লুপ্তপ্রায় লোকখেলা ‘চাদর বানধনী’র একমাত্র জীবিত শিল্পী সুকলকে ঘিরে তথ্যচিত্র

‘আনন্দ’ ছবিতে রাজেশ খান্নার এক সংলাপ আজ প্রায় বাণীর পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। যার তরজমা করলে দাঁড়ায়, ‘আমরা সবাই তো রঙ্গমঞ্চের কাঠের পুতুল/ যাঁদের সুতো উপওয়ালার আঙুলে বাঁধা আছে।’ হিন্দিতে বাক্যদুটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে। সুতোয় পুতুল নাচাতে নাচাতে জীবনের রঙ্গ মঞ্চের ‘পাপেট’ হয়ে ওঠা এক মানুষের কথা উঠে এল শীলভদ্র দত্তের পরিচালনায় ‘সুকল, পাপেট হিমসেলফ’ তথ্যচিত্রে। সুকল একজন বিস্ময়কর শিল্পী। তথ্যচিত্র তাঁকে ঘিরেই, তিনি কেন্দ্রীয় চরিত্র। প্রযোজনা অনুসূয়া দত্তের, সম্পাদনা করেছেন মিলন দুয়ারি। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৩১তম সংস্করণে, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর প্রদর্শিত হল তথ্যচিত্রটি। (চাদর বানধনী খেলার শিল্পী সুকল মার্দি)

‘সুকল, পাপেট হিমসেলফ’ হল সুকল মার্দির গল্প। যে গল্প মিশে আছে মাটির কথা, গ্রাম বাংলার কথা, হারিয়ে যেতে বসা এক লোকখেলার কথা, শিল্পের কথা। লালমাটির দেশ, বীরভূমের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা সুকল একজন লোকক্রীড়া শিল্পী।

‘সুকল, পাপেট হিমসেলফ’ হল সুকল মার্দির গল্প। যে গল্প মিশে আছে মাটির কথা, গ্রাম বাংলার কথা, হারিয়ে যেতে বসা এক লোকখেলার কথা, শিল্পের কথা। লালমাটির দেশ, বীরভূমের এক প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা সুকল একজন লোকক্রীড়া শিল্পী। সে ‘চাদর বানধনী খেলা’ দেখায়। সাঁওতালি মাদল, ধামসার তালে তালে সুতোর পুতুল নাচানোই তাঁর পেশা, নেশা। তবে দিনগুজরানের জন্য চাষাবাদ করেন। পুতুল নাচাতে নাচাতে সুকল যেন নিজেও পুতুল হয়ে উঠেছেন। তাই হয়তো নির্মাতারা তথ্যচিত্রের নামে ‘পাপেট হিমসেলফ’ শব্দ দু’টি ব্যবহার করেছেন। বর্তমানে ‘চাদর বানধনী খেলা’ দেখাতে জানা এবং খেলা দেখানো একমাত্র জীবিত শিল্পী সুকল। (চাদর বানধনী খেলার শিল্পী সুকল মার্দি)

তথ্যচিত্রে সুকল বারবার তাঁর ‘গুরু’র কথা উল্লেখ করেছেন। এই ‘গুরু’ আদতে কোনও এক অগ্রজ, যাঁর কাছে সুকল মার্দি শিখেছিলেন ‘চাদর বানধনী খেলা’ দেখানো। বাবা-মার বকাঝকা উপেক্ষা করেও ‘গুরু’র সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়তেন সুকল। বাঁশি বাজাতে বাজাতে শিখে নিয়েছিলেন এই বিশেষ খেলা। কেবল শিখেই নেননি, অদ্যাবধি সে’খেলাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন, ফের উঠে দাঁড়িয়েছেন। অভাব, দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী হিসাবে থেকে গিয়েছে কিন্তু ছাড়েননি খেলা দেখানো…এই ‘চাদর বানধনী খেলা’কে বাঁচিয়ে রাখার সফরই ফুটে উঠেছে প্রায় এক ঘণ্টা আট মিনিটের তথ্যচিত্রে। তবে এই ডকুমেন্টারির মূল সুর বাঁধা আছে দিনযাপনের গল্পে। সেই কাহিনি বলায় একেবারে সফল পরিচালক। (চাদর বানধনী খেলার শিল্পী সুকল মার্দি)

সাঁওতাল যাঁরা বাংলার অন্যতম প্রাচীন বাসিন্দা, তাঁদের যাপনের গল্পই ধরা দিয়েছে অবলীলায়। সুকলের রোজনামচার সঙ্গে সঙ্গে যুগপৎ চলেছে সাঁওতাল অধ্যুষিত গ্রামের কথা। ধুলো মাখা পথ, চাষের জমি, খেতের আলপথ, নাম না-জানা ফুল, পাড়ায় মাছ ফেরি করতে আসা মানুষের কথা, বাড়িতে অতিথি এলে মাছ কেনা, এক সঙ্গে বসে হাঁড়িয়া খাওয়া, গ্রামে গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যা নামা, ঝুপ করে রাত নামা… আরও কত কী! একশো দিনের কাজ, কৃষিকাজে জলসেচের হালহকিকত একেবারে গ্রামীণ জীবন, জীবনের সমস্যাও যেন তথ্যচিত্রের উপাদান হয়ে উঠেছে। সুকলের জীবনের কথা হয়ে উঠেছে ‘চাদর বানধনী খেলা’র গান। সুকল নিজে সে’সব গান বাঁধেন সাঁওতালি ভাষায়। গোটা তথ্যচিত্র জুড়ে সাঁওতালি মাদলের সুর বাড়তি পাওনা। কথা বা শব্দার্থ না-বুঝতে পারা গানেও মাদকতা আছে, সুর-ছন্দের নেশা আছে। সাঁওতালি গানকে চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন নির্দেশক। গানগুলি পুরোদস্তুর মিশে গিয়েছে প্রতিটি দৃশ্যকল্পের সঙ্গে।

সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে সুকলের সারল্য। তাঁর স্ত্রী স্বামীর পরিচয় দিতে দিতে বলেন, ‘সুকল পুতুল নাচায়, পুতুল বানায়। আমায় ভালোবাসি। আমিও ভালোবাসি।’ বিয়ের কথায় তাঁরা দু’জনেই লজ্জা পান। পুতুল থেকে শুরু করে গরু-বদল-বাছুরদের আলাদা আলাদা করে নাম দিয়েছেন সুকল, সবাই যেন সুকলের পরিবারের সদস্য। দিনভর হাতুড়ি, ছেনি দিয়ে কাঠের পুতুল গড়ে রং করেন সুকল, তাঁর পরিবারের স্ত্রীলোকেরা তা সাজান। গোটা পরিবার আদ্যন্তভাবে জড়িয়ে গিয়েছে ‘চাদর বানধনী খেলা’র সঙ্গে।

গ্রামে গ্রামে মানুষ খোঁজ করেন, কেন খেলা দেখাতে আসে না সুকল, কবে আসবে সে। দুর্ঘটনা কাটিয়ে ওঠা, অভাব-পীড়িত সুকল পায়ে ঘুঙুর বাঁধেন, সাজিয়ে নেন ‘চাদর বানধনী খেলা’র ছোট্ট মঞ্চ, দেখে নেন সুতোয় টান পড়লে ঠিকঠাক পুতুল নড়ছে কি-না, সঙ্গে থাকে মাদল, ধামসা বাজানোর লোক আর তারপর ফের বেরিয়ে পড়েন খেলা দেখাতে।

গ্রামে গ্রামে মানুষ খোঁজ করেন, কেন খেলা দেখাতে আসে না সুকল, কবে আসবে সে। দুর্ঘটনা কাটিয়ে ওঠা, অভাব-পীড়িত সুকল পায়ে ঘুঙুর বাঁধেন, সাজিয়ে নেন ‘চাদর বানধনী খেলা’র ছোট্ট মঞ্চ, দেখে নেন সুতোয় টান পড়লে ঠিকঠাক পুতুল নড়ছে কি-না, সঙ্গে থাকে মাদল, ধামসা বাজানোর লোক আর তারপর ফের বেরিয়ে পড়েন খেলা দেখাতে। তাঁকে ঘিরে ভিড় জমে। তিনি সাঁওতালি গানের তালে তালে খেলা দেখান। ঘুঙুর বাঁধা পায়ে তাল দিতে দিতে তিনি নিজেও হয়ে ওঠেন ‘চাদর বানধনী খেলা’র এক উপাদান। যেন পুতুল। মাঠ ভর্তি সবুজ ফসলের মধ্যে দিয়ে নিজের পুতুলের সংসার নিয়ে এগিয়ে চলতে চলতে জীবনের রঙ্গ মঞ্চের পাপেট হয়ে ওঠেন তিনি। এখানেই গল্প-বলিয়ে ও গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রের সার্থকতা। সুকল ও তাঁর স্ত্রীর কথায় মেলে জীবনের সার-সত্য, ‘ভগবানের পুতুল মানুষ, মানুষের পুতুল ভগবান’। সহজ কথা, সরল কথা কিন্তু এ তো এক গভীর জীবন দর্শন। বইপত্রে নয়, এ দর্শনের পাঠশালা জীবনই, তা-ই সুনিপুনভাবে খুঁজে এনেছেন পরিচালক।

ডিজিটাল যুগ, ওটিটি সাম্রাজ্য বিস্তারের পরম পর্যায়ে দাঁড়িয়ে একুশ শতক। একে একে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন লোকক্রীড়াগুলি। পুরোপুরি লুপ্ত না হলেও ‘চাদর বানধনী খেলা’ এখন লুপ্ত-প্রায়, কোনও ক্রমে নিভু নিভু বাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন সুকল। তাঁর শিষ্য নেই, ছেলে বাইরে চাকরি করে, নাতি-নাতনিরা লেখাপড়া করে। সুকলের মতো তাঁর আগামী প্রজন্ম খেলা দেখাতে আসবে না। অচিরে এই বিশেষ ঘরানার সুতো পুতুল খেলা হারিয়ে যাবে। সুকলের মৃত্যুর পর কী হবে? তথ্যচিত্রে তিনি নিজে সে প্রশ্ন তুলেছেন। উত্তর জানা। তাও সাঁওতাল গ্রামের যাপনকথা ও ভালোবাসার শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার কাহিনিকে শীলভদ্র সার্থকভাবে মেলে ধরেছেন লেন্সে। বাংলায় এমন বহু শিল্প হারাতে বসেছে, একজন বা দু’জন মানুষ সেগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চালাচ্ছেন পথে-প্রান্তরে। সেই লড়াই চালানো সব্বার প্রতিনিধি শীলভদ্র দত্তের এই তথ্যচিত্র।

Written by