
দাস বংশের জোড়া পঞ্চরত্ন মন্দির ও আটচালা মন্দির
বাংলার গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে আছে বহু জনপদ। সেখানকার ইতিহাস, প্রাকৃতিক শোভা, উর্বরতা, শিল্পকলা, ভাস্কর্যের প্রতি আমরা সেভাবে দৃষ্টি দিই না। সেখান থেকে উঠে আসে অতীতের বহু উপাদান। হুগলি জেলার ইলছোবা (Hooghly Ilchhoba) গ্রাম তেমনই এক প্রাচীন জনপদ। জায়গাটি ইতিহাসের গতিপথে স্বতন্ত্র এক স্থান করে নিয়েছে। এককালে গণ্ডগ্রাম ছিল। আজ আধুনিকতার প্রসার যথেষ্ট। তবে সংরক্ষণের অভাবে ধুঁকছে ইলছোবার ইতিহাস।
বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক স্মরণীয় নাম রামগতি ন্যায়রত্ন। বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচয়িতা। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন বহরমপুর ছিলেন সেই সময় ন্যায়রত্ন মহাশয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। পণ্ডিত ন্যায়রত্ন মহাশয় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ ও অন্ধকূপ হত্যার ইতিহাস নিয়ে বই রচনা করেন। ইলছোবা গ্রামে ন্যায়রত্ন মহাশয়ের জন্মস্থান। আজকাল বাঙালি প্রজন্ম ভুলতে বসেছে এই সকল পথপ্রদর্শকদের কথা। রামগতি ন্যায়রত্ন ছিলেন সংস্কৃত কলেজের মেধাবী ছাত্র ও অধ্যাপক। চিরস্মরণীয় মনীষী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের খুবই প্রিয় ছাত্র। ন্যায়রত্ন মহাশয় ইলছোবা মণ্ডলাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। বিদ্যাসাগর ও রামগতি ন্যায়রত্ন মহাশয়ের সংযোগ প্রাণ পেয়েছে এই ইলছোবা গ্রামে।
ইলছোবায় প্রত্নবিলাসী মনে খুঁজে বেড়ালে মিলবে বাংলার একাধিক মন্দির স্থাপত্য। পাওয়া যায় মধ্যযুগীয় প্রত্নবশেষ। ইঁটের তৈরি ছোটো-বড়ো নানা রীতির স্থাপত্য। গ্রামে জমিদার হিরণ্য বংশ ও দাস বংশ প্রতিষ্ঠিত অনেকগুলো মন্দির বর্তমান।

রাসমণ্ডল
ইলছোবায় প্রত্নবিলাসী মনে খুঁজে বেড়ালে মিলবে বাংলার একাধিক মন্দির স্থাপত্য। পাওয়া যায় মধ্যযুগীয় প্রত্নবশেষ। ইঁটের তৈরি ছোটো-বড়ো নানা রীতির স্থাপত্য। গ্রামে জমিদার হিরণ্য বংশ ও দাস বংশ প্রতিষ্ঠিত অনেকগুলো মন্দির বর্তমান। মধ্যপাড়ায় অবহেলিত অবস্থাতে চারচালার মন্দিরটিও বহু পুরোনো। প্রতিষ্ঠাফলক চোখে পড়ে না। টেরাকোটা শিল্পের অলংকারে ষাঁড়ের পিঠে বসে শিব ও নন্দীর দৃশ্য সামনের অংশে মাঝের খিলানের ওপর দেখা যায়। জমিদার রামলোচন দাসের প্রতিষ্ঠিত জোড়া পঞ্চরত্ন মন্দিরের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। অপূর্ব টেরাকোটার নকশা সারা দেওয়াল জুড়ে প্রাধান্য পেয়েছে। জোড়া মন্দির স্থাপত্যে খিলানের ওপর ও প্যানেলে ফুল, লতাপাতা, চতুর্ভুজ শ্রীকৃষ্ণ, রাসমন্দল, শৈব যোগী, দুর্গা, নৌযান, বন্দুকধারী সাহেব ইত্যাদি দৃশ্য বিশেষ করে লক্ষণীয়। দাস বংশের আর এক আটচালার মন্দিরটি বর্তমানে ভগ্নদশায়।
গ্রামের হিরণ্য বংশ অর্থাৎ বন্দ্যোপাধ্যায়দের প্রতিষ্ঠিত বেশ কিছু স্থাপত্য আছে। তার মধ্যে আটচালার মন্দির বেশ কয়েকটি বর্তমান। সবথেকে জনপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়দের বারোচালার শিব মন্দিরটি। বাংলায় বারোচালার স্থাপত্য অপেক্ষাকৃত কম। চারটি চালা বা ঘরের মতো কাঠামোর ওপর চারটি চালা নিয়ে হয় আটচালা। আটটি চালার ওপর আরও চারটি চালা নিয়ে বারোচালা স্থাপত্য শৈলী গঠন হয়। বারোচালার মন্দিরটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। শিখরে ধাপে ধাপে বারোটি চালা উঠেছে। মন্দিরে টেরাকোটার অলংকরণ চিত্রায়িত হয়েছে। ইলছোবার বারোচালার স্থাপত্যটি প্রাচীন নিদর্শন। গ্রামে বন্দ্যোপাধ্যায়দের মন্দিরগুলো দেখতে এসেছিলেন ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার। স্থাপত্যের অনেক ছবি তুলেছিলেন। গবেষণার কাজে রমেশচন্দ্র মজুমদার পরিবারের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
প্রাচীন বিষ্ণু মূর্তি
ইলছোবায় দাস বংশের জোড়া বিষ্ণুমন্দিরের একটিতে আছে কষ্টি পাথরের এক বিষ্ণুমূর্তি। এই মূর্তির বয়স বহু প্রাচীন। বিষ্ণু মধ্য স্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর বামদিক, ডানদিক, ওপর ও নিচে অন্য দেবদেবী, বাহন, রক্ষক ইত্যাদি আছেন। বিষ্ণুর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম। বাংলা থেকে যে সকল মূর্তি উদ্ধার হয়েছে তার বেশিরভাগের মধ্যে এই লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট। বিষ্ণু মূর্তিটি পাদপীঠের ওপর দাঁড়িয়ে। দাস বংশ মূর্তিটির নিত্য পুজো করেন। এটি সম্ভবত মধ্যযুগের সময়কার। নীহাররঞ্জন রায় উল্লেখ করেছেন, এইরকম বিষ্ণু মূর্তিকে স্থানক বলা হয়। অর্থাৎ দণ্ডায়মান মূর্তি। বাংলাদেশে স্থানকমূর্তি সবচেয়ে বেশি উদ্ধার হয়েছে। বেশিরভাগ অঞ্চলে স্থানকমূর্তি দৃষ্টিগোচর হয়। কলকাতার একাধিক সংগ্রহশালাতে এই ধরনের মূর্তি আছে।
মন্দির স্থাপত্য অলংকরণ শুধুমাত্র সৌন্দর্যের জন্য নয়, যার চিত্রায়ন মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। ব্রজলীলার অনুকরণে বাংলায় বৈষ্ণব ভাবধারায় রাস উৎসব উদযাপনের সূচনা হয়েছিল। হুগলি (Hooghly) ও নদিয়ার (Nadia) রাস উৎসব খুবই জনপ্রিয়। শারদোৎসবের এক মাস পরেই রাস উৎসব আসে। মূলত শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে রাধা ও গোপীরা এইদিন নৃত্যলীলা করেন। রাস পূর্ণিমায় চিরাচরিত উৎসবের চিত্রটি টেরাকোটা অলংকারে মন্দিরের ফলকে দেখা যায়। যাকে ‘রাসমণ্ডল’ বলে। পঞ্চরত্ন মন্দিরের দেওয়ালে পাশাপাশি দুটি রাসমণ্ডল দেখা যায়। খিলানের উপরের অংশে অবস্থান করছে। জোড়া পঞ্চরত্ন মন্দিরে এছাড়াও আছে টেরাকোটা অলংকারে কৃষ্ণলীলা, দুর্গা, পুরাণের চিত্র, বন্দুকধারী সাহেব ইত্যাদি ফলকে অলংকৃত। তবে কিছু কাজ সময়ের সঙ্গে নোনা ধরে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মন্দিরের আগের রূপ হারাচ্ছে।

হাঁস বাড়ি
গ্রামে বিরাট এক পুকুরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ‘হাঁস বাড়ি’। সুবিশাল এই ভবনের জৌলুস আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। বর্তমানে কয়েকজন সদস্য বাস করেন। নিত্য শ্রীধর নারায়ণ জিউ পুজো হয়। ভেতরে ফাঁকা পড়ে বিরাট ঠাকুরদালান। বিশাল এই ভবনের মাথায় দুটি জোড়া হাঁসের মূর্তি আছে। বলা হয়, বাস্তু শাস্ত্রতে জোড়া হাঁস শুভ প্রতীক। আর ভবনের মাথায় লেখা ‘বন্দেমাতরম’। তৎকালীন সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের সংযোগ ছিল হাঁস বাড়ির সঙ্গে।
এখানকার আকর্ষণীয় আর একটি জায়গা ‘লাট বাংলো’। যা ডা: বিহারীলাল ঘোষের বাসভবন। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে নির্মিত হয় এই বাংলো। ডা: বিহারীলাল ঘোষ ছিলেন বিহারের মিথিলা অঞ্চলের ঐতিহাসিক রাজবংশ দ্বারভাঙা রাজ এস্টেটের চিকিৎসক।

সবুজ শ্যামল
এখানকার আকর্ষণীয় আর একটি জায়গা ‘লাট বাংলো’। যা ডা: বিহারীলাল ঘোষের বাসভবন। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে নির্মিত হয় এই বাংলো। ডা: বিহারীলাল ঘোষ ছিলেন বিহারের মিথিলা অঞ্চলের ঐতিহাসিক রাজবংশ দ্বারভাঙা রাজ এস্টেটের চিকিৎসক। তিনি একজন বড়ো মাপের চিকিৎসক ও মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ডা: ঘোষ ইলছোবা মণ্ডলাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। এই গ্রামের স্কুলেই তিনি প্রথমে নাম লেখান। সেকথা আজো লাট বাংলোর ফলকে উল্লেখিত আছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ট্রান্স (U.G) পরীক্ষায় প্রথম ব্যাচের প্রথম ছাত্র ছিলেন। তিনি পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও প্রসন্ন কুমার বসুসর্বাধিকারীর থেকে প্রশংসিত হয়েছিলেন। প্রকৃতির প্রাঙ্গণে গ্রামে এই লাট বাংলো অনেক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। বর্তমান সময়ে সে বাসভবন অত্যন্ত বেমেরামতি অবস্থায়। এ ছাড়া আরও অনেকগুলো স্থাপত্য গ্রামের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে কয়েকটি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার দিকে। সেগুলো প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। এই ধরনের স্থাপত্যগুলো হারালে বহু অধ্যায় মুছে যাবে।
________________
তথ্যসূত্র: রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুধীর কুমার মিত্র, নীহাররঞ্জন রায়
