‘আমার সাহেব হইবার পথ বিধাতা রোধ করিয়া রাখিয়াছেন’

মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনের জানা-অজানা গল্প

(১)
মাইকেল মধুসূদন দত্ত পেশায় উকিল ছিলেন। একদিন তিনি বার-লাইব্রেরিতে বসে বিশ্রাম করছেন। এমন সময় আরেকজন উকিল এসে তাঁকে বললেন, ‘মশাই, মেঘনাদবধের নরকবর্ণনাটা আপনি নিশ্চয়ই মিল্টন থেকে নিয়েছেন, না?’ মধুসূদন তখন একটু হেসে মহাকবি দান্তের নরকবর্ণনা থেকে কিছুটা আবৃত্তি করে শোনালেন, তারপর আবার মিল্টন থেকে নরকবর্ণনা শোনালেন, পরে বললেন, ‘এই দেখুন, মিল্টন যেখান থেকে ভাবগ্রহণ করেছেন, আমিও সেখান থেকে নিয়েছি। গঙ্গাজল যদি খেতে হয় তবে সাধ্য হলে হরিদ্বারের নির্মল জল খাওয়াই উচিৎ, কলকাতার গঙ্গার ঘোলা জল না খেয়ে।’

(২)
কুচবিহারের মহারাজার সঙ্গীতগুরু ও ‘গীত সূত্রধার’ রচয়িতা সেবার মাইকেলের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের অভিনয়ে শর্মিষ্ঠার চরিত্রটি নিয়েছিলেন। তিনি একদিন এসেছেন মাইকেলের বাড়িতে। সেদিন সেখানে দীনবন্ধু মিত্রও আছেন। দীনবন্ধুর সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে মধুসূদন বললেন, ‘ইনি আমাদের লাইনে আছেন।’ দীনবন্ধু ভাবলেন মাইকেল যেহেতু উকিল, তাই এনার পেশাও হয়তো তাই, সেজন্য তিনি বললেন, ‘ইনি কি ল-ইয়ার?’ মধুসূদন বললেন, ‘নাহে না, ইনি নাট্য শিল্পবিদ,আমাদেরই লাইন তো, কেমন হে!’

(৩)
পাইকপাড়ার রাজবাড়িতে একবার ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ব্যক্তিদের নিয়ে বিরাট সভা বসেছে। সভায় সকলের জন্যই সোনা ও রুপোর হুঁকো এল। মাইকেলের জন্যও এল একটা সোনার হুঁকো। মাইকেল রহস্য করে পণ্ডিতদের বললেন ‘ঠাকুরমহাশয়েরা, এ দাসের হুঁকোটি মারবেন না, আমার জাত গেলে আর জাত পাব না।’

(৪)
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ঢাকায় বেড়াতে গেলে সেখানকার কিছু যুবক তাঁকে একদিন আমন্ত্রণ জানায়। সেই বৈঠকে উপস্থিত মাইকেলকে তাঁরা বলেন, ‘আপন্র বিদ্যাবুদ্ধি মমতা প্রভৃতির দ্বারা আমরা যেমন মহাগৌরবান্বিত হই, তেমনি আপনি ইংরাজ হইয়া গিয়াছেন শুনিয়া আমরা ভারী দুঃখিত হই। কিন্তু আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়া আমাদের সে ভ্রম গেল।’

মাইকেল তখন উত্তরে বললেন ‘আমার সম্বন্ধে আপনাদের আর যে কোনো ভ্রমই হউক, আমি সাহেব হইয়াছি এ ভ্রমটি হওয়া ভারী অন্যায়। আমার সাহেব হইবার পথ বিধাতা রোধ করিয়া রাখিয়াছেন। আমি আমার বসিবার ও শয়ন করিবার ঘরে একখানি আরশি রাখিয়া দিয়াছি। এবং আমার মনে সাহেব হইবার ইচ্ছা যখন বলবৎ হয় তখন অমনি আরশিতে মুখ দেখি। আমি শুধু বাঙালি নহি। আমি বাঙ্গাল। আমার বাটি যশোহর।’

(ঋণ – শান্তা শ্রীমানী লিখিত ‘মনীষীদের রসিকতা’ গ্রন্থ) 

Developed by DXDasia