
আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা, মাঝে মাঝে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি আর বৃষ্টির জল পেয়ে বাড়তে থাকা চারাগাছের তাকালে বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতা না উল্টেও বলা যায় এখন বর্ষাকাল। আর প্রচলিত বিশ্বাস বলে বর্ষার আষাঢ় মাসেই নাকি ঋতুমতী হয় বসুন্ধরা, তাই আষাঢ় আসলে উর্বরতার মাস। যে মাস প্রকৃতিকে করে তোলে আরও সুজলা সুফলা। বিজ্ঞান বলে মাটির উর্বরতা অনেকটাই নির্ভর করে তার ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। অর্থাৎ এক একটি নির্দিষ্ট জায়গার আবহাওয়া, জলবায়ু এক এক ধরনের ফসল উৎপাদনের জন্য উপযোগী। তবে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ যেন মাটিকে বলে আরও আরও অনেক ফসল চাই, উৎপাদন বাড়াও।

শুধু সার নয়, কীটনাশক হিসাবেও জৈব প্রযুক্তির হাতই ধরেছেন তারা। জানা গেল, এই সার, কীটনাশক ইত্যাদি প্রস্তুতির প্রশিক্ষণ তারা পান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার (DRCSC) থেকে। এছাড়াও চাষের উপযোগী বিভিন্ন সরকারি সাহায্যও পান গ্রামের মহিলারা।
মানুষের এই চাহিদার চাপে ক্রমশ মাটিতে মিশছে নানা ধরনের রাসায়নিক। ধরিত্রী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক উর্বরতা। ঠিক এমন সময়েই দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার প্রান্তিক অঞ্চলে মাটিকে ভালোবেসে, তাতে জৈব সারের প্রয়োগের মাধ্যমে লবণাক্ত জমিতে সোনার ফসল ফলাচ্ছেন গ্রামের মেয়েরা। তাদের হাতের যত্নে বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী অঞ্চলে সাগরের হাওয়ায় ঢেউ খেলে যায় ধানক্ষেতে। মাঠ জুড়ে বিরাজ করে স্বর্ণচূড়, দুধেশ্বর, পাটনাই, ধনুর্বান ইত্যাদি ধান। এমনকি গোবিন্দভোগের মতো সুগন্ধি চালও উৎপাদিত হয় এই অঞ্চলে।
কিন্তু যে অঞ্চল বঙ্গোপসাগরের প্রায় তীর ঘেঁষে, সেখানে ধানচাষের জন্য কি আলাদা কোনো প্রস্তুতি প্রয়োজন? এই বিষয়ে সুন্দরবন জি প্লটের মহিলা কৃষক অমৃতা দাস বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “আমাদের এখানকার জমি মূলত লবণাক্ত, তাই এই মাটির উপযুক্ত ধানই এখানে চাষ হয়। কিন্তু, কিছু কিছু জমি আছে যেখানে লবণের পরিমাণ কিছুটা বেশি, সেখানে জৈবসার প্রয়োগ করে মাটিকে ধান চাষের উপযুক্ত করে তুলে তারপর সেখানে চাষাবাদ হয়।” তিনি আরও জানান, এই জৈবসার মূলত গ্রামের মহিলারাই তৈরি করেন। জমির জন্য গোবর সার, ভার্মি কম্পোস্ট প্রভৃতি তৈরি করে তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী তা জমিতে ছড়িয়ে শুধু ধান নয়, শাক-সবজি আরও নানা ফসল তারা উৎপাদন করেন।
কিন্তু যেখানে রাসায়নিকের ব্যবহার প্রায় সর্বত্র সেখানে চাষাবাদের ক্ষেত্রে জৈব সারের ওপরেই এত নির্ভরতা কেন? এই প্রসঙ্গে অমৃতা জানাচ্ছেন, জৈব সার ব্যবহার করলে জমি দূষিত হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না, উপরন্তু কম খরচে ফসল ভালো হয় এবং রাসায়নিক মুক্ত ফসলে খাদ্যের গুণমানও বজায় থাকে। তাই, জৈব সার তৈরির উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামের মহিলারাই সার তৈরি করেন। শুধু সার নয়, কীটনাশক হিসাবেও জৈব প্রযুক্তির হাতই ধরেছেন তারা। জানা গেল, এই সার, কীটনাশক ইত্যাদি প্রস্তুতির প্রশিক্ষণ তারা পান ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার (DRCSC) থেকে। এছাড়াও চাষের উপযোগী বিভিন্ন সরকারি সাহায্যও পান গ্রামের মহিলারা।

এই অঞ্চলে বন্যা হলে চাষের জমিতে ঢুকে পড়ে সমুদ্রের নোনাজল, বেড়ে যায় জমির লবণাক্ততা। তখন চুন, সর্ষের খোল প্রভৃতি জমিতে ছড়িয়ে লবণাক্ততা কমিয়ে আবার চাষের উপযোগী করে তোলা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের আয়লা ঝড় বদলে দিয়েছে সুন্দরবনের আর্থ-সামাজিক চিত্র।
মাঠের কঠোর পরিশ্রমসাধ্য এই কাজ যা মুখ্যত পুরুষপ্রধান হিসাবেই পরিচিত, সেখানে এই অঞ্চলের বহু মহিলা প্রত্যক্ষভাবে চাষের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। এই বিষয়ে আরেকজন মহিলা কৃষক সুছন্দা ভুঁইয়া বঙ্গদর্শনকে জানান, “আমাদের এখানে আমার পরিবারই হোক বা আমাদের পাড়ার অন্য কোনো পরিবার, কোথাও কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ভাগ নেই, প্রকৃতির অবস্থা বুঝে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পরিবারের সকলে মিলেই আমরা চাষের কাজ করি।”
সুন্দরবন অঞ্চলে চাষাবাদের ক্ষেত্রে সবথেকে বড়ো চ্যালেঞ্জ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে মোকাবিলা। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী এই অঞ্চলকে মাঝেমধ্যেই সহ্য করতে হয় ঝড়ের তাণ্ডব, সেই সময় ফসলের ক্ষতি হয় অনেকটা, এছাড়াও এই অঞ্চলে বন্যা হলে চাষের জমিতে ঢুকে পড়ে সমুদ্রের নোনাজল, বেড়ে যায় জমির লবণাক্ততা। তখন চুন, সর্ষের খোল প্রভৃতি জমিতে ছড়িয়ে লবণাক্ততা কমিয়ে আবার চাষের উপযোগী করে তোলা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের আয়লা ঝড় বদলে দিয়েছে সুন্দরবনের আর্থ-সামাজিক চিত্র। সুন্দরবনের ভূমিপুত্র রাজু গোপাল মণ্ডলের কাছে জানা গেল, “আয়লার তাণ্ডব সুন্দরবনের যে পরিমাণ ক্ষতি করেছে তারপর ১৫টা বছর কেটে গেলেও সেই ক্ষতিপূরণ সম্ভব হয়নি। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই আগে মুখ্যত কৃষিকাজ এবং মাছচাষের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু আয়লা বদলে দেয় মাটির চরিত্র, ফলে শুধু চাষবাস করে এখন আর দিনযাপন করা সম্ভব হয় না, গ্রামের বেশিরভাগ পুরুষই বহির্মুখী হতে বাধ্য হয়েছে। তাই গ্রামীণ চাষবাসে মহিলারা আরও বেশি করে মনোনিবেশ করেছেন।”
ধান চাষ প্রধান অন্য জেলার সঙ্গে সুন্দরবনের ধান চাষ-এর অন্যতম পার্থক্য ফসল বিপননের ক্ষেত্রে। অন্যান্য জেলায় যেখানে বাজারজাত করণের উদ্দেশ্যেই চাষ করা হয়, সেখানে সুন্দরবন অঞ্চলের বেশিরভাগ ফসল উৎপাদিত হয় কৃষক পরিবারের সারা বছরের খোরাক হিসাবে। পারিবারিক প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ফসল তারা বাজারে বিক্রি করেন। সেই উদ্বৃত্ত ফসল বিক্রি করে কেমন উপার্জন করতে পারেন তারা? জানা গেল, বিভিন্ন প্রকার ধানের বিক্রয়মূল্য আলাদা আলাদা। যেমন দুধেশ্বর ধানের মূল্য বস্তা প্রতি প্রায় ১৫০০ টাকা। আবার গোবিন্দভোগ চাল বস্তা প্রতি ২০০০ টাকারও বেশি মূল্যে বিক্রি হয়, তবে এই ধরনের সুগন্ধি চাল মূলত বিপণনের উদ্দেশ্যেই চাষ করা হয় বলে সুছন্দা জানালেন।

প্রকৃতিরই মানবরূপ যেন নারী, যে জল দান করে, ফল দান করে, ভরিয়ে তোলে সব অভাব। তবে সেই নারীকেই বারবার সহ্য করতে হয় নানা রকম নির্যাতন ঠিক যেমন প্রকৃতির ওপরেও চলছে লাগাতার অত্যাচার। কিন্তু এই নির্যাতনের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে বাংলার দক্ষিণ প্রান্তে মাটিকে ভালোবেসেই মাঠে মাঠে সোনালি ফসল ফলাচ্ছেন মেয়েরা। নিজের এবং পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পরিশ্রমের ফসল বিভিন্ন বাজারের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে নানা প্রান্তের ঘরে ঘরে। ফলে পারিবারিক উপার্জনের ক্ষেত্রেও তারা হয়ে উঠছে পুরুষের পরিপূরক। শহুরে সভ্যতার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে জল জঙ্গলে ভরা সুন্দরবন রচনা করে চলেছে এক অন্য সভ্যতার গল্প, যেখানে চার্লস ডারউইনের অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম তত্ত্ব জীবনবিজ্ঞানের বইয়ের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে আছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপনে।
__________________
ছবি সৌজন্যে: অমৃতা দাস

