ডান পা এবং ডান চোখ নেই, তবুও লড়াই জারি আছে শিলিগুড়ির এই তরুণের

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শংসাপত্রের সুযোগ তিনি নিতে চাননি এই যুবক

চার মাস বয়সে পোলিও হওয়ার জেরে রোডাগৌরব লাকড়ার ডান পায়ের নিচের অংশ অসাড় হয়ে যায়। আবার দু-বছর আগে ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর বিরাট দুর্ঘটনার শিকার হয় রোডাগৌরব। সেই দুর্ঘটনায় তার ডান পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি ডান চোখের একটি নার্ভ ছিঁড়ে গিয়ে রোডারের একটি চোখ দৃষ্টিহীন হয়ে যায়। ডান পা এবং কোমরের সংযোগে অপারেশনের সময় বসানো হয় তিনটি লোহার স্ক্রু। রোডার মস্তিষ্কেও সেই দুর্ঘটনা রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দেয়। এত সব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে রোডাগৌরব উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে এমএ পড়াশোনা করছেন। শুধু তাই নয়, প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে রোডা গিটার বাজিয়ে বিস্ময় তৈরি করছেন বিভিন্ন মহলে।

শিলিগুড়ির নেতাজিনগরের বাসিন্দা রোডাগৌরবের মা প্রিসকিল্লা ইলোরা লাকড়া বলেন, ছোটো থেকেই তাঁর সন্তান বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। আজ চব্বিশ বছর বয়সে তাঁর সন্তান আরও প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত। কিন্তু এরপরেও প্রতিবন্ধী শংসাপত্রের সুযোগ তাঁরা তাঁদের পুত্রকে দিতে চাননি। আর দশজন সাধারণের সঙ্গেই পড়াশোনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন রোডা। 

চার মাস বয়সে পোলিওর জেরে রোডা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে নিয়ে চিন্তায় ছিলেন প্রিসকিল্লাদেবীরা। কিন্তু লড়াই আর লড়াই – এই শিক্ষাই তারা দিতে থাকেন রোডাকে। ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর বিরাট দুর্ঘটনার পর রোডা রাস্তার ধারে অনেকটা সময় পড়েছিলেন। পথচারীরা ভেবেছিলেন, রোডা মারা গিয়েছেন। তার মা প্রিসকিল্লাদেবীর কাছে ফোনও আসে এভাবেই যে, রোডা মারা গিয়েছে। টোটোতে তাঁর মৃতদেহ বাড়ির দিকে যাচ্ছে। প্রিসকিল্লাদেবী উত্তরবঙ্গ ক্ষেত্রীয় গ্রামীণ ব্যাঙ্কের কর্মী। তিনি পুত্রের ওই সংবাদ পেয়ে মুষড়ে পড়েন। কিন্তু পুত্রের কাছে পৌঁছে দেখলেন, ছেলে মারা যায়নি। তিনি পড়িমরি করে রোডাকে নার্সিংহোমে  নিয়ে গেলেন। সেখানে দফায় দফায় তাঁর মেজর অপারেশন হল। তারপর প্রতিবন্ধকতা আরও বাড়ল। ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি চিরতরে চলে গেল। ডান পা ও কোমরের সংযোগে লোহার স্ক্রু বসল তিনটি।

ডান পা খুঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়ি যাতায়াত করে রোডার। গিটারের চর্চাও তাই। ভালো ছবিও আঁকত রোডা। কিন্তু একটি চোখ নষ্ট হওয়ায় আজ আর ছবি আঁকা হয় না৷ তবে ভবিষ্যতে ডব্লুবিসিএস পরীক্ষায় পাশ করে প্রশাসনিক পদে আসার ইচ্ছে আছে তাঁর। রোডার স্বপ্ন দেখেন, পিছিয়ে পড়া ছেলে-মেয়েদের উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন। তিনি বলেন, “ইচ্ছাশক্তি নিয়ে মনের জোরে লড়াই করছি”। আর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হলেও তাঁর বাবা-মা বিশেষ চাহিদাসম্পন্নের সুযোগসুবিধা প্রদানের উদ্যোগ না নেওয়ায় বাবা-মার প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানাতে ভোলেন না এই তরুণ। আজ, ৩ ডিসেম্বর বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস। আজকের দিনে সবার নজরে আসুক রোডারের মতো অসংখ্য তরুণ-তরুণীর কথা।

Developed by DXDasia