
পরীক্ষার প্রশ্নে তিনিই প্রথমবার ‘অথবা’ এনেছিলেন
একটা রাস্তা, একটা কলেজ, দুটো সভাগৃহ আর দুটো হলঘর — নতুন প্রজন্ম কি আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বলতে এটুকুই বোঝে? যদিও ক্যুইজে প্রশ্ন এলে উত্তর তৈরি থাকে ঠোঁটের গোড়ায়। ‘বাংলার বাঘ’ কাকে বলা হয়? স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে। তবে এই নয়া বাংলায় আরও একজন ‘বাংলার বাঘ’ জুটেছেন। তাঁর প্রসঙ্গ টেনে লেখার বিড়ম্বনা ঘটাব না। আজ বাংলার নবজাগরণের একজন সৎ, সাহসী, নির্ভীক শিক্ষক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিনে বলব তাঁরই কথা।
আশুতোষ মুখুজ্জ্যে মানেই গণিতশাস্ত্র। সেখানে অসাধারণ ব্যূৎপত্তি ছিল তাঁর। স্কুল জীবনেই ‘কেমব্রিজ মেসেঞ্জার অফ ম্যাথামেটিক্স’-এ তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে উচ্চতর গণিত নিয়ে প্রায় কুড়িটি মূল্যবান প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন, যেগুলি প্রকাশিত হয় বিভিন্ন গবেষণামূলক পত্রিকায়। কলেজে পড়বার সময় অঙ্কে দক্ষতার জন্য অধ্যাপক বুথ সাহেবের প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ক্যালকাটা ম্যাথামেটিকাল সোসাইটি’। অবশ্য সাধারণ মানুষ তাঁকে অঙ্কবিদ হিসেবে মনে রাখেনি, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শিক্ষাবিদ হিসেবেই চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
তবে যেদিকটি সবচেয়ে অনালোচিত, তা হচ্ছে বাংলা ভাষা এবং তার ব্যবহারে আশুতোষবাবুর ভূমিকা। বাংলা ভাষাকে মর্যাদার সঙ্গে দেখা এবং বুক ঠুকে শিরদাঁড়া টানটান রেখে যেন সব্বাই বলতে পারেন, তিনি বাঙালি। এই বাংলা নিয়ে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের চিন্তাভাবনার নমুনা লিখে গিয়েছেন দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ‘আশুতোষ-স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে। আশুতোষবাবুকে চিনতে হলে এ বই পড়া অবশ্যই জরুরি। দীনেশচন্দ্র লিখছেন, “চৌদ্দ পনের বৎসর যাবৎ এমএ পরীক্ষায় বাঙ্গলাকে চালাইবার জন্য আমি তাঁহাকে অনুরোধ করিয়া আসিতেছিলাম। তিনি তাঁহার বিরাট গোঁপ ফুলাইয়া গর্জন করিয়া বলিতেন, ‘তোমার বাঙ্গলা আবার একটা ভাষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতম শ্রেণীতে তাহাই পড়াইতে হইবে— শোন কথা!’ …হঠাৎ ৪/৫ বৎসর পূর্বে একদিন আমার ডাক পড়িল। তিনি হাসিতে হাসিতে বলিলেন, ‘দীনেশ বাবু, এইবার এমএ-তে বাঙ্গলা ভাষা চালাইব, সিলেবাস তৈরি করুন…।’ আমি বিস্ময়ের সহিত বলিলাম ‘হঠাৎ মত পরিবর্তনের কারণ কি?’ তিনি হাসিতে হাসিতে উত্তর করিলেন, ‘ঢাল নাই তরোয়াল নাই— যুদ্ধ করতে যাবেন! আপনাকে দিয়া এই ৪/৫ বৎসর যাবৎ যে আমি বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্যের ইংরেজি ইতিহাস লিখাইয়াছি, বঙ্গসাহিত্য পরিচয় ও বৈষ্ণব সাহিত্যের ইতিহাস লিখাইয়াছি… এই বইগুলি না থাকিলে এমএ পরীক্ষার্থীদের কি পড়াইব? আপনারা যতক্ষণ সোরগোল করিয়াছেন, আমি ততক্ষণ জমি তৈরি করিয়াছি।”
অন্যান্য কাজের চেয়ে আশুতোষ বিখ্যাত এবং বিতর্কিত হয়ে উঠেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন। পরীক্ষা ব্যবস্থায় আনলেন আমূল পরিবর্তন। ছাত্রছাত্রীরা আজও ঋণী হয়ে আছে তাঁর কাছে। বাংলা এমএ-সহ বহু নতুন বিভাগ তো চালু করেছিলেনই, সেইসঙ্গে টানা আট বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ছিলেন। পরীক্ষার প্রশ্নে তিনিই প্রথমবার ‘অথবা’ এনেছিলেন। দীনেশচন্দ্রের বইটি পড়লে জানা যায়, তার আগে যা প্রশ্ন আসত সবই লিখতে হত পরীক্ষার্থীকে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সেই প্রথম দীর্ঘদিনের নিয়মকে ভেঙে ফেলেছিলেন। আর নিয়ম করে দিলেন, পড়ু্য়াদের জন্য করা প্রশ্ন, প্রশ্নকর্তার পাণ্ডিত্য পরিমাপের জায়গা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ফেল করানোর কারখানাও নয়। পাশের হার বাড়তে লাগল হু-হু করে। ছাত্রছাত্রীদের মুখে হাসি ফুটল। সেদিন পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মানচিত্রে গর্বের সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
নিশ্চিতভাবে একেই হয়তো বলে সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা একজন পরিপূর্ণ মানুষ। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর এক স্মরণসভায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, “আজ যে বাংলা ভাষায় কথা বলছি সে জন্য আমরা স্যার আশুতোষের নিকট কৃতজ্ঞ… তিনি বাংলা ভাষাকে সে যুগে ইংরেজির সমান মর্যাদা দেন।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ১৯০৬ সালে। দুইবার উপাচার্যের পদ পেয়েছিলেন। ‘নৃবিদ্যা’, ‘ব্যবহারিক মনোবিজ্ঞান’, ‘ফলিত রসায়ন’-এর মতো বেশ কিছু নতুন বিষয়ে পাঠদান শুরু হয় তাঁর উদ্যোগে। আমাদের এক এবং একমাত্র বাংলার বাঘকে যেন আমরা ভুলে না যাই। কারণ বাংলা যতদিন তার গর্ব নিয়ে বেঁচে থাকবে, ততদিন প্রত্যেক বাঙালির হৃদয়ে গাঁথা থাকবে স্যারের নাম।
তথ্যসূত্রঃ
আশুতোষ-স্মৃতিকথা- দীনেশচন্দ্র সেন (পারুল প্রকাশনী)
এবং
শুভাশিস মৈত্রের “পরীক্ষার প্রশ্নে ‘অথবা’ চালু করেছিলেন কৃত্তিবাস, ভারতচন্দ্রের বংশদ্ভূত আশুতোষ মুখোপাধ্যায়” নামক নিবন্ধ (বঙ্গদর্শন আর্কাইভ)
