
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাংস্কৃতিক ক্লাব
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জাঁকজমকপূর্ণ একাডেমিক পরিমণ্ডলে, যেখানে আগে থেকেই একাধিক সাংস্কৃতিক ক্লাবের বাহুল্য, সেখানে নজর কাড়ছে বাঙালি সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ একটি ক্লাব। খেয়াল হল এমন একটি ক্লাব যা ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বহন করছে।
বিভিন্ন বাঙালি উৎসব বা পরবগুলোয় শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে দারুণ সব প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানের আয়জোন করে খেয়াল। উৎসবের সারমর্ম মাথায় রেখে, কোন ঋতুতে উৎসবটি হচ্ছে -অনুষ্ঠান আয়োজনের সময় ইত্যাদি সূক্ষ সূক্ষ দিকগুলি নিয়ে ভাবেন ক্লাবটির সদস্যবৃন্দ। গতিময় এই পরিবেশের মধ্যে, অংশগ্রহণকারীদের নানা পারফরম্যান্সের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে উৎসাহিত করা হয় এবং এই অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে নানা বৈচিত্র্যের বিকাশ ঘটে।

বাঙালি ঐতিহ্যের স্বতন্ত্রতা প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায় উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের আরও বিশেষভাবে উদযাপন করা ঐতিহ্যের ছায়ায়। আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক হিসেবে একচেটিয়া ভাবে তুলে ধরা হয় ‘নান রুটি’ এবং ‘চিকেন টিক্কা মসলা’-এর মতো সুস্বাদু খাবারগুলি, যা অসাবধানতাবশত বাংলার সমৃদ্ধশালী রন্ধনসম্পর্কীয় শৈল্পিক ঐতিহ্যকে ম্লান করে রাখে। যদিও রন্ধনসম্পর্কীয় নিঃসন্দেহে ভারতীয় রন্ধনপ্রণালীর বৃহত্তর বর্ণালীর মধ্যে তাৎপর্য ধারণ করে, তারা ভারতীয় উপমহাদেশের বহুমুখী গ্যাস্ট্রোনমিক ল্যান্ডস্কেপের একটি ভগ্নাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
খেয়াল ক্লাব তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল গতবছর। নেপথ্যে ছিলেন সৌমিক ঘোষ, আবেশ ভট্টাচার্য, অচিন্ত্য আঢ্য এবং তমশুক পাল। সেখান থেকে এই এক বছরে ক্লাবটিকে সুপরিকল্পিত রূপ দিয়েছেন তাঁরা। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট কমিউনিটিতে অফিসিয়াল ভাবে নথিভুক্ত হতে পেরেছেন। তাঁদের প্রথম অনুষ্ঠান ছিল পয়লা বৈশাখে।
শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে বাঙালি সংস্কৃতিকে উদযাপনের ঘাঁটি হিসাবে এককভাবে দাঁড়িয়ে আছে খেয়াল। এমন অনেক ক্লাব আছে যারা ভারতের বিভিন্ন অংশের এবং অন্যান্য দেশের উৎসব উদযাপন করে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নয়। “একমাত্র আমরাই বাঙালি সংস্কৃতি উদযাপন করছি,” গর্বের সঙ্গে জানান কুন্তল ঘোষ (খেয়ালের অন্যতম সদস্য)।
এটা সত্যিই কী অদ্ভুত তাই না? বিভিন্ন সংস্কৃতি একই ধারায় প্রবাহিত হয়েও তারা স্বতন্ত্র। খেয়ালের লক্ষ্য হল বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সঠিক পরিবেশনা ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর দরবারে তুলে ধরা।
খেয়াল ক্লাব তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল গতবছর। নেপথ্যে ছিলেন সৌমিক ঘোষ, আবেশ ভট্টাচার্য, অচিন্ত্য আঢ্য এবং তমশুক পাল। সেখান থেকে এই এক বছরে ক্লাবটিকে সুপরিকল্পিত রূপ দিয়েছেন তাঁরা। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট কমিউনিটিতে অফিসিয়াল ভাবে নথিভুক্ত হতে পেরেছেন। তাঁদের প্রথম অনুষ্ঠান ছিল পয়লা বৈশাখে। “শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে এটা একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলো। সবাই ১ জানুয়ারি, ইংরেজি নববর্ষ পালন করে, কিন্তু পয়লা বৈশাখ পালনের উদ্যোগ তেমন চোখে পড়ে না। সেকারণেই এই ক্লাবের মূল সদস্যরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতিকে উদযাপন করতে চায়।”

পয়লা বৈশাখের দিন শুরুতেই আলাপ পর্ব সেরে নেওয়ার পর সদস্যরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা ভাবে তাঁদের প্রতিভার পরিচয় দেন। ক্লাবের অন্যতম সদস্য শ্রেয়সী রায় পিয়ানোর সঙ্গতে পরিবেশন করেন জনপ্রিয় আধুনিক বাংলা গান 'দেখেছো কি তাকে'। বাউল গান পরিবেশন করেন সন্ধিকা সৃজনী তানিয়া। দুর্গা পুজো, রবীন্দ্র জয়ন্তীর মতো বাঙালিদের অন্যান্য উৎসবগুলিও উদযাপন করছে খেয়াল। এই উদযাপনে শুধুমাত্র বাঙালিরাই সামিল হতে পারবেন, এমনটা নয়। চাইলে যে কেউ বাংলার এই উৎসবগুলির অংশ হতে পারেন, চাইলে পারফর্মও করতে পারেন।
এই উদযাপনকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলে বাঙালি সংস্কৃতিকে জানার পরিসর তৈরি করছেন তাঁরা। বিদেশে জন্ম নেওয়া পরবর্তী প্রজন্মকে শিকড় চেনাতে সাহায্য করছেন। “এমন নয় যে আমরা শুধুমাত্র রবীন্দ্রসংগীতের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছি। উপস্থাপনার মধ্যে আমরা অভিনবত্ব রাখার চেষ্টা করেছি। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্ত উৎসব পালনের সময় অনেকেই কত্থক, অন্যান্য ধ্রুপদী নৃত্য এমনকি নাটকেও নিজস্বতার ছাপ রেখেছিল। আমরা এটাই বলতে চাইছি যে, ভারতীয় সংস্কৃতি এবং বাঙালি সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রে এক নয়। তবুও পারস্পরিক সহাবস্থানে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকেই তুলে ধরে।”
“উৎসবের থিম অনুযায়ী আমরা পুরো ব্যাপারটাকে সাজাই।” বলছিলেন সুলগ্না ঘোষ। থিম-কে যতটা সম্ভব আকর্ষনীয় করে তোলার চেষ্টা করেন তাঁরা। যেমন, এবার দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে খুব সাধারণ প্যান্ডেলসজ্জার আয়োজন করা হয়েছিল। সুন্দর উজ্জ্বল কিছু আলোর সঙ্গে নথ পরিহিত, রক্তিম ওষ্ঠের ত্রিনয়নী দুর্গা।
এ বছর রবীন্দ্রজয়ন্তীতে অভিনব একটি পরিবেশনার আয়োজন করেছিলেন তাঁরা। মঞ্চে লাইভ পেইন্টিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল; শিল্পীরা এঁকেছিলেন বিভিন্ন ঋতুর গানের ওপর ভিত্তি করে। গানগুলির সঙ্গে শিল্পীদের তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছিল এক একটি ঋতু। বসন্তের গানের সঙ্গে ক্যানভাসে ফুটে উঠছিল প্রাণবন্ত রঙ আর উজ্বল ফুলের দৃশ্য। আবার দুর্গাপুজোর গানে শিল্পীরা চিত্রিত করেছিলেন মা দুর্গার আগমনের সংকেতবাহী একগুচ্ছ কাশফুল।

এই লাইফ পেইন্টিং-এ অংশ নিয়েছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া অঞ্চিতা আঢ্য, যিনি আণবিক প্রকৌশল নিয়ে স্নাতক করছেন। তিনিও এই ক্লাব বা সমিতির অন্যতম একজন সদস্য এবং ওতোপ্রতো ভাবে জড়িত। “তুমি সুন্দর মেঘমালা,” “তুমি রবে নিরবে,” “হিমেরো রাতে,” “আমার রাত পোহালো” এবং “দারুণ অগ্নিবাণে রে” গানগুলিকে তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁর শৈল্পিক দক্ষতায়।
শিকাগোর ঠান্ডাকে কিছুটা উষ্ণ করে তুলতে এবং কলকাতার উষ্ণ মরসুমের কথা মনে রেখে এবছর বসন্ত উৎসবের আয়োজন করেছিলেন তাঁরা। এটিই তাঁদের প্রথম বসন্ত উৎসব। আচার-অনুষ্ঠানের থেকে এই উৎসবের সাংস্কৃতিক দিকটিকে তাঁরা প্রাধান্য দেন। বসন্তের আবাহনে আলপনা দেওয়ার ব্যবস্থাও করেছিলেন তাঁরা। সদস্যরা নিজে হাতেই সবটা করেন। সৌমিক ঘোষ বলেন, “আয়োজন করার সময় আমরা চুটিয়ে মজা করি, আনন্দ হয়।”
সদস্যরা প্রত্যেকেই পারফর্মেন্সের সময় স্বতন্ত্রতা বজায় রাখেন এবং নিজেদের শিকড়কে চেনাতে, নিজেদের সংস্কৃতিকে আর পাঁচজনের অন্তরে প্রতিষ্ঠা করতে কঠোর পরিশ্রম করেন।
ইংরেজিতে মূল প্রতিবেদনটি পড়তে ।
