শিল্পী অরুণিমা চৌধুরী : ছবির ক্যানভাস জুড়ে অরণ্যের প্রাচীন সুর

শিল্পী অরুণিমা চৌধুরী-র ছবিতে রয়েছে অরণ্যের প্রাচীন সুর। সে সুর ওঁর বেড়ে ওঠার সঙ্গে বদলেছে। ক্রমশ জীবনকে আকার দিতে সহায়তা করেছে। প্রকৃতির স্পর্শ তাঁকে দিয়েছে প্রেরণা। একটা সুদীর্ঘ সময় ধরে একাধিক শিল্পমাধ্যম নিয়ে চৰ্চা করা কঠিন কাজ। অরুণিমা চৌধুরী তাই করে চলার মাধ্যমে সুন্দরের খোঁজ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। যা তাঁর অনুভূতি প্রবণতাকে অন্য এক উত্তরণের দিকে পৌঁছে দিয়েছে বলে মনে হয়। শিল্পের সংজ্ঞা অরুণিমা চৌধুরীর কাছে আসলে কী? শিল্পী নিজেই বলেন, “শিল্প বলতে আমি বুঝি একটা ইচ্ছে, ইচ্ছের প্রকাশ। আমার যে অবস্থান, আমি যে পৃথিবীতে এসেছি তার খোঁজ করে যাওয়াও একপ্রকার শিল্পই।”

ছাত্র জীবনে শিল্পচর্চার যে প্রাথমিক ধারণা, পাশ করে তা সম্পূর্ণ বদলে যায়। জীবন, চারপাশের রং, সামাজিক প্রেক্ষাপট সব ওলট-পালট হয়ে যায়। ছবির ভাষাও অস্থির হয়ে ওঠে।

ওঁর সংবেদনশীল মনকে ধরে ফেলা যায় এতেই। জন্ম-মৃত্যুর মাঝের অংশই জীবন, একটি অনিশ্চিত ব্যবধান। এই জীবনের অন্বেষণ করে যাওয়াই ওঁর উদ্দেশ্য। সেই খোঁজ করতে করতেই পরে মূলস্রোতের শিল্পচর্চায় চলে আসেন। একটা অনিশ্চিত জীবনকে ধারণ করতেই যেন শিলিগুড়ি থেকে কলকাতায় আসা। নিজেকে বহুরূপে, বহু ভঙ্গিমায়, সুরে-ধ্বনিতে আবিষ্কার করাই যেন ওঁর কাজ। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কলকাতার ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনে দর্শন বিভাগে ভর্তি হন। ওঁর বাবার ইচ্ছে ছিল এরপর ব্যারিস্টারি পাশ করে আত্মীয় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের অধীনে আইন চর্চা করবেন। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, যিনি পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হবেন। দর্শন পড়তে পড়তেই ১৯৬৯ সালে ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিলেন এবং পাশ করলেন। পরীক্ষক শিল্পী বিকাশ ভট্টাচাৰ্য। পরে তিনিই অরুণিমার শিল্পপাঠের প্রথম শিক্ষক হলেন। অরুণিমা বলেন, “বিকাশবাবু অসম্ভব ভালো ক্লাস নিতেন। ভীষণ দক্ষ ছিলেন ড্রয়িং, জলরং, অয়েল, ড্রাই প্যাস্টেল সবেতেই। ওঁ নিজে করে আমাদের দেখাতেন। তার সঙ্গে চলতো আউটডোর স্টাডি।” সে সময়ে নিয়মিত আউটডোর স্টাডি করে দেখাতে হত কলেজে। এখনও সে নিয়ম একেবারে উঠে যায়নি। অরুণিমা চৌধুরী বললেন, “অয়েলে ল্যান্ডস্কেপ করতে আমার অসুবিধে হত না। টিউব থেকে প্যালেটে রং ঢেলে, দেখছি আর লাগাচ্ছি। আর সেসব কাজ দেখে বিকাশবাবু বলতেন খুব ভালো হচ্ছে। তুমি ছবিই আঁকবে।”

পরবর্তীকালে সে কথা যে সত্যি হয়েছে সে আর বলে দিতে হয় না। ছাত্র জীবনে শিল্পচর্চার যে প্রাথমিক ধারণা, পাশ করে তা সম্পূর্ণ বদলে যায়। জীবন, চারপাশের রং, সামাজিক প্রেক্ষাপট সব ওলট-পালট হয়ে যায়। ছবির ভাষাও অস্থির হয়ে ওঠে। অরুণিমা বলেন, “পাশ করার পরে যখন ফিগারেটিভ কাজ করতে যাচ্ছি, তখন দেখছি যা ভাবছি, যা করতে চাইছি, আর যা করছি সেটা ঠিক মনের মতন হচ্ছে না। ভীষণ অশান্তি থেকে অয়েল করা ছেড়ে দিলাম।” ওঁর এই অনুভূতির কথা গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এতে শিল্পীর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান অনুধাবন করা যায়। এই অনিশ্চয়তার সুর ওঁর মনের সঙ্গে অন্যদের ভিন্নতার প্রমাণ দেয়।

অরুণিমা চৌধুরী পাশ করার পরে, সহপাঠী শিল্পীবন্ধু গৌতম চৌধুরীর সঙ্গে নৈহাটিতে ‘বিহান’ নামে আঁকার স্কুল শুরু করেছিলেন। নিজের শিল্পচর্চার সঙ্গে শিল্পকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ একত্রে করা সহজ নয়। সে সময়েই নন্দলাল বসুর ‘শিল্পচর্চা’ বই থেকে গুঁড়ো রং ও প্রাকৃতিক আঠার ব্যবহার রপ্ত করেন। বিশ্বভারতী কলা ভবনে এই প্রাকৃতিক রঙের চর্চা থাকলেও কলকাতার আর্ট কলেজগুলোয় শেখানো হত পশ্চিমী ধাঁচে। সেখানে তেলরঙের ব্যবহার বেশি। অরুণিমা বললেন, “ওই রং ছোটো ছোটো বাটিতে গুলে দিতাম বিহানের ছেলেমেয়েদের। ওরাও আঁকতো, আমিও আঁকতাম। আঁকতে আঁকতে দেখলাম ভালোই লাগছে। তারপর থেকে ওই রঙেই আঁকতে আরম্ভ করলাম।” বোধহয় আর্থ কালারের ব্যবহারের জন্যই অরুণিমা চৌধুরীর ছবির রং এত পরিণত, এত মার্জিত। ছবিতে শান্ত রসই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

কলকাতায় চলে আসার পরে পাঠভবনে প্রাইমারি বিভাগে শিক্ষকতায় যোগ দেন। শেখাতেন ছবি আঁকা, গান। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন, শিল্পী অরুণিমার ছবির প্রশংসা সকলেই করবেন। কিন্তু অনেকেই হয়তো ওঁর সংগীত পিপাসার কথা জানেন না। সুর ওঁকে ঘিরে রয়েছে সর্বক্ষণ। গান শিখেছেন সুরঙ্গমায়। মূলত রবীন্দ্রসংগীত। সুরঙ্গমার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, শৈলজারঞ্জন মজুমদার। যিনি বিশ্বভারতী সংগীত ভবনে শিক্ষকতা করেছেন। দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন ছেড়ে আসার পরে ১৯৩৯ সালে সংগীত ভবনের অধ্যক্ষ হন। রবীন্দ্রনাথের প্রায় ১৫০টি গানের স্বারলিপিকার ছিলেন এই শৈলজারঞ্জন মজুমদার। অরুণিমা চৌধুরী মূলত ওঁর কাছে এবং প্রফুল্ল কুমার দাসের কাছে গানের তালিম নিয়েছিলেন। পরে সুবিনয় রায়ের কাছেও দীর্ঘদিন গান শিখেছেন। কথায় কথায় অরুণিমা বলেন, “শৈলজদা একটা গানের অংশ বারবার গাওয়াতেন। আমাদের ভালো না লাগলেও, যতক্ষণ না পারফেক্টলি গানটা উঠছে ততক্ষণ ছাড়তেন না। এসরাজ নিয়েই গান শেখাতেন। আমাদের গাইতে বলতেন। সুর ঠিক না হলে শতরঞ্চির ওপর ছড়টা ফেলে আবার গাইতে বলতেন। বাড়ি ফিরে গাইতে গিয়ে দেখতাম, গানটা একটা শরীর হয়ে গিয়েছে। এখনব শিহরণ জাগে।”

শুরুতেই বলেছিলাম শিল্পের বিভিন্ন ঘরে অরুণিমা চৌধুরীর অবাধ যাতায়াত। আজকে যাকে আমরা মাল্টিডিসিপ্লিনারি প্র‍্যাক্টিস বলি, উনিও তাই করেছেন। করেছেন ম্যুরাল, ফ্রেস্কো, টেরাকোটা, সেরামিক। এঁকেছেন এনামেল প্লেট, জড়ানো পটে।করেছেন ইকো প্রিন্টের দীর্ঘ স্ক্রলের ওপর স্টিচ ওয়ার্ক ইত্যাদি। বিহানের স্কুলের ছাত্রদের নিয়ে গড়েছেন গ্লাভস পাপেট। নাটক লিখে গান বেঁধে পাপেট শো-ও করেছেন। শিল্প একটি অবিরাম করে চলার প্রক্রিয়া, যেখানে অন্বেষণই প্রধান।

অরুণিমা চৌধুরী দীর্ঘ সান্নিধ্য পেয়েছেন শিল্পী কে.জি. সুব্রহ্মণ্যন-এর। উনিই বলেন এনামেল প্লেটে কাজ করার কথা। অরুণিমা বলেন, “সবরকম বিষয় নিয়েই কাজ করেছি। ছবির মাধ্যমে যে শুধু আমি আমার বক্তব্য বলতে চেয়েছি তা নয়। যা সমাজ, প্রকৃতি থেকে আহরণ করেছি, সেটাই এঁকেছি।” এখানে আমাদের মনে হবে ওঁর প্রত্যক্ষ, পূর্বপরিকল্পিত বক্তব্য না থাকলেও, একটি চিত্রভাষা নিজের বক্তব্য নিজেই রাখে। শিল্পী না চাইলেও কিছু কথা থেকেই যায়। অরুণিমা চৌধুরীর আরও একটি দিক উনি নিয়মিত লেখেন। যার ঝলক ছবিতেও রয়েছে। যাকে আমরা ন্যারেটিভ নেচার বলি। স্টোরিটেলিং ক্যারেক্টার রয়েছে ভীষণভাবে ওঁর ব্যক্তি জীবনেও। ভারতীয় শিল্পে আধুনিকতার আজকের যে ধারণা, তাতে অনেকাংশেই পশ্চিমী দেশের কলোনাইজেশন ও গ্লোবালিজেশনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে অরুণিমা বলেন, “আধুনিকতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল। ওয়েস্টার্ন আর্ট থেকে ধার করে যদি আমায় আঁকতে হয় সেটা কেন আধুনিক হবে? আমাদের দেশেই তো এর বীজ রয়েছে। অজন্তার ছবি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও আধুনিকই থাকবে।” অর্থাৎ আমাদের দেশের আধুনিকতার যে সংজ্ঞা তা অন্য দেশের মতন হবে না। আমাদের দর্শন, বিশ্বাস, ধর্ম, ইতিহাস এসবের যে শিকড় তার থেকে আধুনিকতা বিচ্ছিন্ন হবে না।

শিল্পের বিভিন্ন ঘরে অরুণিমা চৌধুরীর অবাধ যাতায়াত। আজকে যাকে আমরা মাল্টিডিসিপ্লিনারি প্র‍্যাক্টিস বলি, উনিও তাই করেছেন। করেছেন ম্যুরাল, ফ্রেস্কো, টেরাকোটা, সেরামিক। এঁকেছেন এনামেল প্লেট, জড়ানো পটে।করেছেন ইকো প্রিন্টের দীর্ঘ স্ক্রলের ওপর স্টিচ ওয়ার্ক ইত্যাদি।

অরুণিমা চৌধুরীর ছবি দেখতে গিয়ে সম্মোহিত হতে হয় বারবার। সে সবকিছুই অনেকসময় আমাদের আলোকিত করে। ওঁর গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান, ‘লক্ষ্মী যখন আসবে’ মনে পড়তে নিজেও আমরা গুনগুন করে গেয়ে উঠি। ওঁর ছবিতে মনজাগতিক টানাপোড়েনের অসংখ্য স্তর রয়েছে। রঙের প্রলেপে সে সব মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান হয়েছে গভীর ও পরিপূর্ণ। নারী চরিত্রের প্রাধান্য থাকলেও, অসংখ্য পুরুষের সহাবস্থান রয়েছে ছবিগুলোয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উনি বলেন, “পুরুষতান্ত্রিকতার অত্যাচার আমি সর্বত্র দেখেছি। পরিবারেও। আইন পাশ করেও প্র্যাক্টিস করিনি। বাবার আপত্তি থাকায় মতবিরোধ হয়। এছাড়া সমাজে দেখেছি অনেককে। যে জন্য মেয়েদের প্রতি আমার দুর্বলতা।” শুধুই দুর্বলতা নয়, ভীষণ সচেতন না হলে এরকম ছবি আঁকা যায় না। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে ওঁর স্বাধীনচেতা, যুক্তিবাদী মন। এর মূলে তিনটি স্তম্ভ রয়েছে। দর্শন-আইন-শিল্প। এই তিন বিষয়ে পড়াশোনা আছে বলেই ছবির পরতে পরতে বিস্ময়।

লিঙ্গ সমতা নিয়ে কথা বলতে উনি বলেন, “আমি নারীবাদী কখনোই নই। শুধু নারী স্বাধীনতা নয়, নারী-পুরুষের লিঙ্গভেদ নয়, আমি মানুষ বলেই মনে করি। সমতা প্রয়োজন।” অরুণিমা চৌধুরী একজন সচেতন নাগরিক। দেশীয় ও বিশ্ব শিল্প, রাজনীতি, সমাজ সম্পর্কে উনি অবগত। ক্ষমতায়নের প্রতিষ্ঠায় ক্রমে মানুষের বোধ, চেতনা হারাচ্ছে বলে উনি মনে করেন। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করতে ক্ষমতাবান মানুষ প্রলিপ্ত। এতে সামাজিক অবক্ষয় হচ্ছে। সক্রিয় প্রতিবাদে উনি অংশ নেবেন কিনা আমরা জানি না। তবে ওঁর প্রতিবাদের ভাষা ভিন্ন। তবে উনি অ্যাক্টিভিস্ট নন। কিন্তু সমাজের কথাই উনি দৃঢ়ভাবে সাহসের সঙ্গে বলে চলেছেন ছবির মাধ্যমে। এ-ও কি একপ্রকার অ্যাক্টিভিস্ট নেচার নয়? নীরবতার ভাষা আরও বলিষ্ঠ। যেহেতু ওঁর কাজে প্রকৃতির বাস, তাই অরণ্যের অধিকার নিয়ে বললেন, “জঙ্গলের মানুষ এখন অড ম্যান হয়ে গিয়েছে। অথচ জঙ্গলের অধিকার তাদেরই ছিল। প্রকৃতিকে ওরা নিজের থেকেও ভালো চেনে। তাদের আমরা সন্ত্রাসবাদী বলে দাগিয়ে দিচ্ছি। নির্বিচারে মেরে ফেলছি।” মানুষের কথা বললেন, কমিউনিটি কালচার ডেভেলপ করতে হবে। নিঃস্বার্থভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে প্রাকৃতিক ইকো-সিস্টেমকে রক্ষা করতে, মানবতাকে রক্ষা করতে। অরুণিমা বলেন, জীবনের সংকটে তিনি সবসময়েই রবীন্দ্রনাথকে পেয়েছেন। ওঁর গান সামাজিক অবক্ষয় থেকে আমাদের বাঁচাবে। বললেন, “দুঃখকে জয় করে নিজে উঠে দাঁড়ালে, সকলের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের কাজ।”

ওঁর ছবিতে এমন কিছু আছে, যা অশান্ত মনকে স্থির করতে পারে। নগরে থেকেও নাগরিক কোলাহল ওঁর ছবিকে ছুঁতে পারে না। অদ্ভুত মায়াময় কাব্যিক সব ছবি অরুণিমা চৌধুরী এঁকে চলেছেন। এই কর্মময় জীবনীশক্তির কাছে শ্রদ্ধায় নত হতেই হয়।

________________
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত

Written by