
এই উপলক্ষে বছরভর হবে নানা অনুষ্ঠান ও আলোচনাসভা
এদেশের যে ক’টা কলেজ ছিল, সেগুলোয় রসায়ন শাস্ত্র নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়নি তখনও। তখনও মানে, ১৮৮৮ সাল নাগাদ। একমাত্র প্রেসিডেন্সি কলেজে নিয়মিত রসায়ন শাস্ত্রের পড়াশোনা হতো। এমনকী, ল্যাবরেটরিতে ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করা হতো। বেসরকারী কলেজ প্রায় ছিল না বললেই। যে ক’টা ছিল সেগুলোর তেমন আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না। কিন্তু, এই সব কলেজের ছাত্ররা নামমাত্র ফি দিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে বিজ্ঞানের ক্লাসে অধ্যাপকের বক্তৃতা শুনতে পারতো। এই ব্যবস্থা আবার পরে বন্ধ করে দিয়েছিলেন ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার। কারণ, ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত Indian Association for the Cultivation of Science বা ভারতীয় বিজ্ঞান সমিতিতেও পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন শাস্ত্রে বক্তৃতার ব্যবস্থা করেছিলেন, সাধারণে যেখানে নামমাত্র ফি’র বিনিময়ে যোগ দিতে পারতো। ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার গভর্নমেন্টের কাছে এই মর্মে চিঠি লিখেছিলেন, যে প্রেসিডেন্সি কলেজের বিজ্ঞানের ক্লাসে বেসরকারী কলেজের ছাত্রদের যোগদানের যে ব্যবস্থা আছে, তা বন্ধ করে দেওয়া হোক নাহলে বিজ্ঞান সমিতির বক্তৃতাগৃহ ফাঁকাই পড়ে থাকবে।
বিগত শতাব্দীর আশির কোঠায় রসায়ন শাস্ত্রের বিরাট পরিবর্তন হয়েছিল এবং শিক্ষা বিভাগের কর্তৃপক্ষগণ বুঝতে পারছিলেন যে শুধুমাত্র কতগুলো প্রাথমিক বিষয়ে বক্তৃতা দিলেই চলবে না, পরীক্ষাগারে গবেষণা ও ব্যবহারিক শিক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে অবিলম্বে। কারণ, বিজ্ঞান ক্লাসে ছাত্র-সংখ্যা দিন দিন বাড়ছিল এবং ‘বি’ (বিজ্ঞান) কোর্স ক্রমেই ছাত্রদের কাছে বেশি প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। এই সমস্ত কারণেই পেডলার শিক্ষাবিভাগের ডিরেক্টরকে লিখলেন, তিনি যেন বাংলা গভর্নমেন্টকে একজন অতিরিক্ত অধ্যাপক মঞ্জুর করবার জন্য অনুরোধ করেন। ঠিক এই সময়েই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ৬ বছর পর এডিনবার্গ থেকে ফিরে এসে এই অধ্যাপকের পদপ্রার্থী হন। এই চাকরির পাওয়ার পথ একেবারেই সুগম ছিল না। সেই সময় ভারতীয়রা দু-একটি ক্ষেত্রে উচ্চতর সার্ভিসে যোগ দিতে পারছিলেন কিন্তু ব্রিটিশরা ‘প্রভুত্ব’ বজায় রাখার জন্য অবস্থাটা আরও বিসদৃশ্য করে তুলেছিল। ‘ইম্পিরিয়াল’ ও ‘প্রভিনসিয়াল’ –এই দুই শ্রেণীর পদের সৃষ্টি করেছিল ইংরেজরা—প্রথম পদটি ব্রিট্রিশদের জন্য এবং দ্বিতীয়টি ভারতীয়দের জন্য। আর বেতন? ইম্পিরিয়ালরা পেত প্রভিনসিয়াল শ্রেণীর দ্বিগুন।
১৮৭৪ সালে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ হিসাবে এই বিভাগ চালু হয়েছিল প্রেসিডেন্সিতে। যে বিভাগে পড়িয়েছেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে দেশে-বিদেশে সম্মানিত শিক্ষকেরা।
১৮৮৮ সালের অগাস্ট থেকে ১৮৮৯ সালের জুনের শেষ পর্যন্ত প্রফুল্লচন্দ্রের কোনও কাজ ছিল না। তারপর অবশেষে একদিন প্রেসিডেন্সির একটি অধ্যাপকের পদ মঞ্জুর হয়। ১৮৮৯ সালে প্রেসিডেন্সির রসায়ন বিভাগে যোগদান করেন প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং ২৫০ টাকা বেতনে অস্থায়ী সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। এই বিসাদৃশ্যতা সহজে মেনে নেননি প্রফুল্লচন্দ্র। প্রতিবাদও করেছিলেন, সে কথা অন্য কোনো সময় আলোচ্য। প্রফুল্লচন্দ্র রায় যখন প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক, ভগিনী নিবেদিতা বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত'র জন্য রসায়ন বিভাগের গবেষণাগারে বোমা প্রস্তুত করার একটি ব্যবস্থা করেছিলেন। সবটা বুঝলেও কাউকে তা নিয়ে অভিযোগ জানাননি, পরোক্ষ ভাবে বিপ্লবীদের বোমা বানানোয় সাহায্য করতেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র । প্রফুল্লচন্দ্রের ওই নীরবতাই বুঝিয়ে দেয় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা।
পূর্বতন প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং আজকের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই রসায়ন বিভাগের ১৫০ বছর হতে চলেছে, যার পরতে পরতে রয়েছে ইতিহাস। শুরুতে রসায়ন বিভাগটি একটি একতলা দালানে ছিল। ১৮৭২ সালে আজকের নতুন বিল্ডিংটিতে উঠে যাওয়ার আগে হেয়ার স্কুল ঐ একতলা বাড়িতে ছিল। ১৮৭৪ সালে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিভাগ হিসাবে রসায়ন বিভাগ চালু হয়েছিল প্রেসিডেন্সিতে। যে বিভাগে পড়িয়েছেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে দেশে-বিদেশে সম্মানিত শিক্ষকেরা। যে বিভাগের পড়ুয়ারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করায় পেয়েছেন পৃথিবীজোড়া খ্যাতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে জানা গেছে, প্রফুল্লচন্দ্র এই বিভাগে ২৭ বছর পড়িয়েছেন এবং গবেষণা করেছেন। ১৮৯৫ সালে তিনি ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’আবিষ্কার করেন, যা তাঁর জীবনে নিয়ে আসে এক নতুন অধ্যায়। মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানের জার্নাল ‘নেচার’ পত্রিকার তা নজরে পড়ে। এর পরে নেচার-সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণামূলক জার্নালে ভারতীয়দের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হতে শুরু করে। যা আগে কখনও হত না।

বর্তমান বিভাগীয় প্রধান জানিয়েছেন, প্রফুল্লচন্দ্রের জীবন ও কৃতিত্বের স্মরণে ‘দ্য রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রি’ ২০১২ সালে একটি পুরস্কার ঘোষণা করেছে। তার স্মারকটি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে এখন রয়েছে। এই বিভাগের ১৫০ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে অনুষ্ঠানের সূচনাপর্বের আয়োজন করা হয়েছে ২৮ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল। এর পরে বছরভর হবে নানা অনুষ্ঠান ও আলোচনাসভা।
___________
তথ্যসূত্রঃ
আত্মচরিত, প্রফুল্লচন্দ্র রায়
আনন্দবাজার পত্রিকা
