সত্যজিৎ নন, বাংলা পাঠককে প্রথম ভিনগ্রহী চিনিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনের কড়া ‘অংক স্যার’

শিক্ষক, লেখক জগদানন্দ রায়ের কথা

‘জগদানন্দ বিলান জ্ঞান/ গিলান পুঁথি ঘর-জোড়া।/ কাঁঠালগুলান কিলিয়ে পাকান,/ গাধা পিটিয়ে করেন ঘোড়া’…

রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ছড়া বেঁধেছেন মানুষটাকে নিয়ে। শান্তিকেতনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন তিনি। পায়ে পুরোনো চটি, মুখে চুরুট। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, দোহারা চেহারা, মোটা কাঁচের চশমায় আচ্ছাদিত, চোখে ঈষৎ বিরক্তির আভাস। আশ্রমের ছেলেরা যমের মতো ভয় পায় তাঁকে। অসম্ভব কড়া ধাতের মানুষ। গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করার জন্যই তো তাঁর নাম। তিনি, জগদানন্দ রায়। 

রবীন্দ্রনাথ তখন ‘সাধনা’ পত্রিকার সম্পাদনায় মগ্ন। পত্রিকায় পাঠকদের থেকে বিজ্ঞান বিষয়ক নানা প্রশ্ন আসে। সে’সব প্রশ্নের উত্তরও অযাচিতভাবেই মিলে যায়, মাঝে মাঝে। কোনো এক অচেনা পাঠকই অত্যন্ত সহজসরল ভাষায় লিখে পাঠাচ্ছেন। কে এই ব্যক্তি? খুঁজতে খুঁজতে কবি আবিষ্কার করলেন জগদানন্দ রায়কে। রুগ্ন-অভাবী মানুষটা প্রথমে শিলাইদহের জমিদারি দেখবার দায়িত্ব নেন। সেরেস্তায় বসতেন। কিন্তু কবি বুঝেছিলেন, শুধুমাত্র হিসেবের খাতায় ওঁকে আটকে ফেললে, মৃত্যু হবে এক স্বভাবশিক্ষকের। সুতরাং, শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরেই জগদানন্দ যোগ দিচ্ছেন শিক্ষক হিসেবে। হিসেবের খাতা থেকে এই উত্থান রামপ্রসাদের কথা মনে পড়িয়ে দিতে পারে বৈকি!

জগদানন্দ অবশ্য ‘ভাবের মানুষ’ নন। তিনি পড়ানোর পাশাপাশি লেখালিখি করেন বিজ্ঞান নিয়ে। বাংলাভাষায় বিজ্ঞানলেখকের সংখ্যা বড়োই কম। শিক্ষকতার পাশাপাশি জগদানন্দ লিখে চলেছেন একের পর এক প্রবন্ধ। সেইসব প্রকাশিত হচ্ছে ‘ভারতী’, ‘প্রবাসী’, ‘তত্ত্ববোধিনী’, ‘বঙ্গদর্শন’, ‘সাহিত্য’, ‘প্রদীপ’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘শিশুসাথী’, ‘মানসী’, ‘ভাণ্ডার’-এর মতো পত্রিকায়। প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা, বিবিধ বিষয় নিয়ে। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর কলমেই পাওয়া যাবে জগদানন্দ সম্বন্ধে অবিমিশ্র প্রশংসা, “আজকাল বাঙ্গালা মাসিক সাহিত্যে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ দেখিলেই পাঠক বুঝিয়া লন যে, প্রবন্ধের নীচে জগদানন্দবাবুর স্বাক্ষর থাকিবে।”

অনুসন্ধিৎসু পাঠককে কখনো ফেরাননি তিনি। পূর্ববঙ্গের এক বালক ‘হ্যালির ধূমকেতু’ নিয়ে প্ৰশ্ন করেছিল তার বাবাকে। তিনি সাধ্যমতো বোঝালেও সন্তুষ্ট হল না ছেলেটি। অতঃপর পিতৃদেবের নির্দেশেই সে চিঠি লিখল জগদানন্দকে। এত বড়ো একজন লেখক পুঁচকে খোকার চিঠির উত্তর দেবেন, কল্পনারও অতীত। কিন্তু জবাব এল দ্রুত। দু’পাতা লম্বা চিঠিতে যত্ন নিয়ে জগদানন্দ মেটালেন বালকের কৌতূহল। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথকে এনট্রান্সের জন্য পড়াচ্ছিলেন তিনি। ‘রথী’-র অন্য শিক্ষকরা সবাই পড়ান ইংরেজিতে, সুতরাং তিনি খানিক হীনমন্যতার শিকার হয়েই ইংরেজিতে বোঝাচ্ছিলেন। বোঝাতে বোঝাতে অজস্র ভুল হয়ে যাচ্ছিল তাঁর। ‘বিজ্ঞান’ তাঁর নখদর্পণে থাকলেও বিজাতীয় ভাষাটি সড়গড় ছিল না। রবীন্দ্রনাথ-এর নজরে পড়ল ব্যাপারখানা। জগদানন্দও বুঝতে পারেন ভুল। তিনি আজীবন পড়িয়েছেন মাতৃভাষাতেই।একই সঙ্গে মানুষটা কঠোর ও কোমল। রাশভারী এবং আমুদে। হাতে-কলমে বিজ্ঞানের নানা পরীক্ষা দেখান, গভীর রাত্রে ছাত্রদের নিয়ে যান আশ্রমের মাঠে। টেলিস্কোপ হাতে চেনান গ্রহনক্ষত্র। ছাত্রদের কেউ অন্যায় করলে বন্ধ করে দেন একবেলা আহার। কিন্তু, না খেয়ে থাকেন নিজেও। সন্ধ্যাবেলা, মুড়িশুড়ি দিয়ে ভূতের গল্প শুনতে বসে ছেলেরা। কথক জগদানন্দ। গা-ছমছমে গল্প বলাতেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। 

মঞ্চে নামলেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ অংক স্যার হয়ে ওঠেন ছেলেদের ‘লক্ষ্মীপেঁচা’। রবিবাবুর একাধিক নাটকে তিনি দাপিয়ে অভিনয় করেছেন। এসরাজ-বেহালায় মিষ্টি হাত, বাংলা ভাষায় প্রথম ভিনগ্রহী নিয়ে গল্পও লিখেছিলেন জগদানন্দ। ‘শুক্র ভ্রমণ’, প্রকাশিত হয়েছিল ‘ভারতী’ পত্রিকায়। এর প্রায় ছয় দশক পরে প্রকাশ পাবে সত্যজিৎ রায়ের ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। কিন্তু উনিশ শতকে বসে সে লেখা আজও বাঙালি পাঠককে বিস্মিত করবে। 

কুসংস্কার-অন্ধবিশ্বাসের দেশে বিজ্ঞানচেতনার নিশান উড়িয়েছিলেন জগদানন্দ। লিখেছিলেন মাতৃভাষায়। আমজনতার মাঝে বিজ্ঞানকে ছড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্যেই। নৈহাটিতে বঙ্গীয় সাহিত্য সমিতির একটি সভায় বলেছিলেন, “বিজ্ঞানের শিক্ষা যখন আমাদের দেশের সর্ব্বসাধারণের অস্থি-মজ্জায় আশ্রয় গ্রহণ করিবে, তখন বুঝিব দেশে বিজ্ঞানের চর্চা সার্থক হইয়াছে।”

কৃষ্ণনগরের এক অজানা পল্লীতে রবীন্দ্রনাথ খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর যোগ্য সহযোদ্ধাকে। দূরদর্শীর দৃষ্টি কখনো ভুল হয় না। কিন্তু, আমরা তাঁকে চিনতে পেরেছি কি আদৌ? সার্ধ শতবর্ষ পেরিয়ে যাওয়া মানুষটাকে নাহলে ভুলে যেতে পারতাম এভাবে?

তথ্যঋণ: প্রোফেসর শঙ্কুরও আগে, শুভাশিস চক্রবর্তী, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৬ অক্টোবর, ২০১৯। 

 

Developed by DXDasia