বীজ-গয়নার আবিষ্কারক আজো বুনছেন নতুন গয়না

পাঁউরুটি বিক্রেতা থেকে হস্তশিল্পী হয়ে ওঠার গল্প

খোয়াই-এর সোনাঝুরি হাটে গেলে আজো চোখে পড়বে মানুষটিকে। দেখে বয়স বোঝা মুশকিল। ষাটও হতে পারে, সত্তর হওয়াও অসম্ভব নয়। রকমারি গয়নার পসরা সাজিয়ে বসেছেন মাটিতে। একদিকে দাঁড় করানো প্লাইউডের বোর্ড। সেখানে ঝুলছে হাজারো ভ্যারাইটির কানের দুল। আর মাটিতে বিছানো কাপড়ে সারি সারি গলার হার, মাথার কাঁটা ও আরো কত কী। এমনিতে এসব সোনাঝুরি হাটে এলে হামেশাই চোখে পড়ে। কিন্তু এই মানুষটির ব্যাপার আলাদা। তাঁকে একডাকে চেনেন সোনাঝুরি হাটের প্রায় সমস্ত স্থানীয় শিল্পীরাই। অনেক স্থায়ী খরিদ্দারও আছে তাঁর। সোনাঝুরির হাটে এলে সাত্তারদার কাছে তাঁদের আসা চাই-ই।

কেন? বোলপুরের এই হাটেই জন্ম নেওয়া বিখ্যাত বীজ-গয়নার আবিষ্কারক যে তিনিই। কৃষ্ণচূড়া, চন্দন, সুবাবুল, বনশিম, কুঁচ, তেঁতুল, টাইগার সিড, লাটা বীজ ও আরো কত ফলের বীজ দিয়ে বুনেছেন গলার হার, কানের দুল। শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতীর আবাসিক, পড়ুয়া, বাসিন্দারা তো বটেই, সেই গয়নার প্রেমে মজে আছেন গোটা বাংলারই মানুষ।

সাত্তার আনসারি। বাড়ি শ্যামবাটির ফুলডাঙা গ্রামে। গত আঠেরো বছর ধরে তৈরি করছেন বীজের গয়না। বীজ যতই ছোটো হোক, তাকে ঠিক আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারেন মানুষটি। আশ্চর্য নৈপুণ্যে বুনে ফেলেন নতুন নতুন গয়না। কিন্তু বীজ-গয়নার আবিষ্কারকের স্বীকৃতি একা নিতে তিনি নারাজ। প্রায় উনিশ-কুড়ি বছর আগে কলাভবনের প্রাক্তন ছাত্রী, প্রয়াত শ্যামলী খাস্তগিরের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সোনাঝুরির এই হাট। স্থানীয় মানুষ, বিশেষ করে মহিলারা যাতে নানান হস্তশিল্প, বাড়িতে তৈরি খাবার বিক্রি করতে পারে—তার জন্যই মূলত এই হাটের পরিকল্পনা করেছিলেন শ্যামলী খাস্তগির। তখন এই হাটে পাঁউরুটি ও টুকটাক খাবার নিয়ে বসতেন সাত্তার। যৎসামান্য রোজগার। তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। একদিন শ্যামলী তাঁদের কয়েকজনকে প্রস্তাব দিলেন হাতের তৈরি গয়না বা অন্যকিছু বিক্রি করার। কিন্তু কেউই তো হাতের কাজ জানেন না, শেখেনওনি। শ্যামলী খাস্তগির তাঁদের সাহস জুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একদিন এই হাট খুব বড়ো হবে। হস্তশিল্পী হিসেবে ভাগ্যের চাকাও বদলে যাবে মানুষগুলোর।

সেই শুরু। নতুন কিছু করতে হবে। তার ওপর পুঁজিও কম। সাত্তার আনসারি তাই ঠিক করলেন বীজের গয়না বানাবেন। বীজ জোগাড় করা তাঁর পক্ষে তুলনায় সহজ। কিন্তু আগে কখনো বীজের গয়না দেখেননি, বানানওনি। কিন্তু, সাত্তার নিজে নিজেই শিখলেন বীজ ফুটো করার কায়দা। তারপর শুরু হল বোনার কাজ। কয়েকদিনের মধ্যেই জন্ম নিল নানান ধরনের বীজের গয়না। অভিনবত্বের কারণে সেইসব বিক্রিও হতে লাগল বেশ। সাত্তারকে দেখে উৎসাহী হয়ে উঠলেন আরো একজন। তাঁদের দেখে অনেকে। এইভাবে বনপুকুরডাঙা, বল্লভপুকুরডাঙার বেশ কয়েকজন স্থানীয় মানুষরা মিলে শুরু করলেন বীজের গয়না তৈরির কাজ। কিছু গয়না হয়তো সাত্তারেরই আবিষ্কার, কিছু গয়না অন্য শিল্পীর। এই শিল্পে আর বিভাজন চান না তিনি।

সোনাঝুরি হাটে বিক্রিবাটা ভালো দেখে সাত্তার চলে এসেছিলেন কলকাতার হস্তশিল্প মেলায়। তখনো তাঁর রেজিস্ট্রেশন হয়নি হস্তশিল্প শিল্পী হিসেবে। তা সত্ত্বেও মেলায় বসতে অবশ্য অসুবিধে হয়নি কোনো। বরং, মেলায় অন্যান্য শিল্পীদের নতুন নতুন কাজ দেখে আরো উৎসাহিত হলেন সাত্তার। ক্রমে রেজিস্ট্রেশন হল। নানা মেলায় যাওয়া শুরু হল। নিজের উদ্যোগে গেছেন ভূপালেও। সর্বত্রই তাঁর বীজের গয়না প্রভূত সুখ্যাতি পেয়েছে। পরিবারের হাল ফিরেছে। দুই মেয়ের বিয়েও দিয়েচেন তিনি, বিয়ে দিয়েছেন ছেলের। পরিবারের সবাই এখন গয়না তৈরির কাজই করেন।

সাত্তার ভালো আছেন। কিন্তু, মাঝেমাঝে মনখারাপ হয়। আসল গয়নার কদর কমছে। পিতল-কাঁসার খাঁটি ডোকরা আর বিকোয় কই? মানুষ এখন চকচকে নকল নিয়েই খুশি। বীজের গয়নাও জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। এখন আর খুব বেশি শিল্পী বীজের গয়না বানান না। কিন্তু সাত্তার আজো বীজের গয়না ছাড়তে পারেননি। অবশ্য অন্য গয়নাও বানান। নতুন গয়না আবিষ্কারও করার চেষ্টা জারি আছে তাঁর। এই যেমন সদ্য বানিয়েছেন বাঁশের কঞ্চির একতারা গলার হার আর কানের দুল। বিক্রি ভালই সেই নতুন গয়নার।

শ্যামলী খাস্তগিরের কথা ফলেছে। অনেক বড়ো হয়েছে সোনাঝুরির হাট। সাত্তার আনসারিও আজ হস্তশিল্প মহলে একজন চেনা নাম। বয়স বাড়ছে। তবু, নতুন কিছু গড়ে তোলার নেশাটা বদলায়নি। এই নেশাটা যাতে কোনদিন না কমে, বলছিলেন সাত্তার।   

Developed by DXDasia