
বাগমারি কবরস্থানই কলকাতার বৃহত্তম মুসলিম কবরস্থান
কলকাতা তার মাটির নীচে সযত্নে লালন করে সহস্র সমাধি। লোয়ার সার্কুলার রোডের কবরস্থানে মধুসূদন দত্ত, সাউথ পার্ক স্ট্রিটের সমাধিস্থলে ডিরোজিও, ডেভিড ড্রামণ্ড, বেথুন আরও কত বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সমাধি রয়েছে কলকাতার বুকে। একসময় ব্রিটিশ, ওলন্দাজ, পর্তুগিজরাই থাকতেন এই শহরে, ফলে তাদের অনেকেই কল্লোলিনী তিলোত্তমার বুকে সমাধিস্থ।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে তৈরি এই সব কবরস্থানগুলি স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্পের দিক থেকেও স্বতন্ত্র। কোনোটায় চোখে পড়বে গ্রিক করিন্থীয় শিল্পরীতি, কোনোটা আবার স্কটিশ কিংবা ফরাসি রীতিতে বানানো। শুধু তাই নয়, মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যেও কলকাতায় গড়ে উঠেছিল বেশ কিছু সমাধিক্ষেত্র, সেখানে আবার মুঘল ঘরানা কিংবা ইসলামি স্থাপত্যকর্মের নিদর্শন দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, এ কথা নিশ্চিত। লোয়ার সার্কুলার রোড, খিদিরপুর, দক্ষিণ পার্ক স্ট্রিট, ভবানীপুর, শিয়ালদার সেন্ট জন সিমেট্রি অথবা এন্টালির আর্মেনিয়ান সিমেট্রির ভিড়ে এমনই অগোচরে থেকে যাওয়া সমাধিস্থল বাগমারি কবরস্থান। এটিই কলকাতার মধ্যে প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম মুসলিম কবরস্থান।
১৪৭ বিঘা জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই বাগমারি কবরস্থান। গোবরা, গার্ডেনরিচ, একবালপুরের অনেক অনেক আগেই এই বাগমারি কবরস্থান তৈরি হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করা হয়।
কলকাতার সিআইটি রোড (CIT Road) ধরে মানিকতলা ইএসআই হাসপাতালের (Maniktala ESI Hospital) দিকে যেতে গেলেই বড় রাস্তার ডান ধারে অনায়াসেই চোখে পড়ে যাবে বিশাল জমির উপর গড়ে ওঠা এই বাগমারি মুসলিম কবরস্থান। জায়গাটা কাঁকুড়গাছি এলাকার মধ্যেই পড়ে। কিন্তু নিস্তব্ধ দুপুরে কাঁকুড়গাছির (Kankurgachi) জনকোলাহলের মাঝেও বাগমারি কবরস্থানের গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লেই গ্রাস করে নেয় এক স্বর্গীয় শান্তি। এ যেন এক অন্য পৃথিবী – চিরনিদ্রার দেশ।
আরও পড়ুন: চুঁচুড়ার কবরখানায় এখনও ঘুমিয়ে ওলন্দাজ শাসন
গেট দিয়ে ঢুকে, পুরসভার বোর্ডে প্রথমেই চোখ পড়বে আর মুহূর্তের মধ্যে বিস্ময় ধরা দেবে চোখে। ১৪৭ বিঘা জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই বাগমারি কবরস্থান (Bagmari Cemetery)। গোবরা, গার্ডেনরিচ, একবালপুরের অনেক অনেক আগেই এই বাগমারি কবরস্থান তৈরি হয়ে গিয়েছিল বলে মনে করা হয়। সময়ের ঘষা লেগে কবরের সৌন্দর্য বিলীন হয়েছে, সৌধগুলির গায়ে লেগেছে খানিক শ্যাওলা ধরা সবুজের ছাপ। দেশভাগ হওয়ার আগে এখানেই সমাধিস্থ হয়েছিলেন লাহোর কিংবা ঢাকার বহু বিখ্যাত মানুষ।

ধনী-নির্ধন মৃত্যুর পরে সকলেই সমান। এক মাটিতেই বিলীন হতে হয় সকলকে। তবুও কোনোও কোনোও কবরের সুদৃশ্য মিনাকারির কাজ নজর কাড়ে। কোনোও কোনোও কবরের সৌধে আবার উর্দু এবং ফারসিতে লেখা কিছু কবিতার লাইন খোদিত। ভিতরে কোনোও কবরের উপরে সুন্দর চাদর বিছানো দেখা যায়, আবার কোথাও চোখে পড়ে পীরবাবার মাজার গড়ে উঠেছে, এই বাগমারি কবরস্থানের ভিতরেই রয়েছে এতো রকমফের। কোনোও পরিবার এখানেই কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁদের মৃত আত্মীয়দের সমাধিস্থ করে আসছেন।
শবযাত্রীদের আচার অনুষ্ঠানের জন্য এই কবরস্থানে নিযুক্ত আছেন একজন সম্মানীয় ইমাম। অসংখ্য কবরের পাশে এখানে রয়েছে দুটি পুকুরও। শবযাত্রী আত্মীয়েরা প্রিয়জনের কবরে মাটি দেওয়ার আগে সেই পুকুরের জলেই হাত-পা ধুয়ে ওজু করে নেন। এখন অবশ্য যত্নের অভাবে সেই পুকুরের জলে ভরে উঠেছে সবুজ পানা। ভিতরে ভিতরে বহু কবরকে নষ্ট করে দিয়েছে এই পুকুর। সংস্কারের অভাবে চারপাশের মাটিও ধ্বসে গিয়েছে।

আগে মৃতদের কবর দেওয়ার জন্য এখানেই আলাদা করে জায়গা কেনার চল ছিল। সেখানে ক্রেতার পরিবার নিজেরাই সৌধ নির্মাণ করতে পারতেন। কিন্তু আশির দশক থেকেই এই নিয়ম-রীতি বন্ধ। জনসংখ্যা বাড়ছে দিন দিন, সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত মানুষের কবরও। এখন আর স্থান সংকুলান হয় না বাগমারি কবরস্থানে। এখন তাই, ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী। কলকাতা (Kolkata) শহরের বৃহত্তম মুসলিম কবরস্থানেও সমাধি দেওয়ার জায়গার অভাব! অতিমারী পরিস্থিতিতে করোনায় (Covid19) মৃত প্রায় ১৩০০ মুসলিম রোগীদের কবর দেওয়া হয়েছে এক বছরের মধ্যে। তার পর থেকে আর স্থান সংকুলান করা যাচ্ছে না বাগমারি কবরস্থানে। ফলে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর কবরস্থানের জমি পুনর্ব্যবহার করা হয়ে থাকে এখন। আগে তো কবরের কাছে গাছ পোঁতারও রীতি ছিল। অনেকেই মনে করতেন, এই গাছ পোঁতার রীতিটা মৃতদের জন্য শুভ। এই রীতির চলও এখন উধাও।
হেমন্তের নিস্তব্ধ দুপুরে বাগমারির শায়িত কবরেরা এখন কেবলই বিষাদ কাব্য বলে, এশিয়ার বৃহত্তম মুসলিম কবরস্থানের (Muslim Burial Ground) আখ্যা পাওয়া বাগমারি কবরস্থান কলকাতার বুকে আজও যেন ব্রাত্য!
