ে গিয়েছে প্রশাসন। সেই সব ইস্যুকে ঘাড়ে করে ভোটে নেমেছে অনেকেই। ভোটের ময়দানে তৈরি হচ্ছে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে তৈরি মঞ্চ, নেতারা এসে খুব কষ্টে বাংলা বলার চেষ্টা করছেন। বাংলার মনীষীদের গুণগান জপ করছেন। কিন্তু শুধুমাত্র ভোটের আগে কেন? সারাবছর বাঙালিকে মনে পড়ে না? শুধুমাত্র পরীক্ষার আগে টেস্ট পেপারের সাজেশন দেখে কি পাশ করা যায়? যদিও বাংলা এবং বাঙালিকে নিয়ে এমন লোফালুফি আগেও খেলা হয়েছে, কিন্তু তখন বাঙালির শিরদাঁড়া শক্ত ছিল। যত দিন এগোচ্ছে, বাঙালি তত নিজের শিকড়কে ভুলে যাচ্ছে। ছোটোবেলায় দেওয়া গুরুজনের আদেশ, চোখে দেখা বিমুগ্ধ সংস্কৃতি, বাঙালির বাঙালিয়ানা এখন মুঠোফোনে বন্দি। অপরের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে গিয়ে, নিজের পায়ে কুড়ুল মেরেছে আপামর বাঙালি। সেই জন্যই ভোটের আগে বাঙালির সেন্টিমেন্টকে উস্কে দিয়ে ভোটের বাজারে নামে রাজনৈতিক দলগুলো।

কিন্তু আমরা কি সত্যিই কি বাংলার সংস্কৃতি ভুলে যাচ্ছি? গেলেও কেন যাচ্ছি? একটা শিশু যাকে ছোটো থেকে ভর্তি করে দেওয়া হচ্ছে ইংরেজি মাধ্যমে, সে তো বাংলার রসদটুকু পাচ্ছে না। সেখানে এমন একটা পরিবেশে বড়ো হচ্ছে, যেখানে জীবনের সাফল্যে বাংলা অমূলক। বাংলা জেনে কেন মাথা ভারী করবে সেই ছেলেটা? আর বাংলা সাহিত্য? সে কথায় না আসাই ভাল। ইংরেজিতে লিখে কেল্লাফতে করতে চাওয়া বাঙালির অভাব নেই। কারণ বাংলার মতো মরা ভাষা আর দুটো নেই। অন্তত একটা শ্রেণির মানুষের তাই মত। আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় অত্যন্ত রসিকতা, আবেগ আর গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে কিছু কথা বলেছিলেন। সেই ইংরেজির বঙ্গানুবাদ করলে এমন দাঁড়ায়। “মানুষ আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করে আপনি কেন একটি মুমূর্ষু ভাষায় লেখেন? প্রথমত, আমি ভূতের গল্প লিখতে ভালোবাসি। আর একটি মুমূর্ষু ভাষার চেয়ে ভূতের জন্য উপযুক্ত আর কিছু হতে পারে না। ভাষা যত বেশি মৃতপ্রায়, ভূত ততই বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। ভূতেরা ইডিশ ভাষা ভালোবাসে, তারা সকলেই এই ভাষাতেই কথা বলে। আমি শুধু ভূতে বিশ্বাস করি না, পুনরুত্থানেও বিশ্বাস করি। আমার দৃঢ় ধারণা, একদিন লক্ষ লক্ষ ইডিশভাষী মৃতদেহ কবর থেকে উঠে আসবে, এবং তাদের প্রথম প্রশ্ন হবে পড়ার মতো নতুন কোনও ইডিশ বই আছে কি? তাদের কাছে ইডিশ কখনওই মৃত ভাষা হবে না। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে হিব্রুকে মৃত ভাষা বলে মনে করা হতো। অথচ হঠাৎ করেই তা আবার প্রবলভাবে জীবন্ত হয়ে উঠল। হিব্রুর সঙ্গে যা ঘটেছে, একদিন হয়তো ইডিশের সঙ্গেও তেমনটা ঘটতে পারে। যদিও এই অলৌকিক ঘটনা কীভাবে ঘটবে, সে সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। আরও একটি ছোট্ট কারণ আছে, যার জন্য আমি ইডিশ ত্যাগ করতে পারি না। ইডিশ হয়তো একটি মুমূর্ষু ভাষা, কিন্তু এটিই একমাত্র ভাষা যা আমি সত্যিকারের ভালো জানি। ইডিশ আমার মাতৃভাষা,  আর মা কখনওই সত্যিকার অর্থে মৃত হন না।”

শেষের লাইনগুলো বারবার পড়লে বুকের ভিতরটা হু হু করে ওঠে। বাংলা ভাষার প্রতি, সংস্কৃতির প্রতি অগাধ ভালবাসা জন্ম নেয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হয়, বাঙালি এখন ভোটের বাজারে তুরুপের তাস। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বঙ্কিমের নাম ভাঙিয়ে ভোট চাইতে আসা রাজনৈতিক দলগুলো যেন বাঙালিকেই প্রশ্ন করে, বাংলার সংস্কৃতিকে সংখ্যালঘু তকমা দিয়ে ভোটভিক্ষা করে। তারপর আবার সেই পাঁচবছরের অপেক্ষা। ততদিন বাংলা এবং বাঙালি মৃতপ্রায়। ভোটের আগে আবার জেগে উঠবে সেন্টিমেন্ট।

যে জাতি নিজের ভাষাকে অবহেলা করে, নিজের সংস্কৃতিকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে সরিয়ে রাখে, তাকে বাঁচানোর দায় কোনও রাজনৈতিক দলের নয়। তারা বরং সেই শূন্যস্থানটাকেই নিখুঁতভাবে কাজে লাগায়।

যে জাতি নিজের ভাষাকে অবহেলা করে, নিজের সংস্কৃতিকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে সরিয়ে রাখে, তাকে বাঁচানোর দায় কোনও রাজনৈতিক দলের নয়। তারা বরং সেই শূন্যস্থানটাকেই নিখুঁতভাবে কাজে লাগায়। আবেগের বাজারে বাঙালিয়ানা এখন এক ধরনের পণ্য, যেটা ভোটের মরসুমে তুলে ধরা হয়, ঝকঝকে মোড়কে বিক্রি করা হয়, আর ফল পাওয়ার পর তাকেই আবার সরিয়ে রাখা হয় পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য। এই খেলায় রাজনৈতিক দলগুলো যেমন দায়ী, তেমনি দায় এড়াতে পারে না বাঙালিও। কারণ নিজের ভাষাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভুলে গিয়ে, নিজের সংস্কৃতিকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে দূরে সরিয়ে দিয়ে, আমরা নিজেরাই সেই জমিটা তৈরি করে দিচ্ছি, যেখানে দাঁড়িয়ে অন্য কেউ আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে।

যে সমাজে বাংলা জানাটা আর গর্বের বিষয় নয়, বরং অতিরিক্ত বোঝা বলে মনে করা হয়, সেখানে বাঙালিয়ানা কেবল স্লোগানের মধ্যে বেঁচে থাকে, বাস্তব জীবনে নয়। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা প্রজন্মের কাছে বাংলা হয়ে উঠছে অপ্রয়োজনীয়, আর সেই শূন্যতাকে ঢাকতেই মাঝে মাঝে সাংস্কৃতিক আবেগের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। রাজনৈতিক দলগুলো খুব ভালো করেই জানে, এই ছিন্নমূল অস্মিতাকে একটু নাড়া দিলেই তা মুহূর্তে জেগে উঠবে এবং সেটাকেই তারা ভোটে রূপান্তর করতে পারবে। তাই বাঙালি আর কেবল একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় নয়, সে ক্রমশ একটি ইস্যু, একটি কার্ড, যা প্রয়োজনমতো খেলা হয়।

তাই প্রশ্নটা আর রাজনীতির দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দায় শেষ করা যায় না। প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে সত্যিই কি বাঙালি থাকতে চাই? নাকি শুধু ভোটের আগে মনে করতে চাই যে আমরা বাঙালি? যদি উত্তরটা প্রথমটি হয়, তাহলে তার প্রমাণ দিতে হবে প্রতিদিনের জীবনে, ভাষার ব্যবহার, সংস্কৃতির চর্চা আর নিজের শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যে। নাহলে বাঙালিয়ানা শুধু মঞ্চে উচ্চারিত কিছু নাম, স্লোগান আর আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে যা পাঁচ বছর অন্তর জেগে উঠবে এবং আবার নিশ্চুপ হয়ে যাবে।
____________ 
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। মতামত লেখকের নিজস্ব।
 

Developed by DXDasia