
গরমে নিজের সঙ্গে পারিপার্শ্বিকের খেয়াল রাখুন
বছর কয়েক আগের কথা। এরকমই এক তীব্র গরমের দাবদাহে সর্বত্রই যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, পুরুলিয়ার মালডি গ্রামের প্রথম মহিলাদের ছৌ দলের মৌসুমি চৌধুরী, সড়লা মুড়া, শ্যামলী চৌধুরীর মতো ছৌ শিল্পী এবং রাজীব মুড়া সুমন মাহাতো, কণিকা মাহাতোর মতো স্কুল পড়ুয়ারা অভিনব উদ্যোগ নিয়েছিল। তারা অবসর সময়ে গাছে গাছে মাটির পাত্র ঝুলিয়ে পাখিদের জল খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে, সবার নজর কেড়েছিল।

আমাদের চেনা পরিবেশ অনেকটা বদলে যেতে শুরু করেছে। এই বদলের গোড়া পত্তন হয়েছিল বহুদিন আগেই, কিন্তু তার প্রকাশ বা অবস্থানের পূর্ণতা বোধহয় আমরা এখন অনেক বেশি প্রত্যক্ষ করতে পারছি। বিশ্ব উষ্ণায়নের কুফল স্বরূপ নানাবিধ রোগব্যাধি, মানব দেহের জন্য হানিকারক জীবাণুর বাড়বাড়ন্ত, অযাচিত ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা, খরা আমাদের যাপনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে দিনে দিনে। সেই লড়াইটা কীভাবে জীবজন্তু ও মানুষ নিজের নিজের মতো করে লড়ে চলেছে তারই একপ্রকার নিদর্শন হচ্ছে শৌনক সেন-এর ‘অল দ্যাট ব্রিদস’ (All That Breathes – 2022)। অনেকেই দেখেছেন ছবিটি। দিল্লির প্রত্যন্ত গ্রাম ওয়াজিরাবাদে একটি পরিত্যক্ত বেসমেন্টে থাকেন দুই ভাইবোন। মহম্মদ সৌদ এবং নাদিম শাহজাদ। তাঁদের অদ্ভুত নেশা। আহত পাখি, বিশেষত কালো চিল উদ্ধার করে শুশ্রূষা করেন তাঁরা। ধ্বংসের আবহেও প্রতিটি জীবন গুরুত্বপূর্ণ, শৌনক সেনের এই তথ্যচিত্র বারবার সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমাদের আশেপাশেও এরকম অনেক মহম্মদ ও নাদিম আছেন। আছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তবু, শুধু তাদের ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে কি? পরিস্থিতি অনুযায়ী বুঝে নিতে হবে নিজেদের সামাজিক ও মানবিক দায়দায়িত্বগুলো।
গরমের সময় কুকুরকে বেশি করে জল খাওয়ান। অসুস্থ হলে ওআরএস দিন। ফ্ল্যাটের তলায় কিংবা গ্যারাজে পথকুকুরদের আশ্রয় দিন। বাড়ির সামনে জলের পাত্র রাখুন। কুকুর অসুস্থ হয়ে পড়লে ঠান্ডা জলে স্নান করান। হিটস্ট্রোকের লক্ষণ দেখলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় গত কয়েক দিন ধরেই তাপপ্রবাহ চলছে। কলকাতায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি পার করেছে। আগামী ক’দিন বা গোটা গ্রীষ্মজুড়ে এই পরিস্থিতির খুব একটা হেরফের হবে না—এমনটাই জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। এতে চিন্তা বাড়ছে পশুপ্রেমীদের। যদিও আগের থেকে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। এই মাত্রাতিরিক্ত গরমে অনেকেই বাড়ির বারান্দা, উঠোন বা দরজার বাইরে একটা পাত্রে জল রেখে দেন। কুকুর-বেড়াল বা পাখিদের জন্য।
তবু, এই মাত্রাতিরিক্ত গরমের দাপট সহ্য করতে না পেরে বহু পথকুকুর অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আক্রান্ত হচ্ছে হিটস্ট্রোকেও। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন পশুপ্রেমীরা। এই গরমে বাড়ির পোষ্যদের সমস্যা না হলেও রাস্তার কুকুরদের অবস্থা রীতিমতো শোচনীয়। গরমের সময়ে মানুষের শরীর থেকে ঘাম বেরিয়ে যায়। এতে মানবদেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে পথকুকুরদের ক্ষেত্রে এটা হয় না। সে জন্য তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে।

গরমে শহরের অনেক পুকুর, ডোবা, জলাশয় শুকিয়ে যায়। পথকুকুর বা বিড়ালরা ঠিকমতো জল খেতে পায় না। পশুপ্রেমীরা পথকুকুরদের জন্য রাস্তায় জলের পাত্র রাখলেও মশার ভয়ে অনেকে তা ফেলে দেন। পর্যাপ্ত জল না পাওয়ায় পথকুকুরদের ডিহাইড্রেশন দেখা যায়। সেই জন্য গরমে কুকুররা খুব তাড়াতাড়ি অসুস্থ হয়ে পড়ে। জল বা খাবার দূরে থাক, তাপপ্রবাহে দগ্ধ রাস্তাঘাটের জন্য আশ্রয় নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয় পথের অবলা প্রাণীদের। পারলে নিজের বাড়ির গ্যারাজ বা ছায়াযুক্ত শীতল জায়গায় ওদের থাকতে দিন।
পশু চিকিৎসকদের পরামর্শ, দিনের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তাতে পথপশুদের সঙ্গে বাড়ির পোষ্যরাও যে কোনও সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। এ নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার। গরমের সময় কুকুরদের শরীরে ডিহাইড্রেশন হলে প্রথমে তারা ঝিমোতে শুরু করে। মলের সঙ্গে রক্ত বেরোয়। নাক-মুখ দিয়েও রক্ত বেরতে পারে। এগুলি সবই হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণ। এ রকম হলে সঙ্গে সঙ্গে ওআরএস দিতে হবে। বেশি করে জল খাওয়াতে হবে। যতটা সম্ভব ঠান্ডা জায়গায় রাখতে হবে তাদের। বাড়িতে মাছ রাখলে অ্যাকোয়ারিয়ামের জল নিয়মিত পাল্টাতে হবে। জলের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে হবে।

রাজ্যে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রিতে পৌঁছাতে আর হয়তো বেশি বছর সময় লাগবে না। গাছপালা তো বটেই, চারদিকে পুকুর খালবিল কমে আসছে। যেকোনো মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রায় অবসাদ থেকে নানাবিধ শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। তাই নিজেদের সঙ্গে পরিবার-বন্ধুবান্ধবদের ও পরিবেশের খোঁজখবর নিন। এটুকু আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
